||বিশেষ প্রতিনিধি||
এবারের নির্বাচনে আলেমদের মধ্যে একসঙ্গে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন একমাত্র মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির। শায়খে চরমোনাই হিসেবে পরিচিত। নিজ এলাকা বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসন থেকে তিনি হাতপাখা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দুটি আসনেই তিনি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতার তালিকায় রয়েছেন।

শুরুতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ জোটে ছিল। মূলত এই জোটের উদ্যোক্তা ছিল ইসলামী আন্দোলন। আট দল মিলে বিভাগীয় সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করে। তবে শেষ মুহূর্তে আসন ভাগাভাগিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ইসলামী আন্দোলন ঘোষণা দিয়ে জোট থেকে বেরিয়ে যায়। ২৬০টি আসনে এককভাবেই লড়াই করছে ইসলামী আন্দোলন। দলটি যেসব আসন নিয়ে স্বপ্ন দেখছে এর মধ্যে শায়খে চরমোনাইয়ের দুটি আসনও রয়েছে। দুটি আসনেই জয় পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে ইসলামী আন্দোলন।

বরিশাল-৫ (সদর) আসনেই চরমোনাই দরবার অবস্থিত। আসনটি চরমোনাই পীরের নিজের আসন হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনেই এই আসনে চরমোনাই পীর পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ একটা ভোটব্যাংকও আছে ইসলামী আন্দোলনের। মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীমও এই আসনে একাধিকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে তিনি আলোচিত হন ২০২৩ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির বর্জন করা সেই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন শায়খে চরমোনাই। অনেকের ধারণা ছিল, সরকারবিরোধী জোয়ারের মধ্যে তিনি মেয়র পদে বাজিমাত করবেন। তবে ভোটের দিন ব্যাপক কারচুপির পাশাপাশি তার ওপর সরাসরি হামলা করা হয়। তার রক্তাক্ত ছবি সেই সময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল দেশজুড়ে।

শায়খে চরমোনাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মূল আসন হলো বরিশাল-৫। সিটি করপোরেশন ও কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত আসনটি বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে গত তিনটি নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। ২০১৮ সালের রাতের ভোট হিসেবে পরিচিত নির্বাচনেও এখানে হাতপাখার প্রার্থী ছিলেন শায়খে চরমোনাই। তবে সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নগ্ন হস্তক্ষেপের সামনে কেউই পাত্তা পায়নি। এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে আসনটি ঘিরে নতুন হিসাব-নিকাশ সামনে আসছে।

জামায়াতের সঙ্গে জোট ভেঙে গেলেও এই আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনকে ছাড় দিয়েছে দলটি। এখানে জামায়াত বা ১১ দলীয় জোটের কোনো প্রার্থী রাখা হয়নি। ফলে এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির মজিবুর রহমান সরওয়ারের সঙ্গে শায়খে চরমোনাইয়ের। কোনো কোনো সমীকরণে বিএনপির প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও সমানে সমানে ইসলামী আন্দোলনও। এখানে দলটির একটি শক্ত অবস্থান আছে। একটি বড় ভোটব্যাংকও রয়েছে। তাছাড়া ইসলামি অন্য কোনো দলের প্রার্থী না থাকা এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীমকে বাড়তি সুবিধা এনে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যাওয়াও দলটির প্রতি অনেককে ক্ষেপিয়ে তুলছে। সেই সুবিধা এখানে শায়খে চরমোনাই পেতে পারেন। শেষ পর্যন্ত মজিবুর রহমান সরওয়ারের মতো হেভিওয়েট প্রাথীকে পরাজিত করে রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারেন শায়খে চরমোনাই।

যদিও কেউ কেউ মনে করছেন, বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের হানা দেওয়া কঠিন হবে। তাছাড়া জামায়াতে ইসলামী বাহ্যিকভাবে ঘোষণা দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও দলটি শেষ পর্যন্ত তাদের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া দলটির জয় চাইবে সেটা নিয়েও আছে সন্দেহ। সবমিলিয়েই এই আসনে শায়খে চরমোনাইয়ের জন্য উত্তরণ কঠিন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সদরের সঙ্গে লাগোয়া বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শায়খে চরমোনাই। এখানেও তিনি মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান। বরিশাল-৫ আসনে শায়খে চরমোনাইয়ের সম্মানে প্রার্থী সরিয়ে নিলেও এই আসনে জামায়াত প্রার্থিতায় রয়েছে। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন মাওলানা মাহমুদুন্নবী প্রার্থী। যদিও এখানে জামায়াতের ভোটের পরিমাণ কম বলে মনে করা হয়। ফলে এই আসনে বিএনপির সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা শায়খে চরমোনাইয়েরই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসলামি দলগুলোর মধ্যে একসঙ্গে দুটি আসনে প্রার্থী হওয়া মুফতি ফয়জুল করীম সম্ভাবনার দিক থেকে কোন আসনে এগিয়ে আছেন সেটা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে দলটি দুটি আসনেই জয়ের আশা করছে। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দুটি আসনেই সম্ভাবনার পাশাপাশি শঙ্কাও দেখছেন। বিজয়ী হয়ে সরকারে যাওয়ার সম্ভাবনায় থাকা বিএনপির প্রার্থীকে টেক্কা দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন তারা।
এনএইচ/