বিশেষ প্রতিনিধি
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনটি বরাবরই আলেম অধ্যুষিত আসন হিসেবে পরিচিত। এই আসনে আলেমদের বেশ প্রভাব রয়েছে। মাদরাসার সংখ্যাও অনেক। তাছাড়া অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে এখানকার মানুষ বেশি ধার্মিক। ইসলামের প্রশ্নে এখানকার সাধারণ মানুষেরাও অনেক নিবেদিত। এবারের নির্বাচনে এই আসনে দুই জোট থেকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন দুজন বিশিষ্ট আলেম। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই দুই আলেমের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কে হাসবেন শেষ হাসি?
সিলেট-৫ আসনে বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। তিনি এই আসন থেকে ২০১৮ সালেও নির্বাচন করেছেন। তখন তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমর্থন পেয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে সরাসরি ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনের সুযোগ পেলেও এবার সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে নিজ দলীয় প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে নির্বাচন করছেন তিনি।
অন্যদিকে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের সমর্থন পেয়েছেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান। জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী প্রার্থী থাকলেও জোটের স্বার্থে আসনটি ছাড় দিয়েছে জামায়াত। ফলে কওমি মাদরাসার দুইজন পরিচিত আলেমের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে।
আসনটি বিএনপি তাদের মিত্র হিসেবে জমিয়তকে ছাড় দিলেও দলটির স্থানীয় নেতা মামুনুর রশীদ ওরফে চাকসু মামুন ছাড় দেননি। তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। এলাকায় জনভিত্তি থাকায় তিনিও শক্তিশালী প্রার্থী। তাছাড়া বিএনপির একটি অংশের সমর্থন তিনি পাচ্ছেন। ফলে এই আসনে এবার ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দুই আলেমের মধ্যে ইসলামপন্থী ভোট কাটাকাটি হয়ে গেলে মধ্যখান দিয়ে চাকসু মামুন সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন বলেও কেউ কেউ ধারণা করছেন।
এই আসনের ভোটের সমীকরণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সংগঠনের দিক থেকে জমিয়ত মোটামুটি শক্তিশালী। আলেম-উলামার ভোটের একটি বড় অংশ মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক পাবেন। বিএনপির ভোটের বড় অংশও তিনি পাবেন। এই আসনে আওয়ামী লীগের একটা ভোটব্যাংক রয়েছে। সেই ভোট কার বাক্সে যাবে সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। এছাড়া এই আসনে ফুলতলী পীরের একটি বড় প্রভাব রয়েছে। সবশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই আসনে ফুলতলীর পীরের ছেলে বিজয়ী হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এবার যদিও এই পরিবারের কেউ প্রার্থী হননি, কিন্তু তাদের ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ইতোমধ্যে ফুলতলী দরবারে সফর করেছেন এবং তাদের সমর্থন চেয়েছেন।
এদিকে মুফতি আবুল হাসান স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী আলেম। তিনি সিলেট জেলা বেফাকের সাধারণ সম্পাদক। গোটা সিলেটে ওয়ায়েজ হিসেবে তার একটা পরিচিতি রয়েছে। তার বাড়ি জকিগঞ্জে। এই উপজেলার ভোটের একটা বড় অংশ তিনি পাবেন। জামায়াতের ভোটব্যাংকও যুক্ত হবে তার বাক্সে।
মুফতি আবুল হাসানের আরেকটি প্লাস পয়েন্ট রয়েছে। এই অঞ্চলে মৎস্যজীবীদের একটি বড় ভোটব্যাংক রয়েছে। সেই ভোটব্যাংকটি মুফতি আবুল হাসানে পক্ষে থাকবে বলে দাবি করছেন অনেকেই। ওই ভোটব্যাংকেই ১৯৯১ সালে এই আসনে মাওলানা উবায়দুল হক রহ. ইসলামী ঐক্যজোট থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় মুফতি আবুল হাসানের দেওয়াল ঘড়ি এগিয়ে থাকবে বলে দাবি করছে খেলাফত মজলিস।
সব মিলিয়ে সিলেট-৫ আসনটি দেশের আলেম-উলামার নজর কেড়েছে। এখান থেকে কোন আলেম শেষ পর্যন্ত সংসদে যাবেন, নাকি দুই আলেমের লড়াইয়ের সুযোগ বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা চাকসু মামুন নেবেন সেটা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।