মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা উপত্যকা নিয়ে তার নতুন শান্তি পরিকল্পনা বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিন মাসের তথাকথিত যুদ্ধবিরতিকে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে ঘোষণা করার পর ট্রাম্প এখন তার পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছেন।
এই পর্যায়ের মূল হাতিয়ার হিসেবে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন বোর্ড অব পিস (শান্তি বোর্ড)। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোনাথন কুকের মতে, এই বোর্ড আসলে ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো শান্তি বয়ে আনবে না। উল্টো এটি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলে এই অঞ্চলকে একটি বিশাল রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত করার এক সুদূরপ্রসারী কৌশল মাত্র।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে অনেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখছেন। যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে কর্পোরেট মুনাফা এবং দখলদারিত্বই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
গত অক্টোবর থেকে চলমান সহিংসতায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ৪৬০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১০০ জন শিশু। গাজার অবশিষ্ট অবকাঠামোর মধ্যে আরও প্রায় ২৫শ' ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। কনকনে শীতের মধ্যে ইসরায়েলি অবরোধের কারণে খাবার, পানি ও ওষুধের তীব্র সংকটে অন্তত আটজন নবজাতকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এমন এক মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে ট্রাম্পের শান্তি বোর্ড গঠনের ঘোষণাটি একটি নির্মম পরিহাস বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই বোর্ডের মূল লক্ষ্য গাজা পুনর্গঠনের কথা বলা হলেও, এর ভেতরের রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি মূলত জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি এড়িয়ে গাজার ভাগ্য নির্ধারণ করার একটি মাধ্যম। ট্রাম্পের এই ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উপনিবেশবাদের নতুন ছায়া নিয়ে এসেছে। যেখানে দুর্বল জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হবে ধনকুবেরদের স্বার্থে।
মজার বিষয় হল, এই শান্তি বোর্ডের সনদে গাজা বা ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যতের কথা সরাসরি উল্লেখই করা হয়নি। বরং এটিকে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব নিরসনের একটি সাহসী নতুন পদ্ধতি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
সমালোচকরা বলছেন, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর তাদের অস্ত্র ও নজরদারি প্রযুক্তি পরীক্ষা করার জন্য ল্যাব র্যাট (গবেষণাগারের ইঁদুর) হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এখন তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো যেমন জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজস্ব এক নিয়ম চালু করতে চায়।
ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। এটি বর্তমান ‘নিয়ম-ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা’র কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়ার মতো ঘটনাই বলা যায়। যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, তখন ট্রাম্প সেই আদালতের বিচারকদের ওপরই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
ট্রাম্পের এই বোর্ড অব পিস মূলত একটি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবসায়িক উদ্যোগের মতো, যেখানে ট্রাম্প নিজেই চেয়ারম্যান হিসেবে সর্বেসর্বা। তিনি যাকে খুশি এই বোর্ডে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন এবং যখন খুশি কাউকে বহিষ্কার করতে পারেন। এই বোর্ডের সদস্যপদ কেনা যাবে এক বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে। ইতোমধ্যেই হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান, ইসরায়েলের নেতানিয়াহু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলো এই বোর্ডে যোগ দিয়েছে। রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও সেখানে একটি আসন পাওয়ার কথা ভাবছেন বলে জানা গেছে।
এটি স্পষ্টতই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বিকল্প এবং ধনীদের ক্লাব হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। এর পরিবর্তে একটি নামমাত্র কারিগরি কমিটি রাখা হয়েছে যারা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে গাজার প্রশাসনিক কাজ দেখাশোনা করবে।
গাজা পুনর্গঠনের জন্য ট্রাম্প পাঁচ বছরের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করলেও জাতিসংঘের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মতে, ইসরায়েলি হামলায় গাজায় যে ৬০ মিলিয়ন টন ধ্বংসস্তূপ জমেছে, তা সরাতেই অন্তত সাত থেকে দশ বছর সময় লাগবে। পুরো গাজাকে বাসযোগ্য করে তুলতে এবং সত্তর বছরের উন্নয়নের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অন্তত কয়েক দশক সময় প্রয়োজন।
ইসরায়েল গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ ভূমি দখল করে নিয়েছে এবং প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষিজমি ধ্বংস করে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের পরিকল্পনা গাজার মানুষের কল্যাণের জন্য নয়, বরং তাদের পুরোপুরি বাস্তুচ্যুত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এর আগে গাজার উপকূলীয় এলাকাকে অত্যন্ত মূল্যবান ওয়াটারফ্রন্ট প্রপার্টি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি এবং নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফ দীর্ঘ সময় ধরে গাজার পুনর্গঠন নয় বরং একে একটি বিলাসবহুল পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ নিয়ে কাজ করছেন।
এই অশুভ পরিকল্পনায় ট্রাম্পের অন্যতম সঙ্গী হয়েছেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ব্লেয়ারের অতীত ইতিহাস বলছে, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিশ্বকে বিভ্রান্ত করেছিলেন, গাজার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অনেকটা একই রকম। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে চতুর্পক্ষীয় জোটের দূত হিসেবে কাজ করার সময় তিনি ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষার বদলে ইসরায়েলি স্বার্থের পক্ষে ওকালতি করেছেন। এমনকি গাজার সমুদ্রসীমায় থাকা প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রেও তিনি ইসরায়েলের হয়ে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেছিলেন।
এখন ট্রাম্পের বোর্ডে ব্লেয়ারের অন্তর্ভুক্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে, গাজার খনিজ সম্পদ লুট করা এবং ফিলিস্তিনিদের স্বেচ্ছায় উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়ায় তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেরদের বিনিয়োগে গাজাকে একটি স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং জোন বানানোর স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। যেখানে মূল বাসিন্দাদের অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের কোনো স্থান থাকবে না।
বর্তমানে গাজার পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের অস্তিত্বই হুমকির মুখে। ইসরায়েল ইতোমধ্যেই পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার ভবনগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে জাতিসংঘ। কিন্তু ট্রাম্পের শান্তি বোর্ড এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। উল্টো তারা এমন একটি ব্যবস্থার দিকে হাঁটছে যেখানে যুদ্ধই যেন শান্তি।
এমএম/