গাজায় চার মাস ধরে যুদ্ধবিরতি চললেও থামেনি মৃত্যুর মিছিল। এবার শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে হাড়কাঁপানো শীত, ভারী বৃষ্টি এবং চরম অপুষ্টি।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শীত শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০টি শিশু হাইপোথার্মিয়ায় বা প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে তিন মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে কেবল তীব্র শীত সহ্য করতে না পেরে।
খান ইউনিসের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের শিশু বিভাগের প্রধান চিকিৎসক ড. আহমদ আল-ফারায়া জানান, শিশুদের শরীরের চর্বি কম থাকা এবং শক্তি সঞ্চয় কম হওয়ার কারণে তারা ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে যেসব শিশু সময়ের আগে জন্মেছে বা যাদের ওজন কম, তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
মানবিক সহায়তা সমন্বয়ের জন্য জাতিসংঘের কার্যালয় (ওআইসিএইচএ) জানিয়েছে, গাজার লাখ লাখ মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে বা তাবু গেড়ে বসবাস করছে। গত এক সপ্তাহের প্রবল বাতাস ও বৃষ্টিতে শত শত তাবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে গৃহহীন মানুষগুলো সরাসরি শীতের কবলে পড়েছে।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার প্রধান ফিলিপ লাজারিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন যে গাজার ৯২ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে যেমন ঘর ধসে পড়ছে, তেমনি অবিস্ফোরিত বোমার আতঙ্কও রয়ে গেছে। শীতকালীন বৃষ্টির কারণে ঘর ধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. মুনির আল-বারশ।
স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি গাজায় এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে অপুষ্টি। গর্ভবতী নারীরা পর্যাপ্ত খাবার ও ভিটামিন না পাওয়ায় নবজাতকরা অত্যন্ত কম ওজন নিয়ে জন্মাচ্ছে। ড. বারশ সতর্ক করেছেন যে ক্ষুধার্ত শরীর, ওষুধের অভাব এবং দূষিত পানির কারণে গাজাজুড়ে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধবিরতি চললেও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরেনি।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে বসছেন। এই বৈঠকে গাজায় একটি আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা বাহিনী গঠন এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণসহ যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে গাজার অভ্যন্তরে ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত এলাকার সীমানা বা 'ইয়েলো লাইন' এলাকায় এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, উত্তর গাজায় এই সীমানা অতিক্রম করার চেষ্টা করায় এবং বিস্ফোরক রাখার অভিযোগে তারা বেশ কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ থাকলেও সীমান্ত এলাকায় এমন বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ এবং মানবেতর জীবনযাত্রা গাজার সাধারণ মানুষের কষ্টকে প্রতিদিন আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সূত্র: সিএনএন