শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪ ।। ৪ শ্রাবণ ১৪৩১ ।। ১৩ মহর্‌রম ১৪৪৬


পুনর্মিলনী হোক অর্থবহ : হাবীবুল্লাহ সিরাজ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| হাবীবুল্লাহ সিরাজ ||

ঈদ বা বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে পুনর্মিলনীর প্রচলন বহু পুরানো। হাজার বছরের মানবেহিতাসে ‘পুনর্মিলনী’ সংস্কৃতির উপস্থিতি বরাবরই উল্লেখযোগ্য। মিলনমেলা, পুনর্মিলনী, ফিরে দেখাসহ  বিভিন্ন শিরোনামে এই সংস্কৃতির আয়োজন হয়ে থাকে। এই অনুষ্ঠানটি বিশেষত সতীর্থ, সহপাঠী, কাজের সহযোগী, অফিস কলিগদের মধ্যে হয়ে থাকে। দীর্ঘ একটা সময় দূরে থাকার পরে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মিলিত হয়। মানুষের হাসি-কান্নার ইতিহাসে পুনর্মিলনী বেশ গুরুত্ব ভূমিকা পালন করে। পুনর্মিলনীতে হাসি হয়, কান্না হয়, বেদনারা শেয়ার হয়, সুখ বিলি হয়। জীবনের সুখস্মৃতি আর দুঃখস্মৃতি সমানতালে ভেসে উঠে। একজন অন্যজনকে জানার সুযোগ হয়। সুখেদুঃখে বন্ধুবান্ধবদের পাশে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সময় অব¯স্থা পরিবেশ ভিন্ন হলেও বন্ধুত্ব সতেজ থাকে।

পুনর্মিলনী সাধারণত সহপাঠীদের মধ্যেই হয়ে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে সবাই যখন কর্মজীবনে পদার্পণ করে; তখন জীবিকার তাগিদে কর্ম ভিন্ন হয়, অবস্থান ভিন্ন হয়, স্থানও ভিন্ন। একজন দেশবিখ্যাত লোক হয়, অন্যজন থেকে যায় সেই অঁজপাড়া গায়ের কৃষক হিসেবেই। পুনর্মিলনীগুলো এদুয়ের তফাৎ দূরে, পার্থক্য ঘুচায়, পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর হৃদ্যতা বাড়িয়ে দেয়। তখন আর কৃষক লোকটি তার সহপাঠীর উঁচু অবস্থানের কারণে নিজেকে ছোট ভাবে না, উঁচু অবস্থানে থাকা লোকটিও তার গায়ের অখ্যাত সহপাঠীকে ভুলে যায় না। সেই ছাত্রজীবনের মতো দুজনের মধ্যে থাকে নির্ভেজাল মধুর সম্পর্ক। এই সম্পর্ক বিরামহীন চলতে থাকে। দুজন বন্ধুর অবর্তমানে তাদের সন্তানদের মধ্যেও গড়ে উঠে অকৃত্রিম এক ভালোবাসার সম্পর্ক। যে সম্পর্ক বাবাদের স্মৃতিকে জাগরুক রাখে হৃদয় থেকে হৃদয়ে। 

আমাদের এই আধুনিক সময়েও পুনর্মিলনী হয়। আরও ব্যাপক আকারে হয়। বিশাল করে প্রচারও হয়। অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাড়া-মহল্লা কেন্দ্রিক স্থানে স্থানে পুনর্মিলনী হয়। আমরা আমাদের এই পুনর্মিলনীগুলোকে কিন্তু আরও অর্থবহ করে তুলতে পারি। শুধু নামকাওয়াস্তে পুনর্মিলনী! কেউ আসল কেউ আসল না, কেউ কারও খবর নিল না, কেউ কারও সুখের ভাগিদার হলো না, দুঃখেরও ভাগিদার হলো না। তাহলে তো পুনর্মিলনীগুলো নিছক নামকাওয়াস্তের পুনর্মিলনী হলো। এই পুনর্মিলনিতে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে আরও দূরত্ব বাড়বে, দিনদিন সম্পর্ক শিথিল হবে। এই ক্ষেত্রে কীভাবে বন্ধুত্বের সম্পর্কে সতেজ রাখা যায়, সেই পরিকল্পনা নিয়ে পুনর্মিলনী করতে হবে। সহপাঠীদের সবার অবস্থান এক হবে না। কেউ বড় কেউ ছোট! কেউ সবল কেউ দুর্বল। কিন্তু বন্ধুত্বের বিচারে সবাই সেই আগের সহপাঠীর মতো! তখনই কেবলই পুনর্মিলনী অর্থবহ।

মুসলমানদের জীবনের সবচে বড় পুনর্মিলনী হবে হাশরের ময়দানে। সেই দিনও যেন সহপাঠীদের বন্ধুত্ব অটুট থাকে। কুরআন বলছে,
وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْخُلَطَاءِ لَيَبْغِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ
আর বন্ধুদের অনেকেই একে অন্যের উপর সীমলঙ্ঘন করে থাকে। তবে কেবল তারাই এরূপ করে না যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে’। আর এরা সংখ্যায় খুবই কম। সুরা সোয়াদ : আয়াত নং ২৪
الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ
বন্ধুরা সেদিন হয়ে যাবে একজন আরেকজনের দুশমন, তবে মুত্তাকীরা ছাড়া সুরা যুখরুফ : আয়াত নং ৬৭

কাল কিয়ামতের বিভীষিকাময় ময়দানেও যেন সম্পর্কগুলো সুন্দর ও অটুট থাকে সেইভাবেই পুনর্মিলনীগুলো করা। অর্থবহ পুনর্মিলনী করতে হলে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ করা। সকল সহপাঠীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। পরামর্শসাপেক্ষে স্থান-সময় নির্ধারণ করা এবং নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই সবাইকে অবগত করা স্থান ও সময়ের ব্যাপারে। বার বার ফোন দিয়ে অবগত করা। অংশগ্রহণকারী সকলের ব্যক্তিগত পারিবারিক কর্মজীবন ও আয়-ইনকামের বিস্তারিত অবস্থা শোনা-জানা-বুঝা। অবস্থা ও সর্বদিক ভালো হলে এর উপর আল্লাহর শোকর আদায় করা। আর অবস্থা কোন দিক দিয়ে দুর্বল হলে, সব বন্ধু মিলে তার দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা করা। এই ক্ষেত্রে কেউ কর্ম বা চাকরি পরিবর্তন করতে চাইলে, বন্ধুদের সহযোগিতা কাজে লাগানো। প্রতিটি মিলনমেলা বা পুনর্মিলনীতেই কিছুনা কিছু উপহার উপঢৌকন রাখা। উত্তম খানাপিনার আয়োজন করা। যারা দাযিত্বে থাকবে তাদের পক্ষ থেকে এমন কোন আচরণ না আসা, যাতে করে সহপাঠীদের কষ্ট হয়।

পুনর্মিলনীকে অর্থবহ করতে শুধুই নিজেদের মধ্যকার আলোচনা নয়, যে প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা পড়াশোনা শেষ করেছি, যে প্রতিষ্ঠানের আমরা একসাথে মিলিত হয়েছিলাম, যে উস্তাদগণ আমাদেরকে পড়িয়েছেন- তাদের ব্যাপারেও ভাবতে হবে এবং পুনর্মিলনিতে মাদরাসা ও উস্তাদদের বিষয়ে সুনির্ধারিত প্রোগ্রামও থাকতে হবে। যেমন, পুনর্মিলনীর সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিষ্ঠানের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে সহায়তা করা। উস্তাদদের সাথে সম্পর্ক বাড়ার জন্য প্রতিটি মিলনমেলায় এক বা একাধিক উস্তাদকে উপস্থিত করে নসিহত শোনা এবং হাদিয়া দেওয়ার চেষ্টা করা। এভাবেই আমাদের স্বাভাবিক পুনর্মিলনীগুলো হতে পারে অর্থবহ।

লেখক : খতিব, আলেম, সম্পাদক    

হাআমা/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ