বিশেষ প্রতিনিধি,
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি জন্ম লাভের পর ইতোমধ্যে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অংশগ্রহণ থাকলেও পরিমাণে অপেক্ষাকৃত কম ছিল আলেম-উলামার অংশগ্রহণ। কোনো কোনো সংসদে মূলধারার আলেমদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। তবে দুয়ারে কড়া নাড়ছে যে নির্বাচন, সেই নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক আলেম-উলামা প্রার্থী হয়েছেন। এবার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, প্রার্থী তো হয়েছেন, তাদের কতজন সংসদ পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হবেন। এতো বিপুলসংখ্যক প্রার্থী অংশ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ আলেম সংসদে যেতে না পারলে সেটা আক্ষেপের হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় সব ইসলামি দলই অংশ নিচ্ছে। এতে সব মিলিয়ে তিন শতাধিক আলেম এমপি হওয়ার দৌড়ে আছেন বলে জানা গেছে। এতো বিপুলসংখ্যক আলেম এর আগে কখনো নির্বাচনি লড়াইয়ে নামেননি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আলেমদের অবাধে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনি মাঠে তাদের তৎপরতা নতুন বাংলাদেশে আলেমদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর প্রধানরাও অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রধান মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ, খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী রয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রধান না হলেও দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম রয়েছেন ভোটের মাঠে। এছাড়া ইসলামি দলগুলো থেকে কয়েক ডজন নামকরা ও ব্যাপক পরিচিত আলেম এবার ভোটের মাঠে রয়েছেন। আছেন একঝাঁক তরুণ আলেমও।
এবারের নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর ভোট তিন বাক্সে যাচ্ছে। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ঘোষণা দিয়ে বিএনপির সঙ্গে জোট করেছে। ইসলামী ঐক্যজোট ঘোষণা না দিলেও বিএনপিকে সমর্থন জানিয়েছে। কওমি মাদরাসাভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টি রয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটে। আর পীর সাহেব চরমোনাই নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচন করছে। যদিও দলটি জামায়াতসহ আটটি দল নিয়ে জোটের উদ্যোক্তা ছিল এবং ইসলামপন্থীদের ভোট একবাক্সে আনার ব্যাপারে জোর চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে জামায়াতে ইসলামীর হঠকারিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বৃহৎ ঐক্য ভেঙে যায়।
ইসলামি দলগুলো তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল কতটা ঘরে তোলা যাবে সেটা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। এবার প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় রেকর্ডসংখ্যক আলেমও সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনায় যথেষ্ট চিড় ধরেছে। শেষ পর্যন্ত ইসলামি দলগুলোর নেতারা কতজন সংসদে যেতে পারবেন সেটা নিয়ে চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এবার সর্বোচ্চসংখ্যক আলেম সংসদে যেতে সক্ষম হবেন।
দেশের ইতিহাসে হক্কানি উলামায়ে কেরামের মধ্যে সর্বাধিকসংখ্যক চারজন আলেম একসঙ্গে সংসদে গিয়েছিলেন ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে। এর আগে কিংবা পরে এতোসংখ্যক আলেম যেতে পারেননি। আলিয়া মাদরাসা শিক্ষিত আলেমদের অনেকেই বিভিন্ন সময় জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের হয়ে সংসদে গেছেন। এই দৌড়ে অনেকটা পিছিয়ে আছেন কওমিপন্থীরা। এবারের নির্বাচন তাদের সেই খরা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ সামনে এনে দিয়েছে। এবার সেই সুযোগ তারা কতটা কাজে লাগাতে পারবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সংসদে উচ্চকক্ষ হবে। সেই উচ্চকক্ষে দলগুলোর ভোটের আনুপাতিক হারে সদস্য নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে ইসলামি দলগুলো এমপি পদে বিজয়ী হতে না পারলে প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে উচ্চকক্ষে বেশ কিছু আসন পেতে পারে। এজন্য সরাসরি ভোটে বিজয়ী হওয়ার পাশাপাশি উচ্চকক্ষেও আলেমদের যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এটাকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।