রমজান মাসের বার্তা নিয়ে হাজির রজব: করণীয় ও বর্জণীয়
জানুয়ারি ২৪, ২০২৩ ১০:০০ অপরাহ্ণ

আলহাজ হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক।।

মাহে রজব হচ্ছে মাহে রমজানে প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার। শাহী মহলের প্রধান ফটকে পৌঁছে মানুষ নিজেকে যেভাবে গুছিয়ে প্রস্তুত করে নেয়, ঠিক তদ্রুপ খালিছ তাওবা করে গোনাহমুক্ত হয়ে এ মাস থেকেই রমজানের রহমত ও বরকত লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। রজব ও শাবান এ দুটি মাস গড়ালেই শুরু হবে সিয়াম সাধনার মাস রমজান।

কুরআন মাজীদে যে চারটি মাসকে আশহুরে হুরুম তথা সম্মানিত মাস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, মাহে রজব তার অন্যতম। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয় আল্লাহর বিধান এবং গণনায় মাসের সংখ্যা বার। যে দিন থেকে তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর সম্মান বিনষ্ট করে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। (সূরা-তাওবা ৩৬)

এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, এক বছরে বার মাস। তন্মধ্যে চারটি মাস বিশেষ তাৎপর্যের অধিকারী। তিনটি মাস ধারাবাহিক, যথা- জিলক্বাদ, জিলহজ ও মুহাররম এবং চতুর্থ মাস হচ্ছে জুমাদাল উখরা ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব মাস। (বুখারী, মুসলিম) মাহে রজব অত্যন্ত বরকতময় ও মর্যাদাবান মাস। এ মাসের ফজীলতের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তা আশহুরে হুরুম তথা সম্মানিত মাস সমূহের অন্তর্ভূক্ত। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সা. এর ঐতিহাসিক মি’রাজ এ মাসেই সংঘটিত হয়েছিল।

অতএব, এমাসে নেক আমলের ফজীলত ও মর্তবা অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশী হওয়ায় স্বাভাবিক। তেমনিভাবে এ মাসের গোনাহের ক্ষতি ও ভয়াবহতাও অধিক।

তাই এ মাসে ইবাদতের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা একান্ত কর্তব্য। মুহাক্কিক আলেমগণ বলেছেন, আশহুরে হুরুমের এই বৈশিষ্টও রয়েছে যে, এসব মাসে আমলের প্রতি যত্নবান হলে বাকী মাসগুলোতেও ইবাদতের তাওফীক হয়। আর এসব সম্মানিত মাসে গোনাহ থেকে বিরত থাকার দ্বারা অন্যান্য মাসেও গোনাহ পরিহার করে চলা সহজতর হয়। (আহকামুল কুরআন)

হযরত আনাছ রা. বলেন, যখন রজব মাসের আগমন হতো তখন নবীজি সা. এই দু’আ পাঠ করতেন, “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শা’বান, ওয়া বাল্লিগনা রমাজান”।

অর্থঃ হে আল্লাহ! রজব ও শা’বান মাসে আমাদের বরকত দান করো এবং আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দাও। (মিশকাত) অর্থাৎ রজব ও শা’বান মাসে আমাদের ইবাদত বন্দেগীতে বরকত দান করো এবং রমজান পর্যন্ত হায়াত দান করে পূর্ণ রমজান মাস রোজা ও তারাবীহর তাওফীক দান করো। (মিরকাত) রাসূল সা. এর এ দু’আ রমজানের গুরুত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আবু বকর ওয়াররাক বলখী রহ. বলেন, রজব মাস ফসল রোপণের মাস। শাবান মাস ফসলে পানি সেচ দেওয়ার মাস আর রমজান হলো ফসল ঘরে তোলার মাস। তিনি আরো বলেন, রজব মাস ঠান্ডা বাতাসের মতো, শাবান মাস মেঘমালার মতো আর রমজান মাস হলো বৃষ্টির মতো। (লাতায়িফুল মা’আরিফ) যেসব মানুষ ফসলের বীজ রোপণ না করবে তাদের যেমন ফসল ঘরে তোলা অসম্ভব, তেমনিভাবে যারা এ মাস থেকেই পাশবিক শক্তির উপর রূহানী বা আধ্যাত্মিক শক্তিকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা মুজাহাদা না করবে, তারা রমজান মাসে আমলের পরিপূর্ণ ফসল ঘরে তুলতে পারবে না।

তাই রজব মাস থেকেই শুরু করতে হবে মাহে রমজানের সার্বিক প্রস্তুতি। জাহেলী জামানায় রজব মাসে যেসব কুপ্রথা প্রচলিত ছিল ইসলামের আবির্ভাবের পর তা রহিত হয়ে যায়। যেমন জাহেলী যুগে মাহে রজব উদযাপনের অন্যতম কুপ্রথা ছিল পশু জবাই করা। এ মাসে তারা স্বীয় মূর্তি প্রতিমাদের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করে উৎসব পালন করত।

অথচ এটা গর্হিত ও নাজায়িজ কাজ। রাসূলুল্লাহ সা ইরশাদ করেন, “ইসলামে ‘ফারা’ তথা উট বা বকরীর প্রথম বাচ্চা প্রতিমাদের উদ্দেশ্যে জবাই করার বিধান নেই এবং ‘আতীরা’ ও নেই।

অর্থাৎ রজব মাসে প্রতিমাদের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার প্রথাও হারাম”। বর্তমানে কিছু লোক রজব মাস শুরু হলে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে লাল সালু টানিয়ে ডেগ বসিয়ে মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে এবং খিচুরি পাকিয়ে মানুষের মাঝে বন্টন করে আর এটাকে এ মাসের বিশেষ ইবাদত মনে করে অথচ ইসলামে এ রকম কোন বিধান নেই।

তাই এসব গর্হিত ও মনগড়া কাজ বাদ দিয়ে কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করি আর এসব সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করতে নবীজির শিখনো দু’আর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাব ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাজান।

-এটি