থার্টিফাষ্ট নাইট : কুরআন ও হাদীসের মানদণ্ড
ডিসেম্বর ৩০, ২০২২ ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার সর্বপ্রথম ইংরেজি নববর্ষ উৎসবের প্রচলন করেন। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের পর পহেলা জানুয়ারি পাকাপোক্তভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ১৫৮২ সালে। ধীরে ধীরে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার (খ্রিস্টানদের ধর্মযাজক পোপ গ্রেগরির নামানুসারে যে ক্যালেন্ডার) অনুযায়ী নববর্ষ পালন করা হচ্ছে। ইরানে নওরোজ বা নববর্ষ শুরু হয় পুরনো বছরের শেষ বুধবার এবং উৎসব চলতে থাকে নতুন বছরের ১৩ তারিখ পর্যন্ত।

সাধারণভাবে প্রাচীন পারস্যের সম্রাট জমশিদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিলেন। মেসোপটেমিয়ায় আকিতু বা নববর্ষ শুরু হতো নতুন চাঁদের সঙ্গে। ব্যাবিলনিয়ায় নববর্ষ শুরু হতো মহাবিষুবের দিনে ২০ মার্চ। অ্যাসিরিয়ায় শুরু হতো জলবিষুবের দিনে ২১ সেপ্টেম্বর। মিসর, ফিনিসিয়া ও পারসিকদের নতুন বছর শুরু হতো ২১ সেপ্টেম্বর। গ্রিকদের নববর্ষ শুরু হতো খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত ২১ ডিসেম্বর।

রোমান প্রজাতন্ত্রের পঞ্জিকা অনুযায়ী নববর্ষ শুরু হতো ১ মার্চ এবং খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩ সালের পর ১ জানুয়ারি। মধ্যযুগে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে নববর্ষ শুরু হতো ২৫ মার্চ। পহেলা জানুয়ারি পাকাপোক্তভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ১৫৮২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের পর। ধীরে ধীরে ইউরোপসহ সারা বিশ্বে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ইংরেজি নববর্ষ পালন করা হচ্ছে।

মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক-এর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হচ্ছে ইসলাম। বাংলাদেশের ৯৭ ভাগ মানুষের দ্বীন হচ্ছে ইসলাম, তাই সংবিধানের ২ নম্বর ধারায় বর্ণিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম-এর স্বীকারের প্রেক্ষিতে বিজাতীয় সংস্কৃতি থার্টিফার্স্ট নাইটসহ কোন ইসলাম বিরোধী কাজ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ৯৭ ভাগ মুসলমানের দেশের সরকারের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে- সরকারিভাবে থার্টিফার্স্ট নাইটসহ সকল ইসলাম বিরোধী কাজ বন্ধ করে দেয়া এবং সরকারিভাবে থার্টিফার্স্ট নাইটসহ সকল ইসলাম বিরোধী কাজ থেকে মুসলমানদের বিরত রাখা।

ইসলাম হচ্ছে আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত, একমাত্র পরিপূর্ণ, সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত, নিয়ামতপূর্ণ, অপরিবর্তনীয় ও মনোনীত দ্বীন। যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত বলবত থাকবে। যে প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক “সূরা আলে ইমরানের” ১৯ নম্বর আয়াত শরীফ-এ বলেন, “নিশ্চয়ই ইসলামই আল্লাহ পাক-এর কাছে একমাত্র দ্বীন।” আল্লাহ পাক “সূরা মায়িদার” ৩ নম্বর আয়াত শরীফ-এ আরো ইরশাদ করেন, “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে (দ্বীন ইসলামকে) কামিল বা পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত তামাম বা পূর্ণ করে দিলাম এবং আমি তোমাদের দ্বীন ইসলামের প্রতি সন্তুষ্ট রইলাম।” আল্লাহ পাক তিনি দ্বীন ইসলামকে শুধুমাত্র পরিপূর্ণ সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত ও নিয়ামতপূর্ণ করেই নাযিল করেননি সাথে সাথে দ্বীন ইসলামকে মনোনীতও করেছেন। তাই দ্বীন ইসলাম ব্যতীত অন্য সমস্ত ধর্ম যা ওহী দ্বারা নাযিল করা হয়েছিল যেমন, তাওরাত শরীফ, যাবূর শরীফ, ইনজীল শরীফ ও ১০০ খানা ছহীফা এবং মানব রচিত মতবাদ যা পূর্বে ছিল এবং বর্তমানে যা রয়েছে ও ভবিষ্যতে যা হবে সেগুলোকে তিনি বাতিল ঘোষণা করেছেন।

হাদীছ শরীফ-এ উল্লেখ করা হয়েছে, “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট এসে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমরা ইহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, এর কিছু আমরা লিখে রাখবো কি?

হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, তোমরাও কি দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছ? যে রকম ইহুদী-নাছারারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে? অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিষ্কার দ্বীন নিয়ে এসেছি। হযরত মুসা আলাইহিস্ সালামও যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে উনাকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (মুসনাদে আহ্মদ, বাইহাক্বী, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ্ ইত্যাদি)

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার সর্বপ্রথম ইংরেজি নববর্ষ উৎসবের প্রচলন করে। ১লা জানুয়ারি পালনের ইতিহাস ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত নয়। পহেলা জানুয়ারি পাকাপোক্তভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ১৫৮২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের পর। ধীরে ধীরে শুধু ইউরোপে নয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার [খৃস্টানদের তথাকথিত ধর্মযাজক, দুশ্চরিত্র (যার বিবাহ বহির্ভূত একটি সন্তান ছিল] পোপ গ্রেগরীর নামানুসারে যে ক্যালেন্ডার) অনুযায়ী নববর্ষ পালন করা হচ্ছে। ইরানে নববর্ষ বা নওরোজ শুরু হয় পুরনো বছরের শেষ বুধবার এবং উৎসব চলতে থাকে নতুন বছরের ১৩ তারিখ পর্যন্ত।

সাধারণভাবে প্রাচীন পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাট জমশীদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিল এবং এ ধারাবাহিকতা এখনো পারস্য তথা ইরানে নওরোজ ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উৎসব পালিত হয়। ইরান হতেই ইহা একটি সাধারণ সংস্কৃতির ধারা বহিয়া মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে। মেসোপটেমিয়ায় এই নববর্ষ বা আকিতু শুরু হতো নতুন চাঁদের সঙ্গে। ব্যাবিলনিয়ায় নববর্ষ শুরু হতো মহাবিষুবের দিনে ২০ মার্চ। অ্যাসিরিয়ায় শুরু হতো জলবিষূবের দিনে ২১ সেপ্টেম্বর।

মিসর, ফিনিসিয়া ও পারসিকদের নতুন বছর শুরু হতো ২১ সেপ্টেম্বর। গ্রীকদের নববর্ষ শুরু হতো খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত ২১ ডিসেম্বর। রোমান প্রজাতন্ত্রের পঞ্জিকা অনুযায়ী নববর্ষ শুরু হতো ১ মার্চ এবং খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩-এর পরে ১ জানুয়ারিতে। ইহুদীদের নববর্ষ বা রোশ হাসানা শুরু হয় তিসরি মাসের প্রথম দিন গোঁড়া ইহুদীদের মতে সেই মাসের দ্বিতীয় দিন। মোটামুটিভাবে তিসরি মাস হচ্ছে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর। মধ্যযুগে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে নববর্ষ শুরু হতো ২৫ মার্চ, তারা ধারণা করতো, এদিন দেবদূত গ্যাব্রিয়েল যিশুমাতা মেরির কাছে যিশু খ্রিস্টের জন্মবার্তা জ্ঞাপন করে। অ্যাংলো-স্যাকসন ইংল্যান্ডে নববর্ষের দিন ছিল ২৫ ডিসেম্বর।

পহেলা জানুয়ারি পাকাপোক্তভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ১৫৮২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের পর। ধীরে ধীরে শুধু ইউরোপে নয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালন করা হচ্ছে। বাদশাহ আকবরের ফরমান অনুযায়ী আমীর ফতেহ উল্লাহ্ শিরাজী উদ্ভাবিত বাংলা ফসলি সাল চালু হয় ১০ মার্চ ১৫৬৩ সালে। ইংরেজ আমলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হলেও রাজস্ব আদায়ে ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে বাংলা সাল তথা ফসলী সন বেশি ব্যবহার করা হতো।

বর্ষবরণের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুভূতি যোগটা সে শুরু থেকেই ছিলো বা বর্ষবরণকারীরা ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকেই তা করতো। অথবা বর্ষবরণকে তাদের বিশেষ ধর্মীয় আচার বলে বিশ্বাস করতো। মজুসী বা অগ্নি উপাসকরা এখনো বর্ষবরণকে সরকারিভাবেও ব্যাপক জাঁকজমকভাবে পালন করে থাকে। একে তারা তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গ মনে করে এবং একে নওরোজ বা নতুন দিন বলে অভিহিত করে। ফসলী সনের নববর্ষ হিন্দুদের খাছ ধর্মীয় উৎসবের দিন। এর আগের দিন তাদের চৈত্র সংক্রান্তি। আর পহেলা বৈশাখ হলো ঘট পূজার দিন।

হযরত ইমাম আবু হাফস কবীর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, নওরোজ বা নববর্ষ উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে তার ৫০ বৎসরের আমল থাকলে তা বরবাদ হয়ে যাবে। অর্থাৎ নওরোজ বা নববর্ষ পালনের কারণে তার জিন্দেগির সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে।

আজকে অনেক মুসলমান থার্টি ফার্স্ট নাইট পালন করছে। ইংরেজি নববর্ষ, ফসলী সনের নববর্ষসহ বিভিন্ন নববর্ষ পালন করছে। আর এতে করে তারা বিজাতি ও বিধর্মীদের সাথেই মিল মিশ রাখছে। তাদেরই অনুসরণ অনুকরণ করছে। কালামুল্লাহ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই সমস্ত প্রাণীর মাঝে আল্লাহ পাক উনার নিকট কাফিররাই নিকৃষ্ট, যারা ঈমান আনেনি।” (সূরা আনফাল : আয়াত শরীফ ৫৫)

আর নববর্ষ পালনের দ্বারা সে কাফিরদেরই অনুসরণ-অনুকরণ করা হয়। হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের দলভুক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (সুনানে আহমদ, সুনানে আবূ দাউদ) ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে যে, সব নববর্ষের প্রবর্তকই বিধর্মীরা। তাই ইসলাম নববর্ষ পালনকে কখনোই স্বীকৃতি দেয় না।

সংবিধানের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সে প্রেক্ষিতে দেশে ইংরেজি ভাষাসহ বিভিন্ন উপজাতীয় ভাষার ঊর্ধ্বে যেমন রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদা ও প্রাধান্য তেমনি সংবিধানের ২ নম্বর ধারায় বর্ণিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা স্বীকারের প্রেক্ষিতে অন্যান্য ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীর উপরে ইসলাম ও মুসলমানের মর্যাদা ও প্রাধান্য স্বীকৃত হওয়া আবশ্যক এবং ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও অনেক বেশি হওয়া কর্তব্য। যা মূলত প্রচলিত সংবিধানেরই ব্যাখ্যা।

মূলকথা হলো- সংবিধানের ২নম্বর ধারায় বর্ণিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম-এর স্বীকারের প্রেক্ষিতে বিজাতীয় সংস্কৃতী থার্টি ফাস্ট নাইটসহ কোন ইসলাম বিরোধী কাজ গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। ৯৫ ভাগ মুসলমানের দেশের সরকারের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে- সরকারীভাবে থার্টি ফাস্ট নাইটসহ সকল ইসলাম বিরোধী কাজ বন্ধ করে দেয়া এবং সরকারীভাবে থার্টি ফাস্ট নাইটসহ সকল ইসলাম বিরোধী কাজ থেকে মুসলমানদের বিরত রাখা অর্থাৎ মুসলমানদেরকে ইসলাম পালনে বা ইসলামের উপর ইস্তিক্বামত থাকার ব্যাপারে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করা।

আমাদের চিরায়ত মানবিক মূল্যবোধের প্রদীপটি এখন প্রচন্ড ঝড়ের কবলে পড়েছে। মানবতার স্বল্পসংখ্যক প্রহরী সে মূল্যবোধের প্রদীপটি রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমরাহ অধিকাংশই নির্বিকার। আমাদের মূল্যবোধের নিভু নিভু প্রদীপটি যদি নিভে যায় তাহলে আমাদের জাতীয় জীবনে যে ভয়াল অন্ধকার নেমে আসবে তা কি আমাদের কর্ণধারগণ কখনও ভেবে দেখেছেন?

কোন জাতির স্বাধীনতা হরণ করার এবং তাদেরকে গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার প্রথম পদক্ষেপই হচ্ছে তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দেওয়া। মূল্যবোধের বিপর্যয় অনিবার্যভাবেই জাতীয়তা বোধকে দুর্বল করে দেয় এবং জাতির মধ্যে ভীরুতার জন্ম দেয়, যা এক সময়ে বিজাতির ভৌগোলিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠারও পথ করে দেয়। ইতিহাস শতবার আমাদেরকে এ সত্যের প্রমাণ দিয়েছে। তবুও আমাদের জাতি নির্মমভাবে সে সত্যকে ভুলে আছে।

এদেশের জমি ইসলামী মূল্যবোধের উর্বর ভূমি। এদেশের মাটি শত সহস্র আউলিয়ার চোখের পানিতে আর্দ্র। ইসলামী মূল্যবোধের সে উর্বর ভূমি কি এখন পাশ্চাত্য সভ্যতার অভয়ারণ্যে পরিণত হবে? আর আমরা শুধু কি তাকিয়ে থাকব? এদেশের গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষার কোনই পদক্ষেপ নেওয়া হবে না? পাশ্চাত্য রীতিনীর অনুকরণ প্রবণতা এ দেশের আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীর অধিকাংশের মধ্যে এতই প্রবল যা ভাবতেও কষ্ট লাগে।

ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, যত অযৌক্তিক ও অনৈতিক প্রথাই পাশ্চাত্য সমাজ উদ্ভাবন করবে, এদেশের এক শ্রেণীর আধুনিক লোক তা মাথা পেতে গ্রহণ করবেন এবং এদেশে তা চালু করতে সচেষ্ট হবেন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নির্বিচার অনুকরণ ও প্রতিফলনের চেষ্টা দেখে যে কোন বিবেকবান এ মন্তব্য করতে পারেন। পাশ্চাত্য সভ্যতার বিস্তার এদেশে কতটা ব্যাপক ও দ্রুতবিস্তারী তার বিবরণ দেওয়া সহজ নয়।

একজন পর্যবেক্ষক যদি তার চোখ কান খোলা রেখে এর একটি হিসাব নিতে চান, তাহলে এদেশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির একটি দীর্ঘ ফিরিস্তি পাবেন। একেবারে ধর্মবিমুখ শ্রেণীর কথা তো অবাস্তব, যারা নিজেদের জীবনে মোটামুটিভাবে ধর্মচর্চা করেন, নামায পড়েন, রোযা রাখেন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা কুরআন হাদীসের আলোকে তুলে ধরলে কিছুটা প্রভাবিত হন তারাও পাশ্চাত্য সভ্যতায় আক্রান্ত।
আমাদের চিরায়ত মানবিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য সভ্যতার এ আগ্রাসন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রায় সর্বত্রই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নগ্ন উপস্থিতি চোখে পড়ছে।

অশ্লীল চলচ্চিত্র প্রদর্শন, বিজ্ঞাপনে অশালীনভাবে নারীদের ব্যবহার, থার্টি ফাস্ট নাইট উদযাপন, শুভসন্ধ্যা ও গুডমর্নিং চর্চা, টাই ব্যবহার, এক মিনিটের নীরবতা পালন, স্মরণীয় প্রয়াত ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি নির্মাণ, লাশ বা কফিনে ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান, মৃতের প্রতি শোক প্রকাশের জন্য বিউগল বাজানো, মৃতের স্মরণে গান-বাজনা, অসহায়দের সেবার জন্য মৃত্যু অথবা গান-বাজনার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ, বাসগৃহ এমনকি শয়নকক্ষে কুকুর পালন এবং কুকুরে সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন ইত্যাদি অপসংস্কৃতি এখন আমাদের নগর জীবনে সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অপসংস্কৃতির চর্চায় লিপ্ত কথিত আধুনিক ব্যক্তিরা নিজেদের পরকালীন জীবনের জন্য যেমন অশান্তির বীজ বপন করছেন, তেমনিভাবে ইহজীবনেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বহীন ও আত্মমর্যাদাহীন জীবন যাপন করছে।
সবচেয়ে বিপর্যয় নেমেছে আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিষ্টচার সংস্কৃতিতে। এ প্রসঙ্গে এ লেখায় আমরা খানিকট বিশদ আলোকপাত করতে চাই। আমরা এখন যা দেখছি তা হচ্ছে ‘বৃদ্ধখামার’ সংস্কৃতি। সন্তান ও পিতামাতার মধ্যে শ্রদ্ধা ও মমতার যে বন্ধন তৈরী করে দিয়েছে ইসলাম, এহেন সংস্কৃতির মাধ্যমে পাশ্চাত্য সভ্যতা সে বন্ধন শুধু আলগাই করেনি, অনেক ক্ষেত্রে তা ছিন্ন করে দিয়েছে। আমাদের শহুরে ছেলে-মেয়েরা বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রাপ্য মর্যাদা কতটুকু দেয় বর্তমানে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ব্যাপারে নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যাবে। এ অবহেলার চূড়ান্ত বহি:প্রকাশ ঘটছে বদ্ধ আশ্রমে তাদের ঠিকানা গড়ার মাধ্যমে।

ইসলামে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা আর সর্বোত্তম দরদ দিয়ে পিতা-মাতার সেবা করতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশের সঙ্গেই পিতা-মাতার প্রতি সদাচারের নির্দেশ দিয়ে বিষয়টার গুরুত্ব অত্যন্ত সহজবোধ্য করে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, তোমার প্রভুর আদেশ, “তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। যদি তোমার নিকট তোমার পিতা-মাতার কোন একজন অথবা উভয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয, তাহলে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ে কথা বলো না এবং তাদের সঙ্গে অত্যন্ত শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বল।’’ সূরা- বনী ইসরাঈল : ২৩।

উদ্ধৃত আয়াত সুস্পষ্ট নির্দেশ করে যে, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে কোন প্রকার রূঢ় বা শিষ্টাচার বর্জিত আচরণ করার কোন অবকাশ নেই। বার্ধক্যজনিত চৈতন্যভাব ও দুর্দশার কারণে তাদেরকে অবজ্ঞা করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। মূলত কুরআনের এ শিক্ষাই ছিল মুসলিম সন্তানের জীবনের সর্বোত্তম ধন। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য সমাজে পিতা-মাতা বৃদ্ধ ও অচল হয়ে পড়লে তাদেরকে কিছু খরচ দিয়ে ‘বৃদ্ধাশ্রমে’ রেখে আসা হয়। এভাবে সামান্য অর্থ দিয়ে সন্তান-সন্ততিরা তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতার সকল পরিচর্যা এবং মৃত্যুর পর তাদের সমাহিত করার দায়-দায়িত্ব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করে নেয়।

বাংলাদেশের প্রয়াত বুদ্ধিজীবী পাশ্চাত্য সভ্যতার নষ্ট ফসল অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের লেখায় পাশ্চাত্য সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে এইভাবে ‘‘তারা দূর থেকে শোনে তাদের মৃত্যু আছে; কিন্তু তা তাদের নাড়া দেয় না। একবার শুনে তারা অন্যদিকে মন দেয়, ক্রিকেট খেলতে যায়। তারা কান্নার স্বর শুনতে পায় না, যারা সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন, মৃত্যুর ভয় ও বেদনা থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন। তারা হয়তো অনেক কুসংস্কার থেকে এবং মুক্ত অনেক ভয় থেকে। ইউরোপ আমেরিকায় মৃত্যু আরও বিমূর্ত আরও নিরাবয়ক হয়ে উঠেছে।

সেখানে অনেকে আছে যারা কখনও মৃত্যু দেখেনি, কারো লাশ দেখেনি। সেখানে শিশুদের পিতা-মাতারা সাধারণত মারা যায় না, আর সাধারণত শিশুরা মারা যায় না। যারা মারা যায় তারা জীবন থেকে অনেক আগেই দূরে সরে গেছে। হাসপাতাল তাদের মানবিকভাবে লোকান্তরিত হওয়ার ব্যবস্থা করে। সমাহিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মানবিকভাবে তাদেরকে সমাহিত করে। চারপাশে কোথাও মৃত্যুর দাগ লাগতে দেয় না। সেখানে কেউ মরে না। একদিন অনুপস্থিত হয়ে যায়।’’-আমার অবিশ্বাস পৃ.১৪৫

ধীরে ধীরে সে মানবতাহীন সংস্কৃতিই এখন এদেশে চালুর চেষ্টা চলছে। বয়স্ক ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচয়ে এ ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। এসব সংস্থার একটি মানবিক দিক আমরা অস্বীকার করি না। তারা আশ্রয়হীন বৃদ্ধ ও শিশুদেরকেও আশ্রয় দিয়ে থাকে। এদিকটি তো অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু তাদের কথিত আশ্রয়ের ব্যাপকতা ও প্রচারণা থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, তাদের দৃষ্টিতেও বৃদ্ধ মানেই ঘরে থাকার অনুপযুক্ত অপদাথ এক অসহায় বনিআদম। তাই তখন পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণার সঙ্গে তাদেরও ধ্যান-ধারণার কোন তফাত খুঁজে পাওয়া যায় না এবং এ সত্যটি ধরা পড়ে যায় যে, তারা এদেশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিরই প্রতিনিধিত্ব করছেন। সমস্যাটা এখানেই।

কিছুদিন পূর্বে ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিক এ ধরনের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপর একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করেছিল। তাতে বেশ কয়েকজন পিতা-মাতার সাক্ষাতকারও প্রকাশিত হয়েছিল। এদের কারো কারো সাত-আট জন করে সন্তান রয়েছে এবং বৈবাহিক জীবনে সে সন্তানরা বেশ প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাদের অচল পিতা-মাতাদের তারা রেখে গেছে এই খামারে। এই পিতা-মাতারা সাংবাদিকদের কাছে তাদের করুণ অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। তাদের কারো সন্তান বছরে একবার, কারো সন্তান ছয় মাসে একবার এসে তাদেরকে একটু দেখে যায়।

এভাবেই পাশ্চাত্যের হৃদয়হীন সভ্যতার একটি ধারা আমাদের নগরজীবনেও লেগে গেছে। আমাদের শিষ্টচার-সংস্কৃতিতে যে সর্বগ্রাসী বিপর্যয় নেমেছে তা মূল্যবোধপ্রিয় দেশপ্রেমিক বিবেকবানদের নাড়া না দিয়ে পাবে না। কিছুদিন পূর্বে এমনই একজন মূল্যবোধপ্রিয় নাগরিকের একটি চিঠি চোখে পড়ে দৈনিক ইত্তেফাকের চিঠি-পত্র কলামে। তেজগাঁও পোস্টাল স্টাফ কোয়ার্টার থেকে একেএম মান্নান কবীরের লেখাপত্রটি ঈষৎ সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নে তুলে ধরা হল।

“মানুষে মানুষে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর স্নেহের শাশ্বত অভিব্যক্তি স্থান-কাল নির্বিশেষে মানবিক গুণাবলীর শ্রেষ্ঠত্ব বহন করে। মানুষের বয়স, সামাজিক অবস্থান, আত্মীয়তা কিংবা কর্মক্ষেত্রের পদমর্যাদা যে দৃষ্টিকোণেই দেখা হোক না কেন, বয়োজ্যেষ্ঠ, সমবয়সী বা কনিষ্ঠ শ্রেণীর মধ্যে বাহ্যিক আচার-আচরণের যে পার্থক্য বা মৌলিকতা সেটি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সার্থকতা প্রকাশ করে। এ ধরনের সামাজিক আচার যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন মর্যাদাবান জাতির গৌরবে আমাদের শির সদা উন্নত থাকবে।

কিন্তু অতীব দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হয়, আমাদের আবহমানকালের শিষ্টাচার-সংস্কৃতির মধ্যে বয়স-ভিত্তিক পরস্পরের যে মান্যজ্ঞানের অস্তিত্ব সমাজ-সংস্কারে বহমান ছিল, অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, কেন জানি সেই দূর্গ থেকে আমরা ক্রমশ: দূরে সরে যাচ্ছি। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রগতির চাকায় ভর করে এক শ্রেণীর মানুষ এখন বয়সের যোগ্যতাকে স্বীকার করতে নারাজ।

এরা হরহামেশা বয়োজ্যেষ্ঠ শ্রমজীবী বা অশিক্ষিত বা কম-শিক্ষিত মানুষকে নিঃসংকোচে তুই/তুমি সম্বোধন করে, এমন কি নির্দ্ধিধায় ধমক বা তাদের সাথে রূঢ় ব্যবহার করতেও কার্পণ্য করে না। আবার অপরিচিত সমবয়সীর সঙ্গেও সৌজন্য প্রকাশের ধার ধারে না। তেমনি ছোটদেরকে সম্বোধন করতে তুচ্ছ শব্দ ব্যবহার কিংবা অকারণেও তাচ্ছিল্য দেখায়।

অফিস আদালতে তথা কর্মক্ষেত্রে একশ্রেণীর কর্তাব্যক্তি তার অধীন কেউ বয়সে অনেক বড় হলেও স্বাভাবিক মেজাজে তাকে তুই/ তুমি সম্বোধন করা আমাদের দৃষ্টিতে এক রকম অন্যায় আচরণ। কারণ পরস্পরের প্রতি আচার-ব্যবহারের বেলায় বয়সের বিষয়টি বিবেচনা না করা নিশ্চয়ই মানবতাবিরোধী কাজ।

সমাজে কেবল শিক্ষা, বংশ, সামাজিক গুরুত্ব, কর্মক্ষেত্রের পদমর্যাদার ভিত্তিতেই পারস্পরিক সম্মান নির্ধারিত হয় না, বয়সের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচিত হওয়া উচিত। এটি কোন অবস্থাতেই আধুনিক ধ্যান-ধারণার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জোরালো নমুনা নয়।

অনেক পরিবারে দেখেছি, সন্তানরা পিতা-মাতার সামনে ড্রাইভার বা কাজের ছেলেমেয়ে সে যে বয়সেরই হোক না কেন তাকে অবজ্ঞাসূচক সম্বোধন করে, বেমানান মন্তব্য বা গালি-গালাজ করে পিতা-মাতার বিনা আপত্তিতেই। এ রকম প্রশ্রয় থেকেও সন্তানরা পরবর্তী সময়ে বড় ছোট মান্যবোধ হারিয়ে ফেলে।

সমাজবদ্ধ প্রাণী হিসেবে মানুষের প্রতি মানুষের মমতাবোধ, আনুগত্য, আস্থাশীলতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সামাজিক শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ সুসংহত করতে বয়স ভেদাভেদে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার চর্চাও অব্যাহত থাকা জরুরী।’’

আমাদের জাতীয় মূল্যবোধের প্রদীপটি যদি নিভে যায় তাহলে তার পরিণতি কী দাঁড়াবে এ পত্র লেখকের মত মূল্যবোধপ্রিয় নাগরিক সমাজ তা একটু ভেবে দেখবেন কি? দেশের শ্রদ্ধেয় আলেম সমাজ এবং অন্যান্য বিবেকবান দায়িত্বশীলগণ যদি এখনই পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ান এবং আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার সংগ্রামে অবতীর্ণ না হন তাহলে এ অপসভ্যতা ক্রমান্বয়ে পুরো জাতিকে গ্রাস করে ফেলবে।

কারণ শহরে যে সংস্কৃতির চর্চা হয় খুব দ্রুত তা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছে যায়। শিশু-আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কেউ সে সংস্কৃতির অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনা। আমাদের জাতিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করতে চাইলে এখনই বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের সূচনা করতে হবে। সেই বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের জন্য নৈতিক মূল্যবোধের পতাকাবাহীগণ এগিয়ে আসবেন কি?

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ইংরেজি নববর্ষ-সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ এতে কয়েক ধরনের ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ড রয়েছে। শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি, চিন্তাধারা ও সংগীত। নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান। গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান। সময় অপচয়কারী অনর্থক বাজে কথা ও কাজ।

এমতাবস্থায় প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো, নিজে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা এবং মুসলিম সমাজ থেকে এই ইমান বিধ্বংসী প্রথা উচ্ছেদে নিজ নিজ সাধ্য ও অবস্থান অনুযায়ী সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। যাদের নিজস্ব প্রভাব ও দাপট রয়েছে, তাদের কর্তব্য হবে অধীনস্থদের এ কাজ থেকে বিরত রাখা। মসজিদের ইমামরা এ বিষয়ে মুসল্লিদের সচেতন করে বিরত থাকার উপদেশ দিতে পারেন। পরিবার প্রধানরা এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে তার পুত্র-কন্যা, স্ত্রী কিংবা তাঁর অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়।

এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, সহপাঠী, পরিবারের মানুষ ও প্রতিবেশীকে উপদেশ দিতে পারেন এবং নববর্ষ পালনের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন। জাগ্রত হোক জাতির বিবেক, এই প্রত্যাশায়।

লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট-গবেষক।