fbpx
           
       
           
       
ইসলামি ব্যাংক ও কনভেনশনাল ব্যাংক: পরিষেবা এক হলেও বিধান কেন ভিন্ন?
আগস্ট ০৫, ২০২২ ৯:৩০ অপরাহ্ণ

আবু সাঈদ।। দেশে দিনদিন ইসলামি ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বতন্ত্র ইসলামি ব্যাংকের সংখ্যা দশের কোটা পেরিয়েছে বহুদিন। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরো কিছু ব্যাংক।

ক্লাইন্টদের চাহিদা বিবেচনা করে ব্রাঞ্চ চালু করেছে অনেক কনভেনশনাল ব্যাংকও। কোন কোন কনভেনশনাল ব্যাংকের রয়েছে ইসলামিক উইড্রো সিস্টেম। কনভেনশনাল ব্যাংক আমূল পরিবর্তিত হয়ে ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে ইতোমধ্যে। এসব ইতবাচক পরিবর্তন ইসলামি ব্যাংকের চাহিদা উত্তোরোত্তর বৃদ্ধির জানান দিচ্ছে।

কিন্তু ইসলামি ব্যাংকের প্রসঙ্গ এলেই শোনা যায় কোন কোন মহলের নেতিবাচক মন্তব্য। কনভেনশনাল ব্যাংকের সাথে ইসলামি ব্যাংকের তফাত দেখেন না কেউ কেউ।

অনেকে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেন না। এতে ইসলামি ব্যাংকের প্রতি কোন কোন বিনিয়োগকারীর আস্থার সংকট তৈরি হয়। যারা ইসলাম মেনে ব্যাংক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক, তাদের কেউ কেউ দ্বিধায় পড়ে যায়।

দেশের ইসলামী অর্থনীতির পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান আইএফএ কনসালটেন্সি লি. এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও বাহরাইন ভিত্তিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শরীয়াহ স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান এ্যাওফির মাস্টার ট্রেইনার মুফতি ইউসুফ সুলতানের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক ব্যবস্থা একটি অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্যতম অনুষঙ্গ। এটাকে বাদ দিয়ে এই মূহুর্তে অর্থব্যবস্থা কল্পনা করা যাচ্ছে না।’

ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে যেসব বিনিয়োগ ক্ষেত্র জোরদার হচ্ছে, সেগুলো সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে দেশের উদীয়মান তরুণ এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘যদিও ব্যাংক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে মার্কেটে ফিনটেক বা ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি ইত্যাদির চল শুরু হয়েছে, ক্যাপিট্যাল মার্কেটগুলোও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। তথাপি এখনো ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার মতো সক্ষমতা তৈরি হয়নি।’

‘ব্যাংক ব্যবস্থা যে দর্শনের উপর দাঁড়িয়ে আছে, তার অনেক কিছুই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। এবং তার প্রফিট অর্জনের প্রধান যে মাধ্যম-সুদ, তার প্রতি রয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যুদ্ধের ঘোষণা।

এজন্য শরীয়াহ পরিপন্থী অনুষঙ্গ মেনে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার অবকাশ মুসলমানদের নেই। শরীয়াহ স্কলারগণ তাই কনভেনশনাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরামর্শ দেন।’ ব্যাংক ব্যবস্থার শরীয়াহ পরিপন্থী অনুষঙ্গ মেনে নিয়েই ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হবে কিনা জানতে চাইলে বাহরাইন ভিত্তিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠগুলোর জন্য শরীয়াহ স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান এ্যাওফির এ মাস্টার ট্রেইনার এমন মন্তব্য করেন।

ইসলামি ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞ এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘ব্যাংক ব্যবস্থাকে ইসলামী অর্থনীতির আলোকে পরিচালনার জন্য শরীয়াহ স্কলারগণ নানা প্রক্রিয়া বাতলে দিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংককে সেগুলো অনুসরণ করেই ব্যাংক পরিচালনা করতে হয়।’

ইসলামী ব্যাংকের সেবাগুলো অনেকটা কনভেনশনাল ব্যাংকের মতোই। তবুও বিধানে কেন ভিন্নতা, জানতে চাইলে বাংলাদেশের ইসলামী অর্থনীতির পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান আইএফএ কনসালটেন্সি লি. এর এ সহ প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের প্রায় অনেক সেবাই কনভেনশনাল ব্যাংকের মতো। কিন্তু সেবাপ্রদানের পথ ও পন্থায় রয়েছে ভিন্নতা।

পদ্ধতিগত ভিন্নতার কারণেই মূলত দুই ব্যবস্থার বিধানে ব্যবধান এসেছে।’ বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি একটি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘দুটি মুরগী রান্না করা হয়েছে। রান্নার সকল প্রসেস অভিন্ন। স্বাদ, রঙ ও ফলাফলও অভিন্ন। কিন্তু একটি জবেহের সময় আল্লাহ তাআলার নাম বলা হয়েছে। অন্যটি জবেহের সময় আল্লাহ তাআলার নাম নেওয়া হয়নি।

এই জবেহ প্রক্রিয়ার ভিন্নতার কারণেই উভয় মুরগীর বিধানে ভিন্নতা তৈরি হয়ে যায়। একই কথা প্রযোজ্য ইসলামী ব্যাংক ও কনভেনশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে। কনভেনশনাল ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের অনেক পরিষেবা দেখতে একই রকম মনে হলেও প্রক্রিয়াগত ভিন্নতার কারণে ফলাফলে ও বিধানে ভিন্নতা তৈরি হয়েছে।’

সুদী ব্যাংকিং যেভাবে শতকরা হারে লাভ দিয়ে থাকে, ইসলামী ব্যাংকও শতকরা হারে লাভ দিয়ে থাকে, উভয়ের মাঝে তবে পার্থক্য কি? উভয়ের পার্থক্য উল্লেখ করে বিজ্ঞ এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সুদের মধ্যে ডিপোজিটের একটি নির্দিষ্ট পার্সেন্ট লাভ হিসেবে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে লাভের পরিমাণ ও প্রাপ্তি নিশ্চিত ও সুনির্দিষ্ট থাকে।

কিন্তু ইসলামী ব্যাংক তার ডিপোজিটরদেরকে মুরাবাহা বেইজড কনট্রাক্টের ভিত্তিতে প্রফিট থেকে শতকরা হারে লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। মুরাবাহা বেইজড কন্ট্রাক্টে ডিপোজিটরদের সাথে চুক্তি থাকে, ব্যবসায় যে লাভ হবে, সে লাভের ৬৫% কিংবা ৭০% (ব্যাংকভেদে পার্সেন্ট ভিন্ন) তাদেরকে দেওয়া হবে।

তাই দুই ব্যবস্থার প্রক্রিয়া ভিন্ন হয়ে গেলো। সুদে মূল ডিপোজিটের ভিত্তিতে লভ্যাংশ নির্ধারণ করা হয়। আর মুরাবাহাতে প্রফিটের ভিত্তিতে লভ্যাংশ নির্ধারণ করা হয়। সেজন্য সেবা শুনতে এক মনে হলেও প্রকৃতিতে ভিন্ন। এজন্য ইসলামী ব্যাংকের প্রফিট বন্টনে শরীয়ার পক্ষ থেকে আপত্তি আসছে না। সুদভিত্তিক প্রফিট বন্টনে আপত্তি আসে।

মুফতি ইউসুফ সুলতান উভয় প্রক্রিয়াতে আরেকটি পার্থক্য নিরুপণ করে বলেন, ‘ইসলামের নীতি হলো, মুনাফায় অংশ নিতে হলে রিক্স নিতে হবে। সুদভিত্তিক প্রফিট বন্টন প্রক্রিয়ায় কোন রিক্স নেই। ব্যাংকের লাভ-লোকসান যেমনই হোক, ডিপজিটর তার প্রফিট পেয়েই যাবে। কিন্তু মুরাবাহা বেইজড কন্ট্রাক্টে প্রফিট নিশ্চয়তা নেই। কেননা ব্যবসায় লাভ না হলে তো প্রফিট পাবে না। তাই এক ধরনের রিক্স তৈরি হয়। সেজন্য মুরাবাহা বেইজড কন্ট্রাক্ট বৈধ। কিন্তু সুদভিত্তিক কন্ট্রাক্ট বৈধ নয়।’

আসলে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উপর যেসব আপত্তি আসছে, তার জন্য ব্যাংক কর্তপক্ষকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলা যায় না। তাদের নানা কার্যক্রমে অসতর্কতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সেজন্য ইসলামী ব্যাংকগুলোকে আরো শরীয়াহ ঘনিষ্ঠ হতে হবে। বিশেষ করে তাদের ইমপ্লোয়ীদেরকে ইসলামী ফাইন্যান্সে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

যেন কার্যক্ষেত্রে তারা যথাযথভাবে ইসলামের দিক-নির্দেশনা মান্য করতে পারে। তাহলে আপত্তিগুলোর ধীরে ধীরে নিষ্পত্তি ঘটবে। মানুষের আশা তৈরি হবে আরো অনেক গুণ। এতে নিঃশেষে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষও নিঃসন্দেহে লাভবান হবেন।

-এটি