নারী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা.
নভেম্বর ০৮, ২০২১ ৩:৫১ অপরাহ্ণ

ফারজানা ইসলাম মিম

আলোকিত পৃথিবীতে নারীর অবদান সবচাইতে বেশী। নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বজুড়ে আলোচনা সমালোচনার শেষ নেই। অথচ এই নারীকে মহিমান্বিত কে করেছে তা এখনো অনেক নারী অবগত নন। ফলে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পৃথিবীতে ইসলামই সর্বপ্রথম নারীদের যথাযোগ্য সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইসলাম পূর্বযুগে নারীদের মানুষ হিসেবে গন্য করা হতো না। স্ত্রী হিসেবে তারা ছিল চরম অবহেলার স্বীকার। কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণকে সামাজিক কলঙ্কের বোঝা মনে করে জীবন্ত কবর দেয়া হতো।

সমাজে নারী জন্ম নেয়া ছিল অভিশাপ। বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত মহানবী সা. এর আগমনে নারীর প্রতি এ জঘন্য অত্যাচারের অবসান ঘটে। নারীর জীবনে আসে অনেক পরিবর্তন। মহানবী সা. এর মাধ্যমে নারীজাতি ধর্মে কর্মে, শিক্ষাক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে, পারিবারিক ক্ষেত্রে, সামাজিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এভাবে প্রত্যেক ক্ষেত্রে ফিরে পেয়েছে তাঁদের সম্মান মর্যাদা ও অধিকার। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ঘোষণা দেন। এভাবে মহানবী সা. ও তাঁরই শ্বাশত ধর্ম ইসলামই সর্বপ্রথম নারীদেরকে সমাজে স্বাধীন, সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার পথ প্রদর্শন করে।

মূল বক্তব্য : শুরুতেই আপনাদেরকে চৌদ্দশ বছর পূর্বেকার যুগে নিয়ে যেতে চাই। হ্যাঁ, আমি চৌদ্দশ বছর পূর্বের পৃথিবীর কথা বলছি। অমানিশা। গাড় অমানিশা। চাপ চাপ সূচীভেদ্য অন্ধকারে নিমজ্জিত গোটা মানব জাতি। অনাচার অবিচার ব্যভিচার আর পাপাচারের বিষবাষ্পে বিষাক্ত গোটা দুনিয়ার আকাশ বাতাস।

সেই চরম বর্বরতা, নৃশংসতা, অজ্ঞতা আর মূর্খতার যুগ, যখন নারী জাতি মাতৃজাতি পরিণত হয়েছিল স্রেফ পুরুষের ভোগ্য পণ্যে, যখন নারীকে মনে করা হত বংশের কলঙ্ক, যখন কন্যা সন্তানকে কবরস্থ করা হত জ্যান্ত অবস্থায়!!

এমনি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে গুমরে উঠা আর্তনাদ বলে উঠলঃ ইনসানিয়াত কি এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে? এভাবেই কি মানবতার দাফন সম্পন্ন করা হবে? মায়ের জাতি নারী জাতি কি তবে যুগ যুগ ধরে এভাবেই অবহেলা-ঘৃণা আর তিরস্কারের পাত্রীতে পরিণত হয়ে থাকবে?
-আসবেনা কি কেউ নারীত্বের-মাতৃত্বের গর্বিত অধিকার উঁচিয়ে ধরার জন্য?

হ্যাঁ, গুমরে উঠা এ আকুতি পূরণের জন্যই প্রেরিত হলেন বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, নারী মুক্তির অগ্রদূত, মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুসতাফা সা.। ঘোষণা করলেন প্রত্যয়দৃপ্ত কন্ঠে নারীত্বের অধিকারের কথা, বুলন্দ করলেন মাতৃজাতির মর্যাদা, উঁচিয়ে ধরলেন বিশ্ব দরবারে তাঁদের সম্মানের ঝাণ্ডাকে।

ফলশ্রুতিতে যে নারী একদিন ছিল শুধুমাত্র বিছানার সঙ্গী আর ভোগের সামগ্রী, সে নারী পেল সুমহান সামাজিক মর্যাদা। যে নারী ছিল চির অবজ্ঞা আর উপেক্ষার নির্মম শিকার, ভৎসনা আর তিরস্কারের করুণ পাত্রী; সেই নারীই লাভ করল মাতৃত্বের গর্বিত অধিকার।

হিন্দু ধর্মে নারীর অধিকার : আমরা হিন্দু ধর্মের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, সেখানে নারীর অধিকার বলতে কিছুই নেই। প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে- মৃত্যু, নরক, অগ্নি, বিষ ও সর্পের কোনটিই নারী অপেক্ষা মারাত্মক নয়! দেখুন! কি জঘন্য মন্তব্য, বীভৎস উক্তি!!

এইতো সামান্য কিছুকাল পূর্বেও হিন্দু ধর্মানুযায়ী দেবতার সন্তুষ্টির জন্য নারীকে মন্দিরের বেদীতে নির্মমভাবে বলি দেয়া হত। স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকেও জ্বলন্ত চিতায় জীবন্ত দগ্ধ করে সতীদাহ প্রথা পালন করা হত, যা এখনো ভারতের কিছু কিছু এলাকায় চালু আছে।

উহ! কি মর্মন্তুদ প্রথা, বর্বর নিয়ম! যা ভাবতেই গা শিউরে উঠে। খৃষ্টান ধর্মে নারীর অধিকার : এমনিভাবে খৃষ্ট ধর্মেও নারী জাতিকে চরম লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার অতল গহবরে নিমজ্জিত করা হয়েছে। জনৈক পাদ্রীর মতে- নারীই হল শয়তানের প্রবেশস্থল, নারীই সকল অন্যায়ের মূল!
এমনকি “নারীই কি দেহ সর্বস্ব; নাকি তার প্রাণ বলতে কিছু আছে?

ইয়াহুদী ধর্মে নারীর অধিকার : ইয়াহুদী সমাজে নারীর অবস্থা আরো মারাত্মক। ইয়াহুদী ধর্মে এখনো ঋতুস্রাবের সময় নারীকে বাড়ি থেকে দূরে নির্জন কোন স্থানে বসবাস করতে হয়। তার রান্না বান্না সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। অন্যান্য অমুসলিম ধর্মমত যথা বৌদ্ধ, শিখ, অগ্নিপূজারী ইত্যাদি সকল ধর্মের হালতও তথৈবচ; বা বলা চলে এর চাইতেও জঘন্য।

আর মহানবী সা. যেভাবে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন: পক্ষান্তরে মহানবী সা. যে মাতৃ জাতিকে কত উঁচু মর্যাদায় সমাসীন করেছেন তা বুঝার জন্য আশা করি মহানবী সা. এর বিখ্যাত বাণীটিই যথেষ্ট মায়ের পদতলে সন্তানদের বেহেশত।

অন্য এক হাদীসে প্রিয়নবী সা. দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন- মাতার অবাধ্যতাকে মহান আল্লাহ তোমার জন্য হারাম করে দিয়েছেন। (বুখারী) অপর এক সাহাবীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি পরপর ৩ বার মায়ের মর্যাদার কথা বলে ৪র্থ বার পিতার মর্যাদার কথা বলেছেন। (বুখারী)

এমনিভাবে ইসলাম পূর্ব যুগে যে স্ত্রীকে নিছক সেবাদাসী হিসেবে গণ্য করা হত মানবতার নবী, দয়াল নবী, মহানবী সা. এ জঘন্য মানসিকতার মর্মমূলে কুঠারাঘাত করে স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষে জলদগম্ভীর স্বরে ইরশাদ করেন তোমরা স্ত্রীদেরকে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে স্বীয় বিবাহ বন্ধনে আটকে রেখ না।

অপর হাদীসে মহানবী সা. ঘোষণা করেন, তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আর আমি আমার স্ত্রীদের নিকট উত্তম। (তিরমিযী)

বিদায় হজ্বের সেই ঐতিহাসিক ভাষণে প্রিয়নবী সা. লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামের রা. মজমায় বললেন, “হে পুরুষগণ! মনে রেখ! যেমনিভাবে তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের হক আছে, ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের স্ত্রীদেরও তোমাদের উপর হক আছে”। (বুখারী)

যে কন্যা সন্তানের জন্মগ্রহণকে সেই জাহেলী সমাজে অবমাননাকর মনে করা হত, যাদেরকে জ্যান্ত পূঁতে ফেলা হত; সেই কন্যা সন্তানের ফযীলত বর্ণনা করে বলেন, “যে ব্যক্তি এ কন্যাদেরকে উত্তমভাবে লালন পালন করবে আমিও সে ব্যক্তি জান্নাতে পাশাপাশি থাকবো”। (তিরমিযী)

তিনি নিজেও আপন কন্যাদেরকে দারুণ ভালবাসতেন, বিশেষতঃ সর্ব কনিষ্ঠা কন্যা হযরত ফাতেমা রা.কে কোন সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে সর্বশেষে হযরত ফাতেমা রা. সাথে, আর সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর সর্বপ্রথম তার সাথেই সাক্ষাত করতেন”। (মুসনাদে আহমাদ)। আর বলতেন, ফাতেমা আমার শরীরের অংশ, যে ফাতেমাকে কষ্ট দিল সে আমাকেই কষ্ট দিল। (বুখারী)

শিক্ষা ব্যবস্থায় নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা. মহানবী সা. সাথেসাথে নারী জাতির শিক্ষা গ্রহণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে বলেন, “জ্ঞান অর্জন নারী পুরুষ উভয়ের জন্য ফরয”। (ইবনে মাজা)

শুধু তাই নয়, আমলীভাবেও তিনি এর বাস্তবায়ন করে গেছেন। সহীহ হাদীসের মাধ্যমে জানা যায় যে, মহানবী সা. মহিলাদেরকে দ্বীনী বিষয়ে তালীম ও তারবিয়্যাতের জন্য স্বতন্ত্র দিন ও সময় নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। (বুখারী)

ইসলামই একমাত্র অনন্য ধর্ম, যা নারী জাতিকে দিয়েছে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি স্বাধীনতা, মহানবী সা. সেই নবী যিনি নারী জাতিকে তাঁদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অধিষ্ঠিত করেছেন মানবিক ও সামাজিক মর্যাদার সু’উচ্চ আসনে। বাস্তবিক পক্ষে ইসলাম তথা আমাদের মহানবী সা. নারী জাতিকে যে সম্মান-মর্যাদা ও অধিকার দান করেছেন, বিশ্বের অন্যকোনো নবী বা আধুনিক ও প্রবীণ মতবাদ সে অধিকার-সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারেনি।

লেখিকা: শিক্ষার্থী, মঠবাড়িয়া সরকারি কলেজ।

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ