শিরোনাম :
এই আট আমলে হজ ও ওমরার সওয়াব হয়
আগস্ট ০১, ২০২১ ৪:১২ অপরাহ্ণ

শায়খ আহমাদুল্লাহ।।

হজের মৌসুম শেষ হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা যাদেরকে হজ করার তাওফীক দিয়েছেন, সন্দেহাতীতভাবে তারা সৌভাগ্যবান। অন্যদিকে এই দুনিয়াতে আল্লাহর বহু বান্দা রয়েছেন যারা হজ ও ওমরা করার জন্য অন্তরে প্রচণ্ড আগ্রহ লালন করেন, অথচ হজ অথবা উমরা করার তাওফীক তাদের হয়নি।

আজ আমরা সেসব ভাই-বোনদের জন্য এমন কিছু আমলের কথা বলব, যে আমলগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা হজ এবং উমরার সমান সাওয়াব দেবেন। রাসূল সা.-এর হাদীসের ভাণ্ডার থেকে সেরকম আটটি আমলের কথা উল্লেখ করছি।

এক. প্রথম আমল হলো, ঐকান্তিক ইচ্ছা ও সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি হজ অথবা উমরা করার জন্য অন্তরের গভীর থেকে প্রকৃত অর্থেই ইচ্ছা লালন করেছেন এবং তার জন্য বাস্তবে পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন কিন্তু কোনো কারণে তার হজ বা উমরা করা হয়ে উঠেনি, এই ব্যক্তিকে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা হজ বা উমরা না করা সত্ত্বেও হজ ও উমরার সমান সাওয়াব দান করবেন।

নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন নেক কাজের দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করে কিন্তু কোন কারণে সেটি করতে পারে না, তার জন্য আল্লাহ তা’আলা সে কাজের পূর্ণ সওয়াব লিখে দেন। (বুখারী ৬৪৯১)

বুখারি ও মুসলিম একযোগে বর্ণনা করেছে যে, তাবুকযুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর নবী সা. যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাদের বলেছিলেন, বহু লোক মদীনায় অবস্থান করেছিল, তোমাদের সঙ্গে সশরীরে যুদ্ধে যোগদান করতে পারেনি; তারা তোমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সশরীরে না থাকলেও বাস্তবিক অর্থে ছিল। তারা তোমাদের মত সাওয়াব অর্জন করেছে।

কারণ তারা তোমাদের সাথে বের হওয়ার জন্য প্রচণ্ড ইচ্ছা লালন করেছিল। তাদের ইচ্ছায় কোনো খাদ ছিলো না। তারা বাস্তবমুখী পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন।

শুধু অসুস্থতা বা গ্রহণযোগ্য কোনো ওজরের কারণে তারা যোগ দিতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা তাদের মনের ইচ্ছার কারণে তাদেরকেও তোমাদের সমান সাওয়াব দান করবেন।

আমাদের দেশে প্রতিবছর হজের সময় অনেকে হজে যেতে না পেরে কান্নাকাটি করেন, মন খারাপ করেন। কান্নাকাটি করা তাদের ঈমানের পরিচায়ক, হজের প্রতি আগ্রহ এবং ভালোবাসার আলামত।

কিন্তু এই কথা চিন্তা করে তারা খুশি হতে পারেন যে, ঐকান্তিক ইচ্ছার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে হজের সমান সাওয়াব দান করবেন।

দুই. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করার জন্য যে ব্যক্তি বাসা থেকে অযু করে বের হন, এই ব্যক্তিকেও আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা হজ করার সমান সাওয়াব দান করবেন। এক হাদীসে নবী সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার বাসা থেকে ফরয সালাতের জন্য পবিত্রতা অর্জন করে বের হলো, তার প্রতিদান হলো ইহরামধারী হাজীর সমতুল্য।’ (সুনান আবু দাঊদ: হাদীস-৫৫৮)

তিন. ফজরের ফরয সালাত আদায় করার পরে সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকির-আযকার করা এবং সূর্যোদয়ের পর ইশরাক নামায পড়ে মসজিদ থেকে বের হওয়া। এই আমলের বিনিময়েও আল্লাহ তাআলা হজ এবং উমরার সমান সাওয়াব দান করবেন। নবী সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর যিকির করল, সূর্যোদয়ের পর দুই রাকাআত সালাত আদায় করল— তার জন্য রয়েছে পরিপূর্ণ হজ ও উমরার সাওয়াব।’ (সুনান তিরমিযী: হাদীস-৫৮৬)

চার. মদীনার মসজিদে কুবায় সালাত আদায় করা। এ বিষয়ে সুনান তিরমিযীর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার বাসায় পবিত্রতা অর্জন করে মসজিদে কুবায় এসে কোনো সালাত আদায় করল, তার জন্য রয়েছে এক উমরার সাওয়াব।’ (সুনান ইবনু মাজাহ, ১৪১২)

পাঁচ. রমযান মাসে উমরা করা। রমযান মাসে উমরা করার ফযীলত প্রসঙ্গে সহীহ বুখারীর এক হাদীসে নবী সা. বলেছেন-‘রমযান মাসে একটি উমরা করা আমার সঙ্গে হজ করার সমতুল্য।’ (বুখারী-১৮৬৩)

অর্থাৎ একটি উমরা শুধু হজের সাওয়াব পাইয়ে দেবে তা নয়, বরং নবী সা.-এর সঙ্গে হজ করার সাওয়াব হবে।

ছয়. হাজী সাহেবরা যখন হজ করতে যাবেন, তখন তাদেরকে হজে যাওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তা দিয়ে তাকে হজের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়া। তাকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করা অথবা হজে যাওয়ার পরে তার অগোচরে তার পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া। এ আমলের মাধ্যমেও আমরা হজের সমান সাওয়াব পেতে পারি।

এ বিষয়ে নবী সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো হাজীকে প্রস্তুত করে দিল অথবা তার পরিবারের অভিভাকত্ব করল, সে ব্যক্তি হজকারীর সমতুল্য সাওয়াব পাবে; হজকারীর সাওয়া থেকে কমানো হবে না।’ (সহীহ ইবনু খুযাইমাহ, ২০৬৪)

সাত. পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদু লিল্লাহ এবং তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার পাঠ করা। সহীহ বুখারী এবং মুসলিমের এক হাদীসে এসেছে, নবী সা.-এর কাছে এসে গরিব সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে যারা ধনী, তারা আমাদের মতো সালাত-সিয়াম আদায় করে।

তদুপরি তাদের আর্থিক সামর্থ থাকার কারণে তারা হজ করেন এবং দান-সদকা করেন। অথচ এগুলো আমরা করতে পারি না। আমাদেরকে এমন কিছু আমলের কথা বলে দিন, যে আমলের মাধ্যমে আমরা তাদের সমান মর্যাদা পাব।

তখন নবী সা. তাঁদেরকে বলছিলেন, ‘তোমরা প্রত্যেক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ এবং তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার পড়বে; তাহলে তারা তাদের অর্থব্যয় করে হজ করে এবং দান করে যে সাওয়াব অর্জন করে, সেরকম সাওয়াব তোমরাও অর্জন করতে পারবে।

আট. যে ব্যক্তি কোনো ভালো কিছু শেখা বা শেখানোর জন্য বাড়ি থেকে মসজিদের দিকে বের হয়, তাকেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হজের সমান সাওয়াব দান করবেন। এ বিষয়ে রাসূল আকরাম সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একমাত্র জ্ঞানার্জনের জন্য কিংবা ভালো কিছু শিক্ষা দানের জন্য মসজিদের দিকে রওনা হয়, তার জন্য রয়েছে পূর্ণ হজের সাওয়াব।’ (তাবরানী)

উপরিউক্ত আটটি আমল খুবই সহজ। মোটেও কষ্টসাধ্য নয়। এই আমলগুলোর মাধ্যমে অর্থব্যয় করে সশরীরে হজ না করেও হজ এবং ওমরার সমান সাওয়াব অর্জন করতে পারি। শুধু একটু খেয়াল করে, যত্ন সহকারে এ আমলগুলোকে যথাযথভাবে পালন করলেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে সেই মর্যাদা দান করবেন।

তবে মনে রাখতে হবে, এই আমলগুলো করার মাধ্যমে হজ এবং উমরার সাওয়াব পাওয়া গেলেও হুবহু সশরীরে হজ করার মর্যাদা অর্জিত হবে না। তাছড়া এ আমলগুলো করলেই হবে, সশরীরে হজ ও উমরা করার প্রয়োজন নেই— ব্যপারটি এমন নয়। বরং হজ উমরার সাওয়াব পাওয়া আর হজ উমরার দায় থেকে মুক্তি পাওয়া ভিন্ন বিষয়।

সুযোগ পেলে অবশ্যই হজ ও ওমরা করতে হবে। তবে হজ ও উমরা করার তাওফীক যদি নাও হয়, তাহলে উপরিউক্ত আমলগুলো করার মাধ্যমে হজ ও ওমরার সমান বিপুল সওয়াবের অধিকারী হতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অধিক পরিমাণ আমলের দিকে অগ্রসর হওয়ার তাওফীক দান করুন।

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ