মাদরাসা ছাত্রদের মোবাইল ব্যবহার: বছরের শুরুতেই কঠোর হওয়ার পরামর্শ শিক্ষাবিদদের
মে ২৩, ২০২১ ৭:১২ অপরাহ্ণ

রমজান ও ঈদুল ফিতরের আমেজ শেষে কওমি মাদরাসাগুলোতে শুরু হয়েছে ভর্তি যুদ্ধ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফলাইন ও অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। ছাত্রদের জন্য ইলমে দীন শেখার পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে উপযোগী করতে বছরের শুরু থেকেই ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে নানান নিয়ম ও উদ্যোগ গ্রহণ করছেন প্রতিটি মাদরাসার কর্তৃপক্ষ। প্রায় সব মাদরাসার ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে গুরুত্ব পেয়েছে মোবাইল ব্যবহারে কঠোরতার দিকটি। মোবাইল-ফোন  বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনের অন্যতম অনুষজ্ঞ হয়ে উঠলেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট করে বলে মনে করেন গবেষকরা। পড়াশোনার সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষ কোন পদ্ধতী অবলম্বন করতে পারেন; কতটুকু কঠোরতা ও নমনীয়তার পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেন, এ নিয়ে দেশের ৩ শিক্ষাবিদ আলেমের সাথে কথা বলেছেন আওয়ার ইসলামের সাব-এডিটর নুরুদ্দীন তাসলিম


ছাত্রদের মোবাইল ব্যবহারে শতভাগ কঠোরতাই কাম্য: মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন

এ বিষয়ে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী মাদরাসার তাফসির বিভাগের মুসরিফ মাওলানা মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন বলেছেন, ছাত্রদের মোবাইল ব্যবহারে শতভাগ কঠোরতাই কাম্য।  বাটন সেট ব্যবহার এবং মোবাইল ব্যববহারে নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা এজাতীয় শর্ত বেধে দিলে ছাত্ররা কখনোই এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন না। তাই মোবাইল ব্যবহারে কর্তৃপক্ষের শতভাগ কঠোরতাই কাম্য বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলছেন, মোবাইল ফেসবুকসহ ইন্টারনেট ভিক্তিক বিভিন্ন মাধ্যমগুলোতে ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ায় পড়াশোনার সাথে তাদের ব্যাপক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।

তার মতে মোবাইল ব্যবহারের মাধ্যমে ছাত্ররা শুধু এই মোবাইলেই সিমাবদ্ধ থাকছে না, ফেসবুকসহ আরও এমন অনেক বিষয়ের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। যেগুলো তাদের পড়াশোনা থেকে শতভাগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। বর্তমানে মাদ্রাসা এবং ছাত্রের সংখ্যা অনেক বেড়েছে কিন্তু সে তুলনায় কোয়ালিটি সম্পন্ন শিক্ষার্থী পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ছে, বোর্ডে ভালো রেজাল্ট করেও কিতাবের ইবারত পড়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না অনেকেই। তাই এক্ষেত্রে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি কঠোরতা করার পক্ষেই মত দিলেন শিক্ষাবিদ মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন।

আরো পড়ুন: শুধু সাটিফিকেটের জন্য ইফতা পড়া কাম্য নয়: শীর্ষ ২ মুফতি

তিনি আরো যোগ করেছেন, শুধু মোবাইল নয় ছাত্রদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায়- রাজনীতি এবং এমন সবকিছু থেকে ছাত্রদের বিরত থাকা উচিত।

মোবাইল ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে ছাত্রদের মানসিকভাবে প্রস্তুতি করাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত: মুফতী হাফীজুদ্দীন

এদিকে মালিবাগ মাদরাসার মুহাদ্দিস মুফতী হাফীজুদ্দীন বলছেন, মাদ্রাসায় নিয়ম-কানুনের পাশাপাশি মোবাইল না ব্যবহার করতে এবং মোবাইলের ক্ষতির দিকগুলো বুঝাতে ছাত্রদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। অন্যথায় নিয়ম করে মাদ্রাসার সীমানার ভিতরে ছাত্রদেরকে মোবাইল থেকে দূরে রাখা যেতে পারে, কিন্তু বাহির থেকে অথবা ছুটিতে বাড়িতে ও বিভিন্ন জায়গায় গেলে তারা ঠিকই মোবাইল ব্যবহার করবে। আর এর ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই মাদ্রাসায় নিয়ম-এর পাশাপাশি ছাত্রদের যেহনী তারবিয়াতও অনেক বড় করে দেখছেন মুফতি হাফিজ উদ্দিন।

তিনি আরো বলেছেন, মোবাইলে ভালো দিকের তুলনায় ক্ষতির দিকগুলো সব থেকে বেশি, গেমসসহ বিভিন্ন অ্যাপস ভিত্তিক প্রোগ্রাম ছাত্রদের মেধাকে পড়াশোনা, একাগ্রতা থেকে থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে, তাই এক্ষেত্রে ছাত্রদের মোবাইলের ক্ষতির দিকগুলো বুঝিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত করাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের এই মুহাদ্দিস।

শুধু মাদরাসা শিক্ষার্থী নয়, মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষতিকর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রকট: মাওলানা তাহমীদুল মাওলা

জামেয়াতুল উলুমুল ইসলামিয়ার শিক্ষক মাওলানা তাহমীদুল মাওলার কাছে একই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলছেন, শুধু মাদরাসা শিক্ষার্থী নয় মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষতিকর প্রভাব বর্তমানে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রকট। যারা এইসব তৈরি করেছেন তারাই বর্তমানে এর ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আলোচনা করছেন ।

আরো পড়ুন: অনলাইনে ইফতা কোর্স: হুমকির মুখে ফতোয়া বিভাগ

দেশের স্বনামধন্য একটি পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন-‘যেখানে বিশেষ কোনো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৈনিক দুই ঘণ্টার বেশি ফেসবুকে সময় দিলে তা মানুষের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ায়।’ তার মতে মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে বর্তমানে কারো মাঝে দ্বিমত নেই। এছাড়া সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন নেই এবং অপরিণত বয়সে মোবাইল ব্যবহারের ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না।

এছাড়া ইলমে দ্বীন অর্জনের জন্য যেই নিমগ্নতার কথা বলা হয় আকাবিরদের পক্ষ থেকে তা বজায় রাখতেই মোবাইল থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে হবে বলে মতামত দিয়েছেন তিনি।

তিনি আরো বলেছেন, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হোক বা প্রতিষ্ঠান তারা নিজেদের শিশুর ভালোর জন্য যেভাবে ক্ষতিকারক দিকগুলো থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেন, সেভাবে শিক্ষার্থীদের মোবাইল থেকে বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন।

আরো পড়ুন: ছুটিতে কী করবেন শিক্ষার্থীরা?

এক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বৈধ এবং শরীয়ত সম্মত যে কোন পন্থায় কখনো কঠোরতা ও কখনো নমনীয়তা অবলম্বন করবেন এটাই স্বাভাবিক।

তিনি আরো যুক্ত করেন, যে সমস্ত রোগ এবং সমস্যা মানুষের মাঝে বারবার দেখা দেয়, এগুলোকে সব সময় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয় , তাই মোবাইল জাতীয় জিনিসের ক্ষেত্রে সব সময় নিয়মকানুনগুলোকে পর্যবেক্ষণে রাখা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কোন এক সময় নিয়ম করে পরবর্তীতে এ ব্যাপারে কোন খোঁজখবর না রাখলে তা কখনো কার্যকর কোন পদ্ধতি হতে পারে না।

আরো পড়ুন: ইফতা বিভাগুলোর বোর্ড নিবন্ধন কতটা জরুরি, কী ভাবছে কর্তৃপক্ষ!

মোবাইল ইলমে দ্বীন অর্জনে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এক্ষেত্রে তিনি আশরাফ আলী থানভী রহ.- এর একটি নসিয়তকে সামনে রেখে বলছেন- ‘যেখানে থানভী রহ. ইলমের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ইলম এমন জিনিস যা গুনাহের মাধ্যমে দূর হয়ে যায়’। আর মোবাইল- ইন্টারনেট প্রায় পুরোটাই গুনাহের মাধ্যমগুলোতে ভরপুর তাই ইলমে দ্বীনের অর্জন ও পড়াশোনায় একাগ্রতার জন্য শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মকভাবে  মোবাইল থেকে দূরে থাকা একান্ত প্রয়োজনীয়।

আরো পড়ুন: কওমি মাদরাসা রাজনীতি মুক্ত থাকবে: ব্যাখ্যায় চার বুদ্ধিজীবী আলেম

এছাড়া তার মতে, শিক্ষার্থীদের মোবাইল থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদেরও মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার থাকাটা একান্ত কাম্য। অভিভাবকদের আচরণেই এটা বোঝানোর প্রয়োজন- কোন খাম খেয়ালি নয়, একান্ত প্রয়োজনেই মোবাইল ব্যবহার করে করে থাকেন অভিভাবকরা-বলছিলেন মাওলানা তাহমীদুল মাওলা।

-ওআই/আবদুল্লাহ তামিম

সর্বশেষ সব সংবাদ