fbpx
           
       
           
       
শিরোনাম :
মাদকের ছোবলে দেশ: দায়ী কারা?
মার্চ ২০, ২০২১ ৭:৩০ অপরাহ্ণ

মোস্তফা ওয়াদুদ: মাদকে আসক্ত বা মাদকাসক্ত সমাজের এক কালো অভিশাপ। এর কারণে শুধু মাদকাসক্ত ব্যক্তিরই ক্ষতি হয়না। বরং ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবার। ধীরে ধীরে সে পরিবারের ছোঁয়া লাগে সমাজে। ছেয়ে যায় পুরো সমাজে। ধ্বংস হয় একটি রাষ্ট্র। বিশেষত বর্তমানে মাদকের আগ্রাসন গ্রাস করছে তরুণ সমাজকে। সমাজে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক। একটি দেশের উন্নতি অগ্রগতি নির্ভর করে যুব সমাজের কর্মক্ষমতার ওপর। সেই যুব সমাজ যদি মাদকাসক্তিতে ঝুঁকে পড়ে তাহলে জাতীয় অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

পরিবারের মাদকাসক্তকে নিয়ে অভিভাবকরা দিশেহারা। কিভাবে এর থেকে পেতে পারে পরিত্রাণ? সে চিন্তায় বিভোর তারা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একটি গবেষণায় দেখা যায়, মাদক ব্যবহারকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই বয়সে তরুণ বা টিনএইজ। অথচ তরুণ বয়স হলো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। শিক্ষা, চাকরি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মোন্নয়ন এবং আধুনিক নগর গড়ায় তাদের ভূমিকা রাখার কথা। বিভিন্ন ঘটনাবহুল, চ্যালেঞ্জিং ও সমস্যাসংকুল পরিবেশ কাটিয়ে উঠে সুখী সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা হওয়ার কথা ছিলো তরুণদের। আর সে তরুণ কিনা মাদকে আসক্ত।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন তরুণ মাদকাসক্ত। আমাদের দেশে মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীর প্রকৃত সংখ্যা বলা কঠিন কারণ এ বিষয়ে কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা যায়, শিশু-কিশোরদের ০.৮ ভাগ মাদকাক্তির সমস্যায় ভুগছে। এটুকু বলা যায়, এ হার বাস্তব অবস্থার খণ্ডচিত্র মাত্র। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী যে কোনো বয়সী মাদকাসক্তের এ সংখ্যা প্রায় অর্ধকোটি। যাদের শতকারা ৮০ ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরেরে মধ্যে।

সমাজে মাদকের প্রতিরোধে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। তারপরেও কোনো মাদকাসক্তে আক্রান্ত হচ্ছে যুব সমাজ। জানতে চেয়েছিলাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বারের কাছে। তিনি আওয়ার ইসলামকে বলেন, ‘মাদকের সহজলভ্যতা, মাদক চোরাচালান, কৌতুহল, বন্ধুদের চাপ, আর্থ সমাজিক অবস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের মনোসামাজিক কারণে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। মাদকাসক্তি থেকে পরবর্তীতে চুরি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা।’

তিনি বলেন, ‘তবে মাদকের সহজলভ্যতা মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ হলেও একমাত্র কারণ নয়।’ তার যুক্তি হলো, ‘মাদকাসক্তির কারণ সম্পর্কে একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, ব্যক্তিগত হতাশা, ব্যর্থতা ও অপ্রাপ্তি। বিষয়টি এরকম হলে প্রায় সবাই মাদকাসক্তে আক্রান্ত হওয়ার কথা। কেননা সমাজে কে এমন আছে যে, হতাশায় ভুগেন না? বাস্তবে ব্যাপারটি অন্যরকম। তরুণদের ব্যক্তিত্বের বিশেষ বৈশিষ্ট্য-যেমন শৈশবে অপরাধ প্রবণতা ও আইন অমান্য করা, স্কুল পালানো ও ডানপিঠে স্বভাব ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ও বেপরোয়া আচরণ মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।’

এক গবেষণায় দেখা যায়, ‘টিনএইজে মাদকাসক্তির জন্য আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ হচ্ছে ধূমপান। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রায় সবাই (শতকরা ৭০-৮০ ভাগ) ধূমপায়ী। এ জন্য ধূমপানকে মাদকগ্রহণের সিড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধূমপানবিরোধী ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বেও তরুণ সমাজে এর আকর্ষণ কতটুকু কমেছে তা বলা মুশকিল।’

তরুণদের মাদকাসক্তির আরো অনেক কারণ রয়েছে; যেমন: অপরাধপ্রবণ ও মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত সামাজিক পরিবেশ, খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের অভাব, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ইত্যাদি।

মাদকাসক্তির প্রবণতাকে কিভাবে দূর করা যায়? সমাজ থেকে কিভাবে মুছে ফেলা যায় মাদকের মতো ভয়াবহ অভিশাপ? জানতে চেয়েছিলাম মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র রাজধানীর মালিবাগের ‘হলি লাইফ’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম, মাইনউদ্দিন আহমদ এর কাছে। তিনি বলেন, ‘মাদকাসক্তি একটি মানোসামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এজন্য মাদকাসক্ত তরুণকে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। আসক্ত হওয়ার পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, মাদক ব্যবহার না করলে তার অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হয়। এ কারণে মাদকাসক্ত ব্যক্তি একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে যায় এবং চাইলেও সে সহজে এর থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে না।’

মাদকাসক্তে আক্রান্ত একজন তরুণের অভিভাবক মো. হোসাইন আহমদ তরুণদের মাদকে আসক্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘ধর্মীয় অনুশাসন সঠিকভাবে মেনে না চলায় যুবসমাজে মাদকাসক্তের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, বন্ধুদের কুপ্রচারণা, অসৎ সঙ্গ, নানা রকম হতাশা ও আকাশ-সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার মূল কারণ। যারা নেশা করে তাদের অধিকাংশই জানে যে, নেশা কোনো রকম উপকারী বা ভালো কাজ নয় এবং এটা মানুষের জীবনীশক্তি বিনষ্ট করে।’

মাদকের ভয়াল থাবা থেকে ফিরে আসা যুবক আরিফ মাহমুদ। বাসা খিলগাঁও এলাকার গোড়ানে। মাদক নিরাময়ে অভিভাবকদের করণীয় কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আওয়ার ইসলামকে বলেন, ‘মাদক নিরাময়ে চাই পরিবারের আন্তরিকতা ও পারস্পরিক ভালোবাসা। ধর্মভীরু পরিবারের পিতা-মাতাই সন্তানকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারেন। পিতা-মাতারা যদি তাঁদের ব্যস্ত সময়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ সন্তানের জন্য বরাদ্দ রাখেন, তাদের ইসলামের বিধিবিধান ও ধর্মীয় অনুশাসন শিক্ষা দেন, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের জীবনের জটিল সমস্যাবলি সমাধানে অত্যন্ত সচেতন ও মনোযোগী হন, তাহলেই যুবসমাজে মাদকাসক্তির প্রতিরোধ বহুলাংশে সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘মাদক প্রতিরোধ করতে হলে ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবক ও মুরব্বিদের নিয়ে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে। মাদকাসক্তি ত্যাগে আসক্তদের উৎসাহিত ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ দলমত-নির্বিশেষে দেশের তিন লাখ মসজিদের ইমাম বা ধর্মীয় নেতাদেরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করা বাঞ্ছনীয়।’

সর্বোপরি, আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবন থেকে মাদকদ্রব্য উৎখাত এবং মাদকাসক্তি নির্মূল করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরকার মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধের জাগরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ এবং ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন। এমনটাই মনে করেন মাদকাসক্তে আক্রান্তদের অভিভাবকগণ।

এমডব্লিউ/

সর্বশেষ সব সংবাদ