কে এই মাওলানা ইসমাইল রেহান
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১ ১২:০৬ অপরাহ্ণ

যুবাঈর আহমাদ।।

সময়ের অন্যতম প্রসিদ্ধ ও মুনসিফ ইতিহাসবিদ, উম্মাহর দরদ-ব্যথা অন্তরে প্রবলভাবে লালনকারী, বিজয়ের শতাব্দীতে উম্মাহর সন্তানদের পুরনো সেই সোনালী দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে যিনি জীবন ওয়াকফ করে দিয়েছেন। নিজের কাজের মূল্যায়নে বাংলাদেশি এক মনীষীর ক’লাইনের মন্তব্য পেতে নিজেকে যিনি মুহূর্তেই একজন সাধারণ তালিবে ইলমের পর্যায়ে নিয়ে আসেন; তিনি মাওলানা ইসমাইল রেহান।

হাফেজ মাওলানা ইসমাইল জন্মেছেন করাচীতে। কিন্ত রক্তের সম্পর্ক তার পাঞ্জাবে। ইসলামাবাদ থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এগিয়ে গেলে আটক জেলা। এই জেলাতে অবস্থিত বিখ্যাত কিছু ঐতিহাসিক স্থান। মোগল দরবারের দুজন বিখ্যাত হেকিম ভাইয়ের মাকবারাও (হাকীমো কা মাকবারা) এখানে অবস্থিত। এটি পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা। এখানেই হাসান আবদাল এলাকায় খালিক দার গ্রামে তার স্থায়ী নিবাস। বাবার কর্মস্থলের সুবাদে তার জন্ম হয় করাচীতে। পহেলা ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১। আব্দুল আজিজেরর সুপুত্র হিসেবে তার প্রাথমিক নাম রাখা হয় মুহাম্মদ ইসমাইল। লেখালেখির সময় পুরো নাম মুহাম্মদ ইসমাইল রেহান ব্যবহার করেন। করাচীর পুরনো গোলিমার এলাকায় তিনি বড় হয়েছেন।

হিজরতের পর পূর্ব পাঞ্জাব থেকে লাখো মুহাজির এই এলাকায় এসে বসতি গড়েছিলেন। প্রাণচাঞ্চল্যে পূর্ণ ছিল এই এলাকাটি। প্রায় সকল এথনিক মাইনরিটি এই এলাকায় কালিমার পরিচয়ে একত্রিত হয়েছিলেন। বসবাস করতেন সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য নিয়ে।

তিনি বলেন, আমার পূর্বপুরুষরাও ইসলামি দেশে বসবাসের জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্বে হিজরত করেছিলেন। সময়ের ভাষা তাদের রিফিউজি বললেও নানাবাড়ির পুরনো দলীলে আমি ঠিকই ‘Muhajir Residential Allotment’ শব্দ দেখেছি। নিজ চোখে। আজও সময় পেলে দস্তাবেজগুলো খুলে দেখি। ঝাপসা চোখে ভেসে ওঠে পুরনো দিনগুলো। আশরাফানাল্লাহু বিল আউদাতি ইলাল ইমারাতি ওয়াল খিলাফাহ।

পারিবারিকভাবে একটি সাধারণ দ্বীনি পরিবেশে তিনি বেড়ে ওঠেন। মায়ের কাছে দ্বীনিয়াত বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় স্কুলে ফরমাল এডুকেশন গ্রহন করেন। মেধাবী ছাত্র মুহাম্মদ ইসমাইল বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৮৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর জীবন একটি আচমকা মোড় নেয়। ফরমাল এডুুকেশন থেকে দ্বীনি শিক্ষায় ধাবিত হন। ভর্তি হন দারুল উলুম করাচীতে। একদম প্রথম থেকে শুরু করেন। হিফজ করে কুরআন। কৈশোরের শেষপ্রান্তে এসে হিফজের চ্যালেঞ্জ এতটাও সহজ ছিল না। এই নেয়ামত তিনি তিন বছর কঠোর পরিশ্রম করে অর্জন করেন। এই সময়ে নিয়মিত শায়খুল ইসলামের ইসলাহী মজলিসগুলোতে বসতেন। ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত তিনি শায়খুল ইসলামের দ্বারাই হয়েছেন। শায়েখের মজলিসে শোনা ইসলামের হারানো ঐতিহ্য ও অতীতের গল্পগুলো তাকে মুগ্ধ করত। স্বপ্ন দেখতেন একদিন বড় হয়ে ইসলামের ইতিহাস নিয়ে শায়খুল ইসলামের মত গবেষণা করবেন। মুসলিম উম্মাহকে জানাবেন কত সমৃদ্ধ ছিল আমাদের অতীত। আর কত উজ্জ্বল আমাদের ভবিষ্যত।

হিফজুল কুরআনের পর বিলম্ব না করে প্রচলিত ধারার স্থানীয় দরসে নিজামীতে ভর্তি হয়ে যান। বাহাদুরাবাদ এলাকায় অবস্থিত জামেয়া মা’হাদুল খলীল আল ইসলামী থেকে ধারাবাহিক পড়াশোনার মাধ্যমে ১৯৯৫ সালে তাকমীল সমাপন করেন। পরে আবার বেফাকুল মাদারিসে তাকমীল পরীক্ষায় অংশ নেন ২০০১ সালে। অর্থাৎ দুবার তাকমীল সমাপন করেন তিনি। এর মাঝে সময়ের বিখ্যাত মুহাক্কিক গবেষক আল্লামা আবদুর রশীদ নু’মানীর শিষ্যত্ব অর্জনেরও সৌভাগ্য হয় তার। গবেষণার নানামুখী শিল্প ও কৌশল তিনি এই সময় রপ্ত করেন। এরই মাঝে সাধারণ শিক্ষা ও এই ক্ষেত্রে কিছু সনদের জন্য নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। ২০০৬ সালে করাচী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে বি.এ (সম্মান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এটি একটি প্রাইভেট প্রোগ্রাম ছিল। এই সময়ে ইসলামের ইতিহাস নিয়ে একটি গবেষণামূলক থিসিস লিখেন তিনি। পড়াশোনার ধারা এরপরেও অব্যাহত থাকে। ২০১০ সালে করাচীর উর্দু বিশ্ববিদ্যালয় (FUUAST) থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

বেফাক থেকে তাকমীলের পরপরই কর্মজীবনে পা রাখেন তরুণ মাওলানা। দীর্ঘ দুই দশক ধরে নানা বিষয়ে শিক্ষাদান করে আসছেন। আরবী ব্যাকরণের প্রাথমিক স্তরের বিষয়াদি যেমন নাহব, সরফ থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীস বিভাগে মুসলিম শরীফ পর্যন্ত পাঠদান করেছেন। এর মাঝে একাধারে পাঠদান করেছেন ফার্সি সাহিত্য, আরবি সাহিত্য, তাফসির, মিশকাত শরীফ, আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ি, ইবনে মাজাহ এবং মুসলিম শরীফ। পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাস নিয়ে বিশেষ কোর্সও নিয়েছেন দীর্ঘদিন। বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছুদিন প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান করেছেন। করাচীর বিখ্যাত জামেয়াতুর রশীদেও ইতিহাস বিভাগে খন্ডকালীন অধ্যাপনায় নিয়োজিত আছেন। গবেষণায় ব্যস্ত থাকলেও এখনো পাঠদানের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।

ব্যক্তিগতভাবে তিনি শায়খুল ইসলামের ব্যক্তিত্ব দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত। এছাড়াও সময়ের অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বিশেষত দেওবন্দী উলামাদের তিনি বিশেষ শ্রদ্ধা করে থাকেন। তার শিক্ষকদের অধিকাংশই দেওবন্দী চেতনার মশালবাহী। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সকল দলমতকে তিনি সবিশেষ সম্মান করে থাকেন। কোনো রাজনৈতিক দল বা মতের সাথে যুক্ত ছিলেন না কখনো। নিভৃতভাবে কাজ করতেই সাচ্ছ্বন্দ্য বোধ করেন তিনি। তবে দাওয়াত ও তাবলীগের সাথে বিশেষ সখ্যতা আছে তার। জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার পেছনেও এই মেহনতের শুকরিয়া আদায় করেন তিনি।

লেখালেখিটা বলা যায় তাকমীলের কিছুকাল পূর্ব থেকেই ধরেছিলেন। শুরুতে কলাম, প্রবন্ধ ও ইতিহাস নিয়ে ছোটগল্প লিখতেন। এরপর ধীরে ধীরে ইতিহাসের গলিপথে ও আলোকজ্জ্বল চৌমহনীগুলোতে শুরু করেন আনুষ্ঠানিক ও অনুসন্ধানী অনুপ্রবেশ। সুদীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ধারায় লোকমুখে চলে আসা অসংখ্যা ঐতিহাসিক অসত্য আর অজ্ঞানতাকে আলোয় নিয়ে আসতে দিনরাত আর বছরকে একাকার করে ফেলেন। এক একটি গবেষণায় ব্যয় করেন বছরের পর বছর সময়।

শুধুমাত্র খাওয়ারিজম শাহের ইতিহাস নিয়েই কাজ করেছেন সুদীর্ঘ প্রায় এক যুগ। ‘খাওয়ারিজম সম্রাজ্যের ইতিহাস’ নামের বইটি নাশাত পাবলিকেশন্স থেকে বাংলায় দুইখন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। সুলতান আইয়ুবীকে নিয়েও যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বাধিক পরিমাণ লিখেছেন তিনি। প্রায় হাজার পৃষ্ঠার মত। এটি যে কোনো ভাষায় সুলতানকে নিয়ে করা সবচেয়ে বিস্তারিত কাজ। আফগানিস্তানের ইতিহাস নিয়েও লিখেছেন হাজার পৃষ্ঠার বেশি। যে বিষয়ে হাত দিয়েছেন, বিশুদ্ধতা ও ভারসাম্য বজায় রেখে ইতিহাসের সুনিপুণ ছবি একে প্রতিটি পরতের শিক্ষা নিয়ে এসেছেন উম্মাহর সামনে। সমসাময়িক বেশ কিছু ইতিহাসবিদ শিক্ষণীয় আঙ্গিকে ইতিহাস তুলে ধরলেও এই মাওলানার জীবন ও কলম দুটোই তার আবেগকে পাঠকের হৃদয় একদম ছুঁয়ে দেয়। বিস্তৃত অধ্যয়নকারী পাঠকমাত্রই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে।

বিগত প্রায় এক দশক ধরে তিনি কাজ করে চলেছেন মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস নিয়ে। শুরুতে তার পরিকল্পনা ছিল ছয় খন্ডে তিনি সুবিধাল এই কর্মযজ্ঞটি সম্পাদন করবেন। কিন্ত সর্বশেষ অবস্থা কী দাঁড়াবে তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সিরিজটি সাত খন্ডেও পৌছতে পারে। এই সিরিজের পরিচয় ও তার অসংখ্যা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ইতোমধ্যেই বঙ্গীয় সমাজে আলোচিত হয়েছে। উম্মাহর ইতিহাসকে বিশুদ্ধতা ও ইনসাফের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন দেওবন্দী এই মাওলানা।

সাংবাদিকতাতেও ঝোঁক তার। বেশ কিছু মাসিক ও পাক্ষিক পত্রিকায় কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। ২০০৬ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মাসিক সুলূক ও ইহসান পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। শিশুদের জন্য প্রকাশিত একটি পত্রিকা ‘শিশুদের ইসলাম’-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দীর্ঘ আট বছর। নারীদের নিয়ে প্রকাশিত ‘ইসলামের নারীরা’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন তিন বছর। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত। বিখ্যাত পত্রিকা ‘রোজনামা ইসলাম’-এ কলাম লিখছেন দীর্ঘ দুই দশক ধরে। তবে কলাম লিখে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন ‘যরবে মুমিন’ পত্রিকায়। প্রায় ২১ বছর ধরে নিয়মিত কলাম লিখে আসছেন তিনি। বেশ কিছু গ্রন্থ এই ধারাবাহিক কলাম লেখনী থেকেই আলোয় এসেছে। যেমন, তারীখে আফগানিস্তান, খাওয়ারিজম শাহ ও তাতার আগ্রাসন।

বর্তমানে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পে ব্যস্ত সময় পার করছেন সময়ের অন্যতম প্রসিদ্ধ এই গবেষক। প্রথমত তারীখের প্রকল্পটি শেষ করার জন্য দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি নিজ এলাকা হাসান আবদালে দারুল কুরআন নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আটক জেলার একটি বিখ্যাত যায়গা এই তাহসীল হাসান আবদাল। প্রি-ইসলামিক ইতিহাস থেকে শুরু করে মোগল আমলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের সাক্ষী এই অঞ্চল। মাওলানার বর্তমান অবস্থান আপাতত এখানেই। দিনরাত গবেষণায় মগ্ন থেকে কাজ করেন আর প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়াদি দেখভাল করেন।

ইতিহাস গবেষণায় প্রসিদ্ধি পেলেও তিনি শিশুদের নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন। ইসলামি সমাজ বিনির্মাণে শিশুতোষ সাহিত্যের বিকল্প নেই। এই চিরায়ত সত্যটি তিনি শুরুতেই অনুধাবন করেছিলেন। ফলে শিশুতোষ পত্রিকার সম্পাদনার পাশাপাশি শিশুদের জন্য বেশ কয়েকটি গ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি। এর মাঝে ‘আস্তিনের সাপ’ বেশ সুখপাঠ্য। বর্তমানেও ‘এসো বাচ্চারা ইসলামকে জানি’ নামে একটি সিরিজ নিয়ে কাজ করছেন। ‘এসো বাচ্চারা গল্প শোনো!’ নামেও একটি সিরিজ তিনি নির্মাণ করছেন। এছাড়াও তার কলামসমগ্র ছেপে এসেছে ‘বারাহেরাস্ত’ শিরোনামে।

মাত্র ৫০ বছর বয়সী এই মাওলানা নিজেকে উম্মাহর আগামী দিনের পথচলার আয়না তৈরিতে বিলিয়ে দিচ্ছেন। বিশুদ্ধ ইতিহাস ও ইতিহাস থেকে নেয়া উপযুক্ত শিক্ষাগুলো এমন হৃদয়গ্রাহী মনোভাবে তুলে ধরেন যে সচেতন ও সামান্য দীনি চেতনাদীপ্ত পাঠকের হৃদয়কেও তা ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। তাইতো তার কলাম নিয়মিত উম্মাহর সিংহ শার্দুলরা তাদের মাসিক পত্রিকায় ছেপে থাকেন। উম্মাহর জন্য তার এই ‘মুখলিসানা আন্দাজ’ সকলকেই মোহিত করে।

ওআই/আব্দুল্লাহ আফফান