198571

‘বেফাক ও হাইআর সভাপতি নির্বাচনে আবেগকে পরিত্যাগ করুন’

মুফতি ইউসুফ সুলতান।।
পিএইচডি গবেষক, হেড অব শরিয়াহ, ইথিস ডেঞ্চারস, মালয়েশিয়া>

বেফাক ও হাই’আর সভাপতি নির্বাচনে আবেগকে পরিত্যাগ করুন। আমানাহ ও ক্বুওয়াহ-ই হোক নেতৃত্বের মানদণ্ড। পরিচিতি, বয়স – এসব সহায়ক হতে পারে, কিন্তু যোগ্যতার নির্ণায়ক নয়। বরং অতি পরিচিতি ও বেশি বয়স্ক হওয়া অনেক সময় দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধক হতে পারে। এটা একটা বৃহৎ দায়িত্বের পদ, কাজেই ‘দায়িত্ব সম্পাদনই’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নেতৃত্ব ও দায়িত্বের অপরিহার্য দুটো গুণ হলো ক্বুওয়াহ – শারীরিক, মানসিক ও জ্ঞানগতভাবে কার্যসম্পাদনে সক্ষম হওয়া, এবং আমানাহ – প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি, সম্পদ ও যাবতীয় দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার স্বাক্ষর দেয়া। মূসা আ. যখন মাদয়ানে যান, শুয়াইব আ. এর এক কন্যা তাঁর বাবার কাছে প্রস্তাব রাখেন যেন মূসাকে আ. কাজে রাখা হয়, কারণ তিনি ক্বাউয়ী এবং আমীন। (সূরা কাসাস: ২৬) ওদিকে ইউসুফ আ. নিজেকে খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রাখার আবেদনে নিজের যোগ্যতা হিসেবে তুলে ধরেন যে তিনি হাফীয ও আলীম। (সূরা ইউসুফ: ৫৫)। হাফীয ও আলীম তথা সংরক্ষণকারী ও জ্ঞানী, এ দুটো পূর্বোক্ত দুটো গুণের ভেতরই আছে।

শক্তি-সামর্থ্য ও বিশ্বস্ততা – দায়িত্ব ও নেতৃত্বের অপরিহার্য দুটো গুণ

মূসা আ. যখন মাদয়ানে যান, শুয়াইব আ. এর এক কন্যা তাঁর বাবার কাছে প্রস্তাব রাখেন যেন মূসাকে আ. কাজে রাখা হয়, কারণ তিনি ক্বাউয়ী এবং আমীন। (সূরা কাসাস: ২৬) ওদিকে ইউসুফ আ. নিজেকে খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রাখার আবেদনে নিজের যোগ্যতা হিসেবে তুলে ধরেন যে তিনি হাফীয ও আলীম। (সূরা ইউসুফ: ৫৫)

উপরোক্ত দুটো ক্ষেত্রে সাধারণভাবে একজন দায়িত্বশীলের দুটো অপরিহার্য যোগ্যতা উঠে এসেছে। ক্বাউয়ী ও আমীন, তথা শক্তি-সামর্থ্য ও বিশ্বস্ততা। আর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে দরকার আরো দুটো গুণ – হাফীয ও আলীম তথা সংরক্ষণকারী ও জ্ঞানী, যদিও এ দুটো পূর্বোক্ত দুটো গুণের ভেতরই আছে।

এই নোটে বাহরাইনভিত্তিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মানদন্ড প্রনোয়নকারী প্রতিষ্ঠান AAOIFI কর্তৃক প্রকাশিত Code of Ethics for Islamic Finance Professionals বা ইসলামিক ফাইন্যান্স প্রফেশনালদের জন্য নৈতিকতার কোড থেকে ক্বাউয়ী ও আমীন -এর বিশ্লেষণ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যারা নোটে এসেছেন, সকলকেই সময় নিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়ার অনুরোধ করব। কোনো প্রকার অতিরঞ্জিতা বাদ দিয়ে মূল পয়েন্টগুলো লেখার চেষ্টা করেছি। ধন্যবাদ।

ক্বাউয়ী
ক্বাউয়ী এসেছে ক্বুওয়াহ থেকে, অর্থ শক্তিশালী, সামর্থ্যবান। কর্মক্ষেত্রে সামর্থ্য বলতে যা বুঝায়:

১. দক্ষতা: নিয়োগকৃত কাজটি সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা কর্মঠ হওয়া, অলসতা পরিহার করা

কাজের আউটপুট ভালো মানের হওয়া, অসম্পূর্ণ কাজ জমা না দেয়া যথোপযুক্ত ক্ষেত্রে ঠিক মতো রেকর্ড ও ডকুমেন্টেশন সংরক্ষণ করা।

অযথা কাজ করতে বিলম্ব না করা সময়মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারা, সহজ বা কঠিন যে কোনো বিষয়ে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভালোভাবে প্রস্তুত থাকা (কাজ, প্রজেক্ট বা মিটিংয়ের জন্য) অন্যের কাছ থেকে শেখা নিজেকে সবসময় নজরে রাখা, ভুলগুলো উত্তরোত্তর শুধরে নেয়া
বিভিন্ন মেন্টরের কাছ থেকে শেখা ও উপদেশ নেয়া

২. আইন মেনে চলা: প্রতিষ্ঠানের নিয়ম লঙ্ঘন না করা, প্রযোজ্য অন্য কোনো আইন লঙ্ঘন না করা
৩. ব্যক্তিগত উন্নয়ন

ক. জ্ঞান:
ধর্মীয় জ্ঞান আহরণ করা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও স্কিল উত্তরোত্তর ডেভেলপ করা অন্যকে শেখানো, অন্যের সঙ্গে জ্ঞান শেয়ার করা
দলীলের ভিত্তিকে ক্রিটিকাল চিন্তা করার যোগ্যতা অর্জন করা।

খ. স্কিল:

সময় ব্যবস্থাপনা শেখা। দলীয়ভাবে কর্ম সম্পাদন বা টিম ওয়ার্ক শেখা। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। অন্যের সঙ্গে প্রোডাক্টিভ সম্পর্ক বজায় রাখা। অন্যকে নেতৃত্ব দেয়া, উৎসাহ দেয়া। প্রজেক্ট ম্যানেজ করতে শেখা।

গ. মনোভাব। জীবনভর শেখায় যুক্ত থাকা, নতুন কিছু শেখার ব্যাপারী উৎসাহী হওয়া। অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞ ও দয়াশীল হওয়া। দায়িত্ব নেয়া, দায়িত্বকে সুযোগ হিসেবে দেখা। সততা ও যথার্থতার দিকে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা। সাহসী হওয়া, বিশেষ করে প্রয়োজনের সময় সত্য উচ্চারণে অহংকারী না হওয়া (আলোচনায়, মিটিংয়ে অন্যের মতামতের প্রতি সহনশীল হওয়া)

আমীন
আমীন এসেছে আমানাহ থেকে, মানে আমানতদার। কর্মক্ষেত্রে আমানতদারিতা লঙ্ঘন হয় যাতে:

ক. মানুষের প্রতি: ক১. স্টাফ: ১. এম্পাওয়ারমেন্ট বা ক্ষমতায়ন না করা: কাজ সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় রিসোর্স, ট্রেইনিং ও ক্ষমতা প্রদান না করা ২. অমানুষসুলভ আচরণ করা, অন্যের সুস্থতা ও ভালো থাকার প্রতি লক্ষ্য না রাখা ৩. নিয়োগকৃতর কাজ-জীবনের ভারসাম্য নষ্ট করা

৪. ঝগড়া বা দ্বিমতের ক্ষেত্রে অন্যকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করা।

ক২. হয়রানি করা: ১. ভায়োলেন্স বা হিংস্রতা: শারীরিক বা মৌখিকভাবে কোনো ক্ষতি সাধন করা ২. এবিউজ বা অপব্যবহার:
সবার সামনে অপমান করা

মব্বিং: ইচ্ছাকৃতভাবে (দলগতভাবে) কাউকে প্রতিষ্ঠান থেকে জোর করে বের করে দেয়ার চেষ্টা করা। বুলিং/হুমকি দেয়া: ভয় দেখানো বা আক্রমণাত্মকভাবে অন্যকে প্রভাবিত করা।

সাবোটেজিং: অন্যকে কাজ শেষ করতে বাধা দেয়া বা তাদেরকে অন্যের চোখে খারাপ দেখানো। অব্যবস্থাপনাযোগ্য কাজ বরাদ্দ করা: এমন কাজের চাপ দেয়া যা কেবলমাত্র অতিরিক্ত কর্মঘন্টা বা রিসোর্সের মাধ্যমে সম্পাদন করা সম্ভব, যা ক্রমাগত একজনের জীবনকে অসহায় করে দেয়।

অসম্পূর্ণ কাজ বরাদ্দকরণ: এমন কাজ দেয়া যা কোম্পানির মূল লক্ষ্য ও কৌশলে যথেষ্ট অবদান রাখে না। ধারাবাহিকভাবে কাউকে অন্যের কাজ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজ করতে দেয়া।

ব্যক্তিগত কাজ বরাদ্দ করা: ব্যক্তিগত বা আনঅফিসিয়াল কাজ, যার সাথে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নেই। কোন কাজই না দেয়া বা অতি সামান্য কাজ বরাদ্দকরণ: এমন কাজে নিযুক্ত করা যা কর্মীর জ্ঞান এবং দক্ষতার স্তরের তুলনায় উপযুক্ত নয়। গুরুতর সমস্যা বা প্রচেষ্টাকে তুচ্ছ করে তোলা: কোনও বিষয়কে সত্যিকারের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা বা তুচ্ছ বিষয়কে গুরুতর মনে করা অশ্লীলতা: আপত্তিজনক বা বর্ণবাদী উপকরণ তৈরি করা বা শেয়ার করা।

যৌন নির্যাতন: ক৩. ইম্মডেস্টি বা অশোভনতা: নির্লজ্জতা। অনুপযুক্ত পোশাক পরিধান করা। শরীয়াহর বিধির বাইরে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।

আত্মাভিমান: সম্পদ ও ক্ষমতা মাধ্যমে লোক-দেখানো, শো অফ এবং ইমপ্রেস করার চেষ্টা করা।

খ. সম্পদ

খ১. প্রতিষ্ঠানের সম্পদ:

চুরি করা

অপব্যবহার: মিথ্যা বা প্রতারণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ গ্রহণ করা। অপব্যয় করা: অতিরিক্ত খরচ করা বা অপচয় করা

> অপব্যয় বুঝার জন্য কয়েকটি প্রশ্ন:
১. এটা কি হালাল?
২. এটা কি দরকারি?
৩. এর চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন আছে কি?

৪. এটা কি পুরোপুরি কাজে হবে/হয়েছে নাকি আংশিক অপচয় হবে/হয়েছে?
৫. সামাজিকভাবে এটাকে স্বাভাবিক ব্যয় না অতিরিক্ত হিসাবে মনে করা হয়?

ব্যয়কুণ্ঠতা: প্রয়োজনের তুলনায় কম ব্যয় করা। অত্যধিক লোভ। ঘুষ নেয়া/দেয়া। প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিরাপদভাবে সংরক্ষণ না করা। অন্যের সম্পদের অননুমোদিত ব্যবহার।

খ২. প্রতিষ্ঠানের তথ্য। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অংশীদার বা চুক্তির ফলাফলকে বিভ্রান্ত করতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনের পরিবর্তন করা। ব্লাকমেইল বা হুমকি দেয়া। অন্যের গোপনীয় বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা। গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা: মালিক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি ব্যতীত গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করা।

গীবত/ পরনিন্দা করা
খ৩. মেধাসত্ত্ব। কপিরাইট এবং পেটেন্ট লঙ্ঘন। তথ্য বা ড্যাটা চুরি/ অন্যের কাছে প্রকাশ করা বা বিক্রয় করা। বাণিজ্য গোপনীয়তা লঙ্ঘন।

খ৪. দায়িত্ব ও্ ক্ষমতা। অন্যায়কে ঢেকে রাখা: কোনও নৈতিক লঙ্ঘনের বিষয়ে লঙ্ঘনের অভিযোগ জানাতে ব্যর্থ হওয়া বা অনৈতিকতার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করা। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকাশ না করা: উদাহরণ: প্রতিষ্ঠানের রিসোর্স (যেমন, এমপ্লয়ির কর্মঘন্টা) নিজের কাজে/স্বার্থে লাগানো।

যোগাযোগহীনতা: যোগাযোগ করা, বুঝানো বা বুঝতে অসুবিধা হওয়া। পরামর্শের অভাব: ক্রিটিকাল বিষয়াদিতে, বিশেষ করে যেগুলোতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বা সুনাম প্রভাবিত হতে পারে, সেগুলোতে যোগ্য ব্যক্তি বা পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ না করা
স্ব-জবাবদিহিতার অভাব: নিজের পদক্ষেপের দায়িত্ব/মালিকানা নিতে রাজি নয়।

অন্যের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হওয়া। অপশাসন: নিয়ম, নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগের অভাব। কর্তব্যে অবহেলা
অযোগ্য লোকদের ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়োগ দেওয়া।

বিশ্বাসঘাতকতা। দুর্বল সিদ্ধান্ত গ্রহণ: যথাযথ যৌক্তিকতা এবং প্রমাণ ছাড়াই সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়া করা। প্রতিষ্ঠানের সর্বোত্তম স্বার্থের অনুকূলে কাজ না করা

-এটি

ads