195709

ট্রলারডুবিতে নিহত: মাওলানা সাইফুল ইসলাম একজন নিবেদিত তরুণ ছিলেন

সুলাইমান সাদী।।

একজন হৃদয়বান বন্ধু। একজন নিবেদিত তরুণ। উদ্যোমী কর্মবীর। স্বপ্নচারী শিক্ষক। যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে সাহসিকতার পরিচয় দিতে এতটুকুন পিছপা হতেন না হাফেজ মাওলানা শহীদ সাইফুল ইসলাম রহ.। একজন মানুষের চলে যাওয়া যে আমাদের জন্য কতটা শূন্যতা তৈরি করতে পারে সেটা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি।

সম্প্রতি এক ট্রলারডুবিতে আলেম-ওলামা ও মাদরাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ১৮ জন তরুণ মর্মান্তিকভাবে শহিদ হয়েছেন। গত ৫ আগস্ট নেত্রকোনার মদনে এ ঘটনা ঘটে। আমার বন্ধু, প্রাণাধিক ভাই মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ.-ও সেই জান্নাতি দলের একজন। বলতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলার রেজামন্দির ওপর সন্তুষ্ট না থেকে কি উপায় আছে?

ময়মনসিং সদরের চরখরিচার মাদরাসায়ে মারকাযুস সুন্নাহর মুহতামিম হাফেজ মাহফুজুর রহমান রহ.-এর নেতৃত্বে এলাকার তরুণ আলেমদের একটি দল মদনের মিনি কক্সবাজার খ্যাত উচিতপুরের হাওড়ে ঘুরতে যান।

উচিতপুর ঘাট থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ৪৮ জন পর্যটকসহ যাত্রা করে রাজালীকান্দার রামদীঘা বিলে পৌঁছেতেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১৮ জন যাত্রী নিখোঁজ হন। ১৭ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। ১ জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাকি ৩০ জন তীরে উঠতে সক্ষম হন।
আটটা বছর হয়ে গেছে মাওলানা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্বের। জামিয়া মাদানিয়া বারিধারায় শরহে বেকায়া পড়ার সময় থেকে ওর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। পড়াশোনা, খাওয়া, পরা, ঘুম, গল্প, ঘোরাঘুরি সব করেছি একসঙ্গে।

আট বছরের দীর্ঘ সময়ে আমার জন্য ও সবসময়ই একটি ছায়াআশ্রয় ছিল। ক্লাসের পড়াশোনাকে কেন্দ্র করেই ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব। কিভাবে সেটা বন্ধুত্ব থেকে ভ্রাতৃত্বে পরিণত হয়েছিল বুঝতেই পারিনি। বাকি পড়াশোনার পুরোটা সময়, ফারেগ হওয়ার পরও কয়েক বছর নাগাদ এক মুহূর্তের জন্যও ও আমাকে দূর হতে দেয়নি।

আমি স্বাভাবিকভাবেই একটু অগোছালো ছিলাম। ও আমার সব বিষয়েই খেয়াল রাখত। আমার ক্যারিয়ার নিয়ে সবসময়ই চিন্তা করত। গত একদেড় বছর ধরে দুজনই যার যার ব্যস্ততা নিয়ে মোটামুটি ডুবে আছি। তবু আমাদের দেখা-সাক্ষাত, ফোনালাপ হয়েছে নিয়মিত। ওকে এভাবে হারিয়ে ফেলা আমার জন্য অনেক বড় একটি শূন্যতা। এ শূন্যতা সত্যি পূরণ হবার নয়।

মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ. চলে গেছেন। তার বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব, উদ্যোম, সাহস ও জীবনীশক্তি রেখে গেছেন। রেখে গেছেন তার বাবা-মা, স্ত্রী, দুটো সন্তান, ছোট দুটো ভাই।

দুবছরের একটি ছেলে, এক বছর বয়সের একটি ফুটফুটে মেয়ে। ওরা আজ এতিম। ভাবতেই বুকে পাথর নেমে আসছে। ছোট ছোট ভাই। ওদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আরো বেশি ছোট মনে হচ্ছিল আমার। অথচ বড় ভাই হিসেবে মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ.-এর শূন্যতা ক্ষাণিকটা হলেও দূর করার কথা আমার। কিন্তু এমন একজন উদ্দীপ্ত মানুষের শূন্যতা পূরণ করা কি আদৌ সম্ভব?

মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ.-এর বাবা-মা আমাকে সবসময়ই সন্তানের মতো আদর করেছেন, আপ্যায়ন-যত্ন করেছেন। তাঁদের বুকের শূন্যতা কি করে পূরণ করব আমি আমার এতোটা ক্ষুদ্রতা নিয়ে? ছোট দুটো ভাই। মাওলানা মুফতি সাইদুল ইসলাম। হাফেজ কারী রাকিবুল ইসলাম। দুজনকেই পড়াশোনা করিয়েছে, বিয়ে করিয়েছে। বাড়িতে ঘরদোর করেছে।

বাবা-মা তিন ছেলে, তিন বউ ও নাতি-নতনীদের নিয়ে সাদাসিধা ও সুখী জীবনযাপন করছিলেন। হঠাতই যেন সব ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। ঘরের বড় ছেলের অভাব কি অন্যকিছুতে পূরণ করা সম্ভব? ওদের এ কান্নার অশ্রুতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিবা করতে পারি আমি?

হাফেজ মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ. কতটা নিবেদিত ছিলেন দুয়েকটা উদাহরণ দিলেই বুঝে আসে। ও সেই হেদায়েতুন্নাহু থেকেই বারিধারা মাদরাসায় পড়াশোনা করেছে। মাদরাসাকেই নিজের বাড়িঘর হিসেবে দেখেছে। মাদরাসার যে কোনো প্রয়োজনে নিজেকে নিবেদন করতে একটু পিছপা হয়নি।

সম্প্রতি করোনার কারণে মাদরাসার সব শিক্ষার্থী যার যার বাড়িতে অবস্থান করছে। কিন্তু মাওলানা সাইফুল ইসলাম আগে থেকেই মাদরাসার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রেখেছে। এমন কি শিক্ষার্থীশূন্য মাদরাসার বর্তমান পরিস্থিতির কথা ভেবে ঈদের আগে বাড়ি ছেড়ে বারিধারায় চলে যায়। হুজুরদের নির্দেশে কুরবানির কাজে সাধ্যমতো শরিক হয়েছে। বরাবরের মতো এবারও সে মাদরাসায় ঈদ করতেই স্বতস্ফূর্ততা অনুভব করেছে।
অল্পকিছুদিনের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে। নিজের বাড়িতেও একটি প্রাথমিকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার জন্য ব্যাকুল ছিল। শুরুও করেছে।

শুধু মাদরাসা বা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিল হাফেজ মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ.।
বিশেষ করে আমি যেখানে যা করেছি সেখানে ও কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে। সাধ্যানুযায়ী খেদমত করার চেষ্টা করেছে। দেশের প্রথম সারির ইসলামি অনলাইন নিউজ পোর্টাল আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে শুরু থেকেই আমি ছিলাম। এখনো আছি নানাভাবে।

আওয়ার ইসলাম শুরু হওয়ার আগে থেকেই এর প্ল্যান-পরিকল্পনা যখন করা হচ্ছিল অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে তখন থেকেই আমি সঙ্গে ছিলাম। মাওলানা সাইফুল ইসলামও ছিলেন আমার সঙ্গে পুরোটা সময় জুড়ে।

মনে পড়ে হেফাজতের উত্তাল সেই দিনগুলোর কথা। তখন আমরা জালালাইন পড়ি। সে বছর বেশ কয়েক মাস আওয়ার ইসলামের সম্পাদক হুমায়ুন আইয়ুবের সঙ্গে আমরা বাংলাদেশ মানবউন্নয়ন ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কার্যকমে একসঙ্গে শরিক ছিলাম। সে দিনগুলো কতটা রঙিন ছিল, উদ্যোমের ছিল মনে পড়লে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি।

আওয়ার ইসবলামের বর্তমান ডেপুটি এডিটর আব্দুল্লাহ তামিম, এ ছাড়াও ওমর শাহ, আমিন ইকবাল, রিপ্রেজেন্টিভ রায়হান ভাই, রাহমানী পয়গামের নজরুল ভাই, সুমন ভাইসহ আরো অনেকে মিলে সেই যে স্বপ্ন বুননের যাত্রা শুরু করেছিলাম, আজও থেমে নেই। থেমে গেছে শুধু একটি স্বপ্নকলি। হাফেজ মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ.।

কত কত পরিচয়ের দীর্ঘসূত্রতা রেকে মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ. আমাদের ছেড়ে মহান রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিয়েছেন তার কোনো হিসেব কষা মুশকিলই বটে। আশা করি আল্লাহ তাআলা তার এ শাহাদাত কবুল করবেন। তাকে জান্নাতি পাখিদের সারিতে ওড়ার জন্য সবুজ ডানা দেবেন।

বারিধারা মাদরাসার কর্তৃপক্ষ, প্রক্তন ও বর্তমাণ শিক্ষার্থী, আমাদের সহপাঠী; আওয়ার ইসলাম পরিবার, পাঠকশ্রেণিসহ সারাদেশের সবার প্রতি নিবেদন থাকবে, সবাই আমাদের সবার প্রিয়, আমার ভাই হাফেজ মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ.-এর জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে দোয়া করবেন। তার সঙ্গে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করা অন্যান্যদের জন্যও দোয়া করবেন।

শহিদদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি সবাইকে যেন আল্লাহ তাআলা সবরে জামিল দান করেন সেজন্যও সবার কাছে দোয়াপ্রার্থী।
বিশেষ করে মাওলানা সাইফুল ইসলাম রহ. ও মাদরাসায়ে মারকাযুস ‍সুন্নাহর মুহতামিম হাফেজ মাহফুজুর রহমান রহ.-রা যেসব স্বপ্ন দেখেছিলেন সেগুলো যেন পূর্ণতা পায়, তাদের রেখে যাওয়া আমানতগুলো যেন সুন্দরভাবে টিকে থাকতে পারে তার জন্যও সবার সার্বিক দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।

লেখক: প্রকাশক, শাশ্বত

-এটি

ads