193763

কওমি মাদরাসার ছাত্রদের কেন মুসলিম জাতির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা উচিৎ: পালনপুরী রহ.

মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ.।।

শিক্ষাবর্ষ শেষে বিদায়ী দরসে পালনপুরী রাহ. ছাত্রদের উদ্দেশ্যে মূল্যবান উপদেশ মূলক আলোচনা করতেন। সহজে বোঝানোর স্বার্থে প্রশ্ন-উত্তর আকারে একটি বিষয় আলোচনা করতেন। তিনি বলতেন, তোমাদেরকে কে পড়িয়েছে? এমন প্রশ্ন করলে তোমাদের অনেকে বলবে, আমার আব্বা পড়িয়েছেন৷ কেউ বলবে, উস্তাদরা পড়িয়েছেন৷ ঠিক আছে, বুঝলাম। উস্তাদরা কিভাবে পড়িয়েছেন?

তাদের তো মুহতামিম মাসিক ওজিফা- ভাতা দেন। তারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে পড়ান৷ যদি তাদের বেতন ভাতা না দিত, তারা কি পড়াতেন? তারা এখানে কি কর্মক্ষেত্র গ্রহণ করতেন? হয়তো তারা অন্য কোন কাজ করে জীবিকা উপার্জন করতেন৷ এ পর্যায়ে হয়তো ছাত্ররা উত্তর দিবে,
হ্যা,হ্যা, আমাদের মুহতামিম সাহেব পড়িয়েছেন৷

তাদেরকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলি- মুহতামিম সাহেব কীভাবে পড়ালেন? তিনি তো মুসলিম জনসাধারণ থেকে চাঁদা করে ফান্ড তৈরি করে উস্তাদ , স্টাফদের মাসিক সম্মানী ভাতা দিয়ে থাকেন৷ থাকা খাওয়ার এবং ক্লাসরুমের ব্যবস্থা করেন।আর উস্তাদরা তোমাদের সিলেবাস অনুযায়ী পড়িয়ে থাকেন৷ মুসলিম জনসাধারণের দেয়া ৫-১০ টাকায় মাদ্রাসার ফান্ড হয়ে থাকে।এই ফান্ডের মাধ্যমে যথাযথ চাহিদা মোতাবেক বন্টন করে মাদরাসা চালান মুহতামিম সাহেব৷

যদি মুসলিম জনসাধারণ চাঁদা না দিতেন, মুহতামিম সাহেব তোমাদের পড়াশোনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক স্টাফবৃন্দকে কিভাবে পরিচালনা করতেন ? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকবৃন্দের বিশাল ব্যয় কোত্থেকে বহন করতেন?

এভাবে প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে ছাত্রদের সামনে একটি বাস্তব বিষয় ফুটে উঠে। এ পর্যায়ে মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহিমাহুল্লাহ বলতেন-
দেখো! বাস্তবে তোমাদের পড়ালেখার মৌলিক বিষয় টি জোগান দিয়েছেন, মুসলিম মিল্লাত- মুসলিম জনসাধারণ ৷ তাদের দানকৃত পয়সায় তৈরি করে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তাদের দানে মুহতামিম সাহেব উস্তাদ স্টাফদের ব্যয় বহন করেন। তাদের দান থেকে বেতন ভাতা, বিল, কর ইত্যাদি দিচ্ছেন৷ তোমাদের পড়ালেখা বই-পুস্তক খাবার দাবার অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সকল খরচ করে যাচ্ছেন।

এখন প্রথমত: দেখার বিষয় হল,তোমরা মিল্লাতের দানের টাকায় নিজেকে কতটুকু দ্বীনের খেদমতের জন্য প্রস্তুত করেছো? অর্থাৎ কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করেছ?

দ্বিতীয়তঃ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া থেকে ফারেগ হয়ে মুসলিম জনসাধারণকে কী দিবে?? কাওমের দ্বীনি খেদমতের জন্য কতটুকু নিজেকে উৎসর্গ করার প্রত্যয় নিয়েছো?

কওম ও জনসাধারণ তোমাদের দ্বীন শিখিয়েছেন, যদি তোমরা জনসাধারণের খেদমত করো, (যে কোনো ভাবে ই হোক) , তাহলে তুমি কাওমের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে৷ অন্যথায় তুমি জনসাধারণের টাকা-পয়সার অবমূল্যায়ন করলে।

তোমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, দীনী খেদমত। দ্বীনের খেদমতের জন্যে কোন নির্ধারিত বিষয় বা পথ নেই যে,এটাই করতে হবে৷ অর্থাৎ মসজিদ মাদ্রাসার খেদমতই করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়৷ যে কোনো দ্বীনি খেদমত করতে পারো৷ তাহলেই তোমার পড়া লেখা স্বার্থক৷
যদি তুমি কোন খেদমত করলে না।কিন্তু যা পড়েছো তা সংরক্ষণ করেছো, তাহলে তুমি ঐ সন্তানের মতো, যে নিজের অর্জন সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু পিতার কোন ক্ষতি করে নি৷

যদি এমন হয় যে, যা পড়েছো তা সংরক্ষণও করোনি, এলেম অনুযায়ী আমল করনি,নফসের চাহিদা মতো চলেছো৷ নামায পড়া ছেড়ে দিলে, চুপে চুপে বিড়ি পান করলে, ইত্যাদি শরীয়তবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়লে, আলিমের শান আত্মমর্যাদা কি সেটাও ভুলে গেলে -তাহলে তুমি মুসলিম মিল্লাতের লাখ লাখ অর্থ ভোগ করে-মাদরাসায় পড়ে “কুসন্তান”এর পরিচয় দিলে৷

তুমি সেই সন্তানের মতো হলে , যে পিতার অবদান ও তার কোন দয়া ও অনুগ্রহের মূল্য মূল্য দিল না। তার বাপ-দাদার বদনাম করলো। তোমাকে জনসাধারণ লাখ টাকা খরচ করে পড়িয়েছেন , তোমার ওস্তাদরা তাদের জীবন ক্ষয় করে যে এলাম তোমাদের মাঝে বিতরণ করেছেন, তুমি তার মূল্য দিতে পারোনি৷

পালনপুরী হযরত অত্যন্ত দরদ মাখা কন্ঠে বলতেন, কমছে কম তোমার নিজের প্রতি তো অনুগ্রহ করবে৷ আকাবির আসলাফ ও দীনি ক্ষেত্রে বড়দেরকে অনুসরণ করে চলবে।

প্রকৃত দাবী অনুযায়ী দায়িত্ব হল, মুসলিম জনসাধারণ এতদিন তোমাদের দ্বীনি এলেম শিক্ষা দিয়ে তৈরি করেছেন। এখন তোমরা দ্বীন ইসলামের খেদমত করার মাধ্যমে প্রতিদান দেওয়ার পালা৷ هل جزاء الإحسان إلا الإحسان

আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “উপকারের প্রতিদান উপকার ছাড়া আর কি হতে পারে। মুসলিম জনসাধারণ আমাদের উপর ইহসান করেছেন। আমাদেরও জরুরি হল আমরা তাদের সাথে ইহসান করা৷

যাদের দ্বীনের খেদমত করার যোগ্যতা তৈরি হয়েছে, তারা দ্বিতীয় ইক্বরা(দ্বীনি শিক্ষার খেদমত) শুরু করো৷ প্রথম ইক্বরার (দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের) মেয়াদকাল ১২ বছর৷ আর দ্বীতিয় ইক্বরার (দ্বীনি শিক্ষার খেদমতের) কোন সময় নেই৷ মৃত্যু পর্যন্ত চলবে৷ মৃত্যুর মাধ্যমে সে ইক্বরা শেষ হবে৷

যদি প্রথম ইক্বরাতে(শিক্ষাজীবনে) তোমার যোগ্যতা তৈরি না হয়, হতাশার কিছু নেই। মুসলিম জনসাধারণের খেদমাত করার অনেক পথ রয়েছে। যে কোনো একটাতে লেগে যাও৷ যেমন-তাবলীগে বের হও৷ মাদরাসা,মক্তবে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার খেদমত করো৷ যেই পরিবেশে তুমি থাকো, ওই পরিবেশে মহল্লাবাসীকে দ্বীনদার বানাও৷ দ্বীনের শিক্ষা দাও৷ এসবও খেদমত৷

কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা কোরআন হাদিসের আলোকে দ্বীনি এলেম অর্জন কারীদের যেই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, সেই দায়িত্ব পালনে সবকিছু উজাড় করে দিচ্ছেন।জান-মাল ইজ্জত সময় সব কিছু উজাড় করে দিয়ে ইসলামী শিক্ষা, তালিম, তাবলীগ,আত্মশুদ্ধি, জিহাদ, রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃত্ব দান সহ সকল ময়দানে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেদমত করে যাচ্ছেন।

যারা এভাবে নিঃস্বার্থভাবে খেদমত করতে পারছেন, তারাই প্রকৃত ওলামায়ে দেওবন্দের, তথা সাহাবা সালাফে সালেহীনের পথে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দিন৷

অনুলিখন: মুফতি সাইফুল ইসলাম মাদানী। মুহতামিম জামিয়া ইসলামিয়া বড় কাটারা মাদরাসা।

ad