193283

অবসর সময়: কওমি শিক্ষার্থীগণ যেভাবে কাটাতে পারেন

হাফেজ মাওলানা মূসা আল-কাযীম৷৷

সময় আমাদের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কর্তৃক অমূল্য নিয়ামত৷ আর অবসর সময় বুদ্ধিমান ও সচেতন মানুষের জন্য বোনাসতুল্য৷ অবসর সময়কেই একজন মানুষ নিজের জীবনের যে অঙ্গনে ঘাটতি রয়েছে সেটাকে পুষিয়ে নেয়ার মোক্ষম সুযোগ বলে গ্রহণ করে৷ সময়ের অপব্যবহারকারী জীবনে কখনো উন্নতি লাভ করতে পারেনা৷

আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে সময়ের শপথ করেছেন ৷ ইরশাদ হচ্ছে > কসম যুগের (সময়ের) নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের।
সূরা আ’সর

রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন > হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, এমন দুটি নিয়ামত আছে, যে নিয়ামতের বিষয়ে মানুষ ধোঁকার মধ্যে থাকে। তা হচ্ছে, সুস্থতা আর অবসর সময় (বুখারি)

বর্তমান বৈশ্বিক মহামারী করোনা পরিস্হিতিতে থমকে গেছে স্বাভাবিক জনজীবন ৷ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে বিশ্ব অর্থনীতি ৷ স্তিমিত হয়ে পড়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থিদের পড়া লেখার উদ্যম গতি ৷ চারদিকে শুধু হাহাকার আর হাহাকার ৷

এহেন পরিস্হিতিতে দীর্ঘ অবসরে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছে চার দেয়ালে বন্দি থাকা, পড়া-লেখা ও আমল-তরবিয়াতে মগ্ন থাকা, লক্ষ লক্ষ কওমী শিক্ষার্থীগণ ৷ নিয়ন্ত্রিত জীবনে বাধনহীন অনিয়ন্ত্রণ মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলে দিবে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন ৷ নিশ্চয় স্বাভাবিক সময়ের বহুল কাঙ্খিত ছুটি এখন যেন জীবনের সবচেয়ে বিরক্তি ও অসহ্যের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে ৷

হেলায় ফেলায় সময় নষ্ট না করে ঝালিয়ে নিতে পারি জীবনের ত্রুটিযুক্ত অঙ্গনগুলো, অতএব ঠিক করে নিতে পারি আমাদের করণীয় ৷

বিশুদ্ধ তিলাওয়াত>
এই অবসরে যাদের কুরআন তিলাওয়াতে ত্রুটি রয়েছে, তারা যে কোন একজন বিশুদ্ধ তিলাওয়াতকারীর শরণাপন্ন হয়ে সময়টাকে সবচেয়ে উত্তম কাজে ব্যয় করে তিলাওয়াতকে বিশুদ্ধ করে নিতে পারে ৷ বিশেষ করে যারা হাফেজ নয় এমন অনেক ছাত্রদের তিলাওয়াতে ত্রুটি রয়েছে, যার খেসারত ফারাগাতের পর হাড়ে হাড়ে দিতে হয় ৷

হিফজুল কুরআন>
অনেক হাফেজ ছাত্রদের ক্ষেত্রে ইয়াদের ত্রুটি রয়ে যায়, এই অবসর সময়টি তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷ কেননা এমন সুযোগ হয়তো জীবনে দ্বিতীয় বার আর নাও মিলতে পারে ৷ অপরদিকে যারা হিফজ পড়েনি, কিন্তু হিফজের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে, তারা বাড়ির মসজিদে আপন উদ্যোগে হিফজ করা শুরু করতে পারে ৷ এতে দেখা যাবে কুরআনের বেশ কয়েক পারা হিফজ করা সম্ভবপর হবে ৷ অদম্য ইচ্ছা, ইনহিমাক, মুওয়াজাবাত ও আল্লাহর সাহায্য থাকলে সবকিছুই সম্ভব ৷

বিষয় ভিত্তিক মুতালা’আ>
প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকাটাই স্বাভাবিক ৷ নাহু , সরফ , ফিকহ , আদব , বালাগাত ইত্যাদী বিষয়াবলী থেকে যে কোনো এক বা একাধিক বিষয়ের উপর একাধিক শরাহ দীর্ঘ মুতালা’আ করে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুবর্ণ সুযোগ ৷

দরসী কিতাব মুতালা’আ>
বর্তমান পরিস্হিতির বিবেচনায় মাদরাসাগুলো কবে খুলবে তা এখনো অনিশ্চিত, যারফলে বাড়িতে এই অবসরে প্রত্যেকে এ বছরের দরসী বিশেষ বিশেষ কিতাবগুলো শরাহ শুরুহাতের সহায়তায় নিজ দায়িত্বে নিজ কর্তৃক রূটিনমাফিক মুতালা’আ করতে পারে৷ অবশ্য সে ক্ষেত্রে বুঝে না আসা জটিল জায়গাগুলো পেন্সিল দিয়ে মার্ক করে রাখা যেতে পারে, যাতে পরবর্তিতে উস্তাদদের থেকে হল করে নেয়া যায়৷ অথবা ফোনের মাধ্যমে অভিজ্ঞ উস্তাদ থেকে হল করে নেয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে৷ আবার অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অন লাইনে বিভিন্ন কিতাবের দরস হচ্ছে, সেখানেও নজর রাখা যেতে পারে৷

সুন্দর হস্তলিপি>
হাতের লেখা সুন্দর হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ অনেক ছাত্রকেই দেখা যায় পড়া-লেখা শেষ পর্যায়ে অথচ হাতের লেখা তখনো অসুন্দর৷ অনেক মেধাবী ছাত্রকেও দেখা যায়, লেখা অসুন্দর হওয়ার কারনে পরীক্ষায় সেভাবে ভালো করতে পারেনা৷ এই অবসর সময়ে আরবী , বাংলা, উর্দু , ইংরেজী থেকে অন্তত যে কোনো একটি লেখার অনুশীলন করা উচিত, কারন অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যে কোনো একটি লেখা সুন্দর করলে অন্য লেখাগুলো খুব সহজেই আয়ত্বে চলে আসে৷

বাংলা সাহিত্য চর্চা>
এই অবসরে প্রিয় মাতৃভাষা, বাংলা সাহিত্য চর্চা নিজের প্রতিভাকে আরো একধাপ এগিয়ে দিবে৷ অনেক ছাত্রকেই দেখা যায়, বাংলা লেখায় অনেক ভুল যা বড়ই পরিতাপের বিষয়, কারন নিজের মাতৃভাষাই যদি কেহ বিশুদ্ধ বলতে ও লিখতে না পারে, তাহলে যেন সবই বৃথা ৷ বাংলা গদ্য , পদ্য , কবিতা , প্রবন্ধ , চিঠি-পত্র ইত্যাদী অনুশীলন করে সময়কে কাজে লাগানো যেতে পারে ৷

সাংস্কৃতিক চর্চা>
অনেক ছাত্রদের সাংস্কৃতিক চর্চায় আগ্রহী দেখা যায় তারা এই অবসরে হামদ-নাত, আযান, (বিশেষ করে) বক্তৃতা,বিভিন্ন ক্বারীদের তিলাওয়াত,মঞ্চে উপস্হাপনা,কবিতা পাঠ ইত্যাদী বিষয়গুলোর অনুশীলন করে সময়কে কাজে লাগাতে পারে৷

বই পড়া>
নিশ্চয়ই দীর্ঘ অবসরে কোন একটা বিষয় নিয়েই পড়ে থাকলে একঘেঁয়েমী চলে আসাটা স্বাভাবিক, তখন বিভিন্ন রিসালাহ, যেমন বড়দের জীবনী , আত্মত্যাগ , ইসলামের ইতিহাস,সাহাবীদের জীবনী এবং দেশ,জাতি ও বিশ্ব পরিচিতির বইগুলো একটা সময় নির্বাচন করে পড়া যেতে পারে ৷ এ ক্ষেত্রে অনেক ছাত্রদের নোংরা অভ্যাস আছে অবৈধ জগতের উপন্যাস পড়ার, অবশ্যই তা পরিহার করা চাই৷

সতর্কতা>
নামাযের প্রতি অবশ্যই যত্নবান হতে হবে৷ লিবাস পোশাক ও আচার ব্যবহারে সুন্নতের প্রতি খেয়াল রাখা চাই৷ মাতা-পিতার কাজে সহায়তা করা চাই৷ অতিমাত্রায় খেলাধুলা,অসৎ সঙ্গ , মোবাইলের অপব্যবহার ,মাতা-পিতা ও মুরুব্বীদের অবাধ্যতা অবশ্যই পরিহার করতে হবে৷ শারীরিক সুস্হতা ও মানসিক প্রফুল্লতায় মাঝে মধ্যে ব্যায়াম ও খেলাধুলা করা যেতে পারে৷

দাওয়াতী মেহনত>
এই সুযোগে পরিবার পরিজনের মধ্যে যারা বিশুদ্ধ তিলাওয়াত জানেননা তাদেরকে তিলাওয়াত, বিশেষ করে নামাযের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সূরা ও ফরজ-ওয়াজিব মাসায়েলগুলো শিখানো, মহল্লার মসজিদে সমাগম এড়িয়ে যথাসম্ভব দাওয়াতী মেহনত করার এটিই উত্তম সময়৷

উৎসাহ-উদ্দীপনা>
অবশ্যই মনে রাখা চাই সময়কে মূল্যায়ণ করলে পরবর্তিতে সময়ও তোমাকে মূল্যায়ণ করবে৷ অন্যথা হতাশা ও সংসারের গ্লানী কতটা ভারী তা হাড়ে হাড়ে টের পেতে হবে৷ আমরা খেলার জগতের অলরাউন্ডারদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, অথচ নিজের থলিতে কি সংগ্রহ করছি তার খবর নাই৷ বর্তমান প্রতিযোগীতার যুগে অলরাউন্ডার হলেই কেবল গণনায় থাকা যায় অন্যথায় “পরে ফোনে জানিয়ে দিবো” এতটুকুতেই সন্তষ্ট থাকতে হয়।

সর্বোপরি নিজেদের প্রচেষ্টা ও মহান আল্লাহ তা’য়ালার সাহায্য কামনাই সচল করে দিতে পারে আমাদের জীবনের থমকে যাওয়া চাকা ৷
ওয়ামা আ’লাইনা ইল্লাল বালাগ৷

লেখক> শিক্ষক,তেজগাঁও রেলওয়ে জামিয়া ইসলামিয়া। খতীব,নূরে দারূসসালাম জামে মসজিদ বিজি প্রেস সংলগ্ন,শিল্পাঞ্চল,তেজগাঁও
পেশ ইমাম,তেজকুনিপাড়া রেলওয়ে মার্কেট জামে মসজিদ তেজগাঁও,ঢাকা-১২১৫।

-এটি

ad