নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, দীর্ঘ ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। জনগণের ভোটাধিকার, গণরায় ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস টাঙ্গাইল জেলা শাখা আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা বর্তমান সরকারের পতনের জন্য আন্দোলনে নামিনি। আমরা চাই, অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত জনগণের শাসন টিকে থাকুক। আমরা চাই বর্তমান সরকার পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকুক। তবে জনগণের গণরায় ও অধিকারকে উপেক্ষা করা হলে আমরা নীরব থাকব না।’
তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও বহু মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
সরকারের সমালোচনা সরকার পতনের আন্দোলন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার ও গণভোটের রায় রক্ষার জন্যই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মাঠে রয়েছে। জনগণের ৭০ শতাংশ ভোটে যে গণরায় এসেছে, তা বাস্তবায়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘জনগণের অধিকার নিয়ে যদি বিএনপি ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করে দেয়, আমরা বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে দেব। যদি ৭০ ভাগ মানুষের গণভোটের রায় কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়, তাহলে গণভোটের রায়ের দাবিতে আমাদের চলমান নাগরিক সমাবেশের কর্মসূচি স্থগিত করে দেব।’
তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নাগরিক সমাবেশের কর্মসূচি ধীরে ধীরে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেবে। তবে দেশে নতুন করে কোনো অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হোক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তা চায় না।
আমিরে মজলিস বলেন, সরকারের ভালো উদ্যোগের প্রশংসা ও সহযোগিতা করতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রস্তুত। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত নিরাপদ করা এবং আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। সরকার দেশের স্বার্থে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে রাজপথে সরকারকে সহযোগিতা করতেও তার দল প্রস্তুত।
ভারতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ ও মর্যাদাকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ভারতের নীতিনির্ধারকদের প্রতিবেশীসুলভ আচরণের আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকারকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার বলছে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, আর আমরা বলছি সংবিধান সংস্কার করতে হবে। সংশোধন ও সংস্কারের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকারকে উপেক্ষা করার পরিণতি কখনো শুভ হয় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণের গণরায় অস্বীকার করার কারণে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তাই বর্তমানেও জনগণের ভোট ও গণভোটের রায়কে সম্মান করা এবং তা কার্যকর করা অপরিহার্য।
সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডসহ জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ জনগণের উপকারে এলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সেগুলোকে স্বাগত জানায়। তবে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মসূচি জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের বিকল্প হতে পারে না।
তিনি সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হলে জনগণের সামনে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। সংসদে উন্মুক্ত আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বিএনপির সঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অনেক বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে উল্লেখ করে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজও করা হচ্ছে। যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আধিপত্যবাদী শক্তির মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিএনপির শত্রু নই। আমরা সমালোচনা করি বিএনপির কল্যাণের জন্য, বাংলাদেশের কল্যাণের জন্য এবং জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য। আসুন, প্রয়োজনীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করি। আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি।’
টাঙ্গাইল জেলা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সভাপতি মাওলানা কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে সমাবেশ পরিচালনা করেন জেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা যায়েদ হাবিব ও বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস টাঙ্গাইল জেলার সাবেক সভাপতি মাওলানা মুহাম্মাদ আবু বকর।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ হাদী, কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য মুফতি আশরাফুজ্জামান এবং বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সংগঠন বিভাগের সম্পাদক মাওলানা মোশাররফ হুসাইন লাবীব।
এ ছাড়া টাঙ্গাইল জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর আহসান হাবীব মাসুদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান শাওন এবং বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস টাঙ্গাইল জেলা সভাপতি মাওলানা আশরাফ বিন সাঈদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
আইও/