আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মুসলমানদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়ার অধিকার কারও নেই বলে মন্তব্য করেছেন জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ও দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসিন মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানী। তিনি বলেন, যারা মুসলমানদের সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করে, তারাই প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী।
ভারতের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে মহান নিয়ামত উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি ধ্বংসের যে কোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস দারুল উলুম দেওবন্দ, আলেম সমাজ, মাদ্রাসা ও মুসলমানদের আত্মত্যাগ ছাড়া পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা বা বোঝা সম্ভব নয়।
১৫ আগস্ট দেওবন্দের কাসেমি ময়দান চত্বরে আয়োজিত এক বিশেষ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে মাওলানা আরশাদ মাদানী এসব কথা বলেন।
ভারতের প্রখ্যাত এই আলেম বলেন, ‘স্বাধীনতা কী জিনিস, তা আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করুন। আমরা এর জন্য কুরবানি দিয়েছি।’ তিনি জানান, ১৮৫৭ সালের ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের পর ১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানটির সূচনালগ্ন থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
মাওলানা মাদানী বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বর্তমানে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বিকৃত করার পাশাপাশি মাদরাসাগুলোকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার অপচেষ্টা চলছে। অথচ মাদরাসা, খানকাহ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল।
মাদরাসার কাছে দেশপ্রেমের প্রমাণ চাওয়াদের নিজেদের অতীতের দিকে তাকানোর আহ্বান জানান মাওলানা আরশাদ মাদানী। তিনি বলেন, ইতিহাসের আয়নায় নিজেদের মুখ দেখা উচিত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, কাবুলের অস্থায়ী সরকারে হিন্দু রাজা মহেন্দ্র প্রতাপকে রাষ্ট্রপতি করে তাঁদের পূর্বসূরিরা স্বাধীনতার বহু আগেই ধর্মনিরপেক্ষতার নজির স্থাপন করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো ভারতের সংবিধান থেকে ‘সেকুলার’ শব্দটি বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে এবং মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে।
মাওলানা মাদানীর ভাষ্য, আগের সময়গুলোতে মূলত মুসলমানরা বিভিন্নভাবে লক্ষ্যবস্তু হলেও বর্তমানে সরাসরি ইসলাম ধর্মকেও লক্ষ্য করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইসলামকে যারা নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে, তারাই একসময় ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ইসলাম আজও জীবিত এবং কেয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
স্বাধীনতা আন্দোলনে আলেমদের ভূমিকা তুলে ধরে মাওলানা আরশাদ মাদানী রেশমি রুমাল আন্দোলন ও মাল্টায় আলেমদের কারাবাসের ইতিহাস উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী ও তাঁদের সহযোদ্ধাদের ভারতকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করার আন্দোলনের কারণে মাল্টায় বন্দি রাখা হয়েছিল।
সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, যখন আলেমরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে কারাবরণ করছিলেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করছিলেন, তখন আজ যারা দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বিতরণ করছেন, তাঁদের আদর্শিক পূর্বসূরিরা কোথায় ছিলেন?
মাওলানা আরশাদ মাদানী বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাসে আলেম সমাজ ও মুসলমানদের আত্মত্যাগের অধ্যায় কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তি মুছে ফেলতে পারবে না। মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ইসলাম ও মুসলমান অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
সূত্র: দ্য ইনকিলাব
আইও/