বাগরাম থেকে ক্যাম্প বুকা পর্যন্ত পশ্চিমারা যেসব নিষ্ঠুর বন্দিশালা তৈরি করেছিল, তা অবচেতনভাবেই এমন এক নেতৃত্ব তৈরি করেছে যা শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছে। পাঁচ বছর আগে বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে দেখেছিল আমেরিকার সর্বশেষ সামরিক বিমানটি কাবুল ছেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ বছরের দখলদারির এক বিশৃঙ্খল ও অপমানজনক সমাপ্তি ঘটে। আফগান রাজধানী ছেড়ে যাওয়া মার্কিন সামরিক বিমানের গা বেয়ে মরিয়া মানুষের ঝুলে থাকার দৃশ্য ১৯৭৫ সালের সাইগনের আতঙ্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এক দৃশ্যমান উত্তরাধিকার হিসেবে এই চিত্র মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে গেছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ক্যামেরার লেন্স একচেটিয়াভাবে হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের দিকে তাক করে রেখেছিল। সেখানে মানুষের উন্মাদনার ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে একটি ধ্বংসাত্মক পতনের গল্প তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে বিমানবন্দরের গেটের বাইরে পা রাখলে কাবুলের রাস্তার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প শোনায়। ভারী কামানের শব্দ বা রক্তক্ষয়ী নগরযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কাবুলের পতন হয়নি। বরং ইসলামি আমিরাতের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে সুশৃঙ্খল এবং শান্তিপূর্ণ। এই শান্ত পালাবদল ইতিহাসের এক চূড়ান্ত সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
২০০১ সালে আফগানিস্তান ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষদের মতে, দেশটি একসময় পশ্চিমা সামরিক শক্তির ভয়ংকর চাপে কাঁপছিল। টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং বি-৫২ বোমারু বিমানের অবিরাম বোমাবর্ষণে দেশটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হওয়া মানুষদের কাছেই শেষমেশ শহরটি ফিরে আসে কোনো রক্তক্ষয়ী অবরোধ ছাড়াই। এটি নিছক সামরিক শক্তি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার এক গভীর প্রমাণ। পশ্চিমা শক্তিগুলো নিজেদের ইতিহাসের বই পড়ার সামান্য কষ্টটুকু করলে এই সর্বশেষ পরাজয় পুরোপুরি এড়াতে পারত। হিন্দুকুশ পর্বতমালার বুকে কোনো বৈ বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের পতন এটিই প্রথম নয়। ১৮৩৯ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে ব্রিটেন তিনটি বিপর্যয়কর যুদ্ধ শুরু করেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় প্রচুর রক্ত ঝরেছিল। ওই হামলাগুলোর প্রতিটির সমাপ্তি ঘটেছিল ব্রিটিশদের পশ্চাদপসরণ, গণহত্যা এবং ভূ-রাজনৈতিক অপমানের মধ্য দিয়ে। তারপরও ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পশ্চিমা যুদ্ধের কারিগররা অহংকারে অন্ধ থেকেছে। বিশ্বাস করেছে, এমন এক জাতিকে বশীভূত করা সম্ভব যার আত্মপরিচয়ই গড়ে উঠেছে বিদেশি শাসনের প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে।
আধুনিক পশ্চিমা গল্পের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো প্রতিরোধ ধারণাটির ব্যাপারে স্বল্প স্মৃতিশক্তি। বর্তমানে পশ্চিমারা জিহাদ এবং মুজাহিদীনের মতো শব্দগুলোকে দানবীয় রূপ দিয়ে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের সমার্থক শব্দে পরিণত করেছে। অথচ আফগান মুজাহিদীনদের বিশাল ও অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটিয়েছিল। পুরো আশির দশকজুড়ে এই যোদ্ধারা পশ্চিমাদের চূড়ান্ত স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। রেড আর্মিকে ভাঙতে অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা সহ্য করেছিল। সেই সময় পশ্চিমা নেতারা তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। তবে আত্মত্যাগ একবার পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণ করার পরপরই গল্পটি বদলে যায়। নাইন-ইলেভেন পরবর্তী আগ্রাসনকে বৈধতা দিতে ন্যায়সংগত সংগ্রামের মূল ধারণাকেই অপরাধী বানানো হয়। পরবর্তী দখলদারি পুরোপুরি শোষণ এবং ছুড়ে ফেলার একটি চক্রের ওপর ভিত্তি করে চলেছিল। ইসলামি আমিরাত প্রথম দিন থেকেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে তৈরি হওয়া কৃত্রিম দারিদ্র্য মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। একসময় পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর হয়ে লড়াই করা বহু স্থানীয় সহযোগীকে আজ পশ্চিমা উপকূলে চরম অভিবাসীবিরোধী ঘৃণার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
একসময়ের বাগরাম বিমানঘাঁটির অন্ধকার বন্দিশালাগুলো এখন বিদেশি পরাজয়ের স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। গুয়ান্তানামো বে-তে আইনবহির্ভূত আটকাদেশ ও নির্যাতন সহ্য করা অনেক বন্দি আজ আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করছেন। আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় নারীদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ওপর বাধা আরোপের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, পশ্চিমাদের আঙুল তোলার পেছনে চরম ভণ্ডামি লুকিয়ে রয়েছে। দখলদার বাহিনীগুলো আফগান নারীদের রক্ষক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে অথচ হাজার হাজার পুরুষকে হত্যা করে লাখ লাখ নারীকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় ফেলে গেছে। বর্তমান বাস্তবতায় আমেরিকা ও মিত্ররা অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ আটকে রাখা এবং ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমাদের প্রত্যাহারের এই পঞ্চম বার্ষিকী কোনো দূরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মুহূর্ত নয়। এটি জবাবদিহির একটি মুহূর্ত হওয়া উচিত। প্রকৃত ন্যায়বিচারের স্বার্থে পশ্চিমাদের উচিত আয়নায় নিজেদের মুখ দেখা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া মানসিক ক্ষত স্বীকার করা এবং শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া।
টিএইচএ/