fbpx
           
       
           
       
শিরোনাম :
‘ইখতিলাফ ও খিলাফ এর মধ্যে পার্থক্য না বুঝলে এ উম্মাহকে খেসারত দিতে হবে’
এপ্রিল ১৭, ২০২১ ৩:১১ অপরাহ্ণ

কবি মুসা আল হাফিজ

আদাবে ইখতিলাফ বা ভিন্নমতের আদব নিয়ে আলোচনা করছিলাম। মুফতী আবদুল ওয়াদুদ প্রশ্ন করলেন, ইখতিলাফ ও খিলাফ এর মধ্যে যে পার্থক্য, সেটার তাত্তিক ও প্রায়োগিক রূপ কেমন?

আবদুল ওয়াদুদ ময়মনসিংহের মেধাবী এক আলেম। দারুল উলূম দেওবন্দে পড়েছেন, দাওরা ফারেগ হয়েছেন আট বছর আগে, এর পর থেকে তাখাসসুস করছেন, দশ বছর শুধু তাখাসসুস করতে চান। এরপর খেদমতে নিয়োজিত হতে চান।

আবদুল ওয়াদুদ নিয়মিতই আসেন। হিকমতে শরইয়্যা নিয়ে নানা জিজ্ঞাসা তার। হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা পড়েছেন পালনপুরীর (রহ.) কাছে, দেওবন্দে। তারপর উস্তায সাজ্জাদ নোমানীর কাছে। ফলে তার প্রশ্নগুলো আসলে কথা শুরু করার জন্যই। আবদুল ওয়াদুদ যে প্রশ্ন করেন, পরের ধাপে যাবার জন্যই করেন। যেখানে গিয়ে ওয়াদুদ হল করতে চান সূক্ষ্ম কোনো বিষয়।

তার এ প্রবণতা আমার ভালো লাগে এবং তার প্রশ্নগুলোর জবাবে দীর্ঘ আলোচনা হয় সাধারণত। খিলাফ ও ইখতিলাফ নিয়ে যে জিজ্ঞাসা, সেটা গুরুত্বপূর্ণ । ইখতিলাফ আর খিলাফ উভয়টাই ভিন্নমত। তবে উভয়ের মধ্যে রয়েছে পার্থক্য। ইমাম আবুল বাকা আল কাফাবী রহ. এতে চারটি পার্থক্য দেখিয়েছেন।

প্রথমত: পথ ভিন্ন,কিন্তু লক্ষ্য এক,এর নাম ইখতিলাফ। কিন্তু পথ ও ভিন্ন, লক্ষ্যও ভিন্ন,এর নাম খিলাফ।

ইখতিলাফে পারস্পরিক আচরণ হবে শ্রদ্ধার,হামদর্দির। ( ইসলামপন্থী ফেসবুক প্রজন্ম কথাটাকে ভালোভাবে মনে রাখবেন।) এখানে আহলে রায় এর অবস্থান হবে, আমি সঠিক বলেছি,তবে ভুলও হতে পারে। তিনি সঠিক নন,তবে তার মত শুদ্ধও হতে পারে।

ইখতিলাফে দলিল পেশই মূখ্য। ভিন্নমতের দলিল দুর্বল, সেটা স্পষ্ট হলেই চলে। কিন্তু খিলাফ দলিলেই থামে না, মারমুখি চরিত্র নেয়। ফলে কাফাবীর মতে, উভয়ের দ্বিতীয় পার্থক্য হলো, ইখতিলাফ হয় দলিল- প্রমান নির্ভর ভিন্নমত।কিন্তু খিলাফ এমন ভিন্নমত,যা প্রমাণভিত্তিক নয়। ফলে উভয়ের চরিত্র আলাদা,ফলাফলও আলাদা। একটি অধিকতরো সত্যের তালাশের ফল,আরেকটি সত্যকে বিকৃতির ফল। ফলে উভয়ের তৃতীয় পার্থক্য হলো, ইখতিলাফ রহমতের ফসল আর খিলাফ বিদয়াতের ফসল।

অতএব বিচারে ইখতিলাফ ধর্তব্য, কিন্তু খিলাফ নয়। খিলাফের ভিত্তিতে বিচারক রায় দিতে পারেন না। যদি দেন,তাহলে দ্বিতীয় কাজীর সামনে তা পেশ করা হবে। দ্বিতীয় কাজী একে নাকচ করে দিতে পারেন। কিন্তু ইখতিলাফ ভিত্তিক এক কাজীর ফয়সালাকে দ্বিতীয় কাজী নাকচ করতে পারেন না। কেননা খিলাফ এমন ভিন্নমত, যা কুরআন,সুন্নাহ ও ইজমার পরিপন্থী। এ হচ্ছে উভয়ের চার নম্বর পার্থক্য।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, খিলাফ হচ্ছে লক্ষ্যচ্যুত হটকারিতা। যা ইসলামে ধর্তব্য নয়। কাজেকাজেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. বলেছেন,আল খিলাফু শাররুন। খিলাফ হচ্ছে অতিশয় খারাপ।

কিন্তু ইখতিলাফ খারাপ তো নয়ই, বরং কল্যাণী। এ হচ্ছে সত্যের দিকে নিয়মতান্ত্রিক অভিযাত্রার ফসল। এটি এমন এক বাস্তবতা, সত্যের পথযাত্রীদের যার মুখোমুখি হতেই হয়।

কিন্তু সমস্যা হলো, ইখতিলাফের সাথে আমরা এমন আচরণ করি, যা আগে খিলাফের সাথেও করা হতো না। আসলাফের কাছে ইখতিলাফ আশীর্বাদরূপে পরিগণিত হয়েছে। কিন্তু এখন তা যে অভিশাপে রূপ নেয়,তা মূলত আচরণগত সমস্যার কারণে। সামাজিক মাধ্যমে এর ভয়াবহতা বেড়েছে আরো।

উসুলবিদগণ দেখিয়েছেন, ফকিহগণের ইখতেলাফের কারণে একই গন্তব্যে পৌছার একাধিক পথ সৃষ্টি হয়েছে। ইখতিলাফ বাড়িয়ে দেয় অবকাশ। ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. একারণেই বলতেন, যদি সাহাবায়ে কেরাম এখতেলাফ না করতেন, আমি একে পছন্দ করতাম না। তাদের এখতেলাফের বদলে একপাল লাল উট দেয়া হলেও আমি খুশি হতাম না। কারণ তাদের এখতেলাফ না হলে সবকিছুতে মত থাকতো একটাই। মানুষ পড়ে যেতো সঙ্কটে।

ইমাম শাতিবী রহ. দেখিয়েছেন, এখতিলাফ না থাকলে কীভাবে দ্বীনী জীবনযাপন স্বাভাবিকতা হারাতো! জ্ঞানের তারতম্য, প্রকৃতিগত ভিন্নতা, চিন্তার প্রক্রিয়াগত প্রভেদ ইত্যাদি মানুষের ফিতরাতের অংশ। ফলত ইজতেহাদ ও মতামত নানামুখী হবে, এটাই বাস্তবতা। যদি এখলাফের পথ রুদ্ধ থাকে এবং সকলকে অভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা হতো মানুষের সহজাত স্বাভাবিকতাকে রুদ্ধ করা এবং ভিন্নমত অন্তরে থাকলেও ঐকমত পোষণে বাধ্য করা। শাতেবির মতে, এটি হতো এক অসম্ভব ব্যাপার এবং দ্বীনের জন্য মহাসঙ্কট। এখতেলাফ এ থেকে উত্তরণ এনে দেয়। (এখতেলাফ কী কী কারণে হয়, মৌলিক এবং শাখাগত এখতেলাফের প্রকৃতি ও বিধান কী, সে আলোচনা দীর্ঘ। এ পরিসরে আলোচনার সুযোগ কম)

এতেলাফের কল্যাণী বৈশিষ্টের কারণে শাখাগত বিষয়ে এখতেলাফকে সালাফের অনেকেই এখতেলাফ নোমে অভিহিত করতে রাজি ছিলেন না। আচরণে তারা অপছন্দ করতেন এখতেলাফ শব্দের ব্যবহার। মনে করতেন, প্রকাশ্যে যেহেতু শব্দটি ভিন্নমতের ইঙ্গিতবাহী, অতএব এর প্রতিক্রিয়া সাধারণের মধ্যে পড়বে। ফলে তালহা ইবনে মুসাররিফের রহ. মতো তাবেয়ী আলেম এর সামনে এখতেলাফ শব্দ উচ্চারিত হলে তিনি বলতেন, তোমরা এখতেলাফ বলো না, বলো সায়াহ বা অবকাশ। এক আলেম এখতেলাফ বিষয়ক কিতাব লিখে আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর কাছে এলেন। তিনি বললেন, কিতাবের নাম বদলাও। এখতেলাফ বিষয়ক বই না রেখে এর নাম রেখো অবকাশ বিষয়ক বই বা সুন্নাহ বিষয়ক বই!
তাহলে দেখা যাচ্ছে, এখতেলাফ এর সাথে আচরণ কেমন হবে, তার দৃষ্টিভঙ্গি সালাফের কাছে স্পষ্ট। কিন্তু আমাদের সমাজে এখতেলাফী অবস্থানকেই একমাত্র সঠিক ও একমাত্র দ্বীন হিসেবে গ্রহণের প্রবনতা প্রথায় পরিণত হয়েছে। ফলত ভিন্নমতের সাথে আচরণ এখতেলাফসুলভ হয় না, হয় শত্রুতাসুলভ।

উন্মত্ত অনুসারীরা গালাগালিকে কর্তব্য মনে করে উসূল ও ইলম থেকে নির্গত এখতেলাফের উপরেও ঝাপিয়ে পড়ে। আমাদের দেশে কিংবা অন্যান্য দেশে এই যে পরিস্থিতি, এর মূলে আছে যে যাকে অনুসরণ করে, তাকে দ্বীনের একক প্রতিভূ মনে করা এবং নিজেদের মসলক ও মতামতকেই দ্বীন বানিয়ে ফেলা। ফলে মতামত ও মসলকের প্রতিকুলে উচ্চারিত আওয়াজকে অনুসারীরা দ্বীনের বিরুদ্ধে আওয়াজ মনে করে। যার খেসারত অনেক দিয়েছে এ উম্মাহ এবং দিতে হবে আরো।

লেখক: আলেম, গবেষক, চিন্তক, কবি ও সাহিত্যিক।

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ