fbpx
           
       
           
       
লকডাউনে ঘর হোক পাঠশালা
এপ্রিল ০৮, ২০২১ ৪:৫৬ অপরাহ্ণ

মোস্তফা ওয়াদুদ: করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। বেড়েছে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। যার ফলে লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। বাংলাদেশে দ্বিতীয় দফায় চলছে এ লকডাউন। গতবছরের ১৭ মার্চ সারাদেশে প্রথম লকডাউন ঘোষণা করেছিলো সরকার। এরপর গত সোমবার (৫ এপ্রিল) থেকে আবারো লকডাউন ঘোষণা করলো সরকার।

প্রথমে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন দিলেও এ লকডাউনের সময়সীমা  আরও বাড়তে পারেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ এ লকডাউনে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। সামাজিক দূরত্বের দিনগুলিতে বেশির ভাগ সময় বাড়িতে বসেই কাটাতে হবে অনেকের। তবে যারা কল-কারখানা কিংবা সাধারণ অন্য কোনো পেশায় নিয়োজিত থাকবেন তাদের কথা ভিন্ন।

কিন্তু আমাদের শিশুদের স্কুল বন্ধ থাকায় তারা দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘরে অবস্থান করছে। লকডাউন খুললেও খুলেনি স্কুল। আবারো লকডাউন চলে এলো। এ দীর্ঘ সময় তারা কী করবেন? জানতে চেয়েছিলাম বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তফা কামাল এর কাছে। তিনি জানান, শিশুরা কোমলমতি। তারা যা দেখে তাই শিখে। দীর্ঘ একটা সময় তাদের অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। এ সময় স্কুলের বন্ধু-বান্ধব কিংবা পাঠের বন্ধু বইয়ের সাথে তাদের সাক্ষাত নেই। তারা এ সময় ঘরকেই পাঠশালা বানাতে পারেন।

ঘরের অভিভাবক যারা আছেন তারা দেখুন শিশুর কোন দিকে ঝোঁক বেশি। সেদিকেই সন্তানকে দীক্ষা দিন। পরিচালনা করুন। স্কুল খোলার অপেক্ষায় বসে থাকলেতো হবে না। ঘরকেই তাদের জন্য পাঠশালা বানিয়ে দিন। আমাদের শিশুদের মাঝে অনেকে আছে যারা আঁকাআঁকি অনেক পছন্দ করে। লকডাউনে ঘরটাই হোক তাদের জন্য আঁকিবুকির পাঠশালা।

দেখা যায়, আমাদেরও অনেকেরই অনেক রকমের যোগ্যতা আছে। কেউ বই পড়তে ভালোবাসি। কেউ নতুন কিছু তৈরি করতে ভালবাসি। কেউবা আবার আঁকাআঁকি। যে যাই করি। লকডাউনে ঘরে বসেই সেসব করতে পারি।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর জামিয়াতু ইদরীস মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হোসাইন আহমদ এর সাথে কথা হল লকডাউনে ঘরের কাজ নিয়ে। তিনি বললেন, শিক্ষার্থীদের নিরিবিলি পরিবেশ পড়াশুনার জন্য খুবই প্রয়োজন। লকডাউন হলো এর সবচেয়ে মোক্ষম সময়। যাতে কোনো হিজিবিজি নেই। বরং নিরিবিলি পরিবেশে বজায় থাকে। এ সময় চাইলেই শিশুরা পড়তে পারে ঘরে বসে।

তিনি বলেন, ধরুন! মাদরাসার একটি ক্লাসে ২০ জন শিক্ষার্থী আছে। তন্মধ্যে সেই ক্লাসে দশটি কিতাব আছে। এই দশটি কিতাব সারা বছরেও পূর্ণভাবে শেষ করতে পারে না ২০ জনের মাঝে এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে। এখন অবসর সময় তার জন্য গনিমত এবং তার জন্য একটি মোক্ষম সুযোগ কিতাবগুলো পাঠ করে শেষ করার।

ক্লাসের পড়াগুলো অনেক সময়ই আদায় করা হয় না কিংবা পিছনের অনেক পড়া এমন রয়ে গিয়েছে যেগুলো দ্বিতীয়বার পড়ার সুযোগ হয়নি অনেকের। তাই ঘরকে পাঠশালা বানিয়ে আবার শুরু হোক সেই পিছনের পাঠোদ্ধার।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সম্পর্কে একটি গল্প শোনা যায়। তিনি যখন জেলখানায় ছিলেন তখন জেলে বসে বসে পাঁচ হাজার পৃষ্ঠার ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়ে শেষ করেছিলেন। জেল থেকে বের হলে কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, আপনার সবচেয়ে আনন্দপাঠ কি ছিল জেলখানায়। তিনি বলেন, রাজনীতি করতে করতে বই পড়া ভুলে গিয়েছিলাম। জেলখানায় বসে সরকার আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছিলো। আমি শেষ করেছি ভারতবর্ষের ইতিহাস সম্বলিত ৫ হাজার পৃষ্ঠার বই। বাংলাদেশের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সম্পর্কেও একটি গল্প শোনা যায়।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। মেরুদন্ড ছাড়া যেমন মানুষ দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কোন দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। এই কথাগুলো আমাদের সমাজে বহুল পরিচিত এবং আমরা সকলেই এই কথাগুলো সম্পর্কে অবগত। কিন্তু লকডাউনের কারণে আমরা সে পরিচিত দৃশ্য হারাতে বসেছি।

তবে সকল পরিস্থিতিরই কিছু ইতিবাচক দিক থাকে। সেগুলিকে পুঁজি করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা খুঁজে নিতে হবে। এরকমই একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে লকডাউন থাকাকালীন সময়ে আমরা ঘরকে পাঠশালা বানিয়ে নেই। সাধারণত চাকরির ব্যস্ততা কিংবা ব্যবসা বাণিজ্যের কারণে আমরা অনেকেই পরিবারকে ততোটা সময় দিতে পারি না। তাই পরিকারকেও সময় দেওয়ার সুযোগ মনে করা যেতে পারে লকডাউনকে।

বর্তমানে কোভিড-১৯ এর কারণে আমরা সবাই গৃহবন্দী। যার অভ্যাস হয়তো আমাদের ছিলো না। এটা আমাদের অনেকের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। কারণ, লকডাউনের আগ পর্যন্ত আমরা বেশির ভাগ সময় বাসায় থাকতাম না।  আগে ব্যস্ততার কারণে বই ততটা ধরতে পারেননি, পড়া তো দূরের কথা! এখন এই লকডাউনের কারণে আমরা অনেক বই পড়তে পারি। বই পড়লে মনে একধরনের প্রশান্তি জেগে ওঠে, সেই সঙ্গে সময়টাও ভালো কাটে। বই পড়া হোক আমাদের অভ্যাস।

যেহেতু আমাদের মাদরাসা ও স্কুল বন্ধ, তাই আমাদের অধিকাংশ ক্লাসগুলো হয় অনলাইনে। বাকি সময়টা আমাদের কাটুক পাঠে। কোভিড-১৯ এর কারণে আমরা গৃহবন্দী আছি সেটা ঠিক, তবে সময়টা যদি কাজে লাগাতে পারি। তাতেই আমাদের জন্য সফলতা বয়ে আনবে।

আমরা আশা করছি, আমাদের পৃথিবী আবার সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। নিশ্চয়ই আমরা আবার মাদরাসায় ও স্কুলে যেতে পারবো। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে পারবো। আমাদের পৃথিবী নিশ্চয়ই আমাদের হয়ে উঠবে। আবার রঙিন হয়ে উঠবে আমাদের পৃথিবী। আমাদের রঙে।

এমডব্লিউ/