192943

আলেমদের স্বনির্ভরতা, শিক্ষকতার পাশাপাশি চাই বিকল্প চিন্তা

সুফিয়ান ফারাবী।।

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর আয় শুধু সাধারণ মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা ও ছাত্রদের সামান্য বেতন। এছাড়া উল্লেখ করার মতো অন্য কোনো সোর্স থেকে কোনো টাকা আসে না। করোনাকালে কওমি মাদরাসাগুলোর আয়ের সব রকম দরজা একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে।

শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না দীর্ঘদিন ধরে। কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তারা। অনেকেই মনে করছেন এর প্রধান কারণ শিক্ষকতার পাশাপাশি ভিন্ন কোনো আয়ের উৎস না থাকাই মূলত করোনা প্রেক্ষাপটে অচল হয়ে পড়েছে কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের পরিবার।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের বিভিন্ন উৎস বের করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে আসছিলেন। কিন্তু বিষয়টিকে সেভাবে আমলে নেননি কওমি মাদরাসার অধিকাংশ শিক্ষক। এবার কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনেরা সেই তাগিদই দিলেন। মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি উপার্জনের ভিন্ন খাত বের করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তারা।

লেখালেখি ও অনুবাদকর্মেও রয়েছে সম্ভাবনা: মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

একটা কঠিন সময় পার করছেন দেশের কওমি মাদরাসার উলামায়ে কেরাম। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় তাদের পরিবার বিপর্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে তাদের আয়ের ভিন্ন একটি উৎস বের করা অতীব জরুরি। আলেমরা ব্যবসায় মনোযোগী হতে পারেন। ব্যবসা আমাদের নবীর সুন্নত।

সাহাবায়ে কেরামের সুন্নত। আকাবিরদের সুন্নত। সেই হিসেবে উলামায়ে কেরাম যেকোনো ধরনের হালাল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হতে পারেন। তাতে মানুষের দ্বারস্থ হতে হবে না তাদের। তবে সম্ভাবনা রয়েছে লেখালেখি, অনুবাদ ও সাংবাদিকতাতেও। একটা সময় আমাদের অঙ্গনে অল্প কয়েকজন লেখক ছিলেন।

তারা জীবিকার জন্য যুদ্ধ করে গেছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু পরিস্থিতি এখন পাল্টাচ্ছে। তরুণ আলেমদের মধ্যে যারা লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়েছেন তারা দরস তাদরিসের পাশাপাশি অন্য আয়ের উৎসও বের করতে সক্ষম হয়েছেন। সাংবাদিকতায় তাদের প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। যা পুরো কওমি মাদরাসা অঙ্গনের জন্য ইতিবাচক।

ভিন্ন আয়ের উৎস শুধু প্রয়োজনই নয় বরং রাসুলের নির্দেশ: মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ সাদেকী

কওমি মাদরাসার শিক্ষকরা শিক্ষকতার পাশাপাশি তালিম তরবিয়ত ঠিক রেখে যেকোনো ধরনের হালাল পেশার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। আল্লাহর প্রেরিত নবীরা রাসুলের সহযোদ্ধা সহযোগী সকলেই ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রুটি রুজির জন্য ভিন্ন একটি পেশা বেছে নিতেন। طلب كسب الحلال فريضة بعد الفريضة নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন নির্দেশ দিয়েছেন। তোমরা হালাল আয়ের উৎস বের করো। আমাদের নবী একটা সময় পর্যন্ত ব্যবসা করতেন, হজরত আবু বকর, হজরত ওমর, হজরত ওসমান গনি রা.সহ অন্যান্য সাহাবিদের সকলেরই দীনের মেহনতের পাশাপাশি রুটি রুজির জন্য ভিন্ন একটি পেশা অথবা এই জাতীয় কিছু বেছে নিতেন।

ইমাম আজম আবু হানিফা সেকালের প্রসিদ্ধ বণিক ছিলেন। সদ্য মরহুম উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ আল্লামা সাঈদ আহমদ পালনপুরী ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। দারুল উলুম দেওবন্দের বর্তমান মহাদেশ আব্দুল খালেক মাদ্রাজি, প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম নোমানীসহ দারুল উলুম দেওবন্দের অধিকাংশ শিক্ষক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। দরস তাদরিসের পাশাপাশি বিভিন্ন আয়ের উৎস এটা শুধু প্রয়োজনীই নয়, বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাই সালামের সুন্নত এবং এ বিষয়ে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।

এজন্য এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমাদের দেশের কওমি মাদরাসার শিক্ষকরা মাদ্রাসায় পড়ানোর পাশাপাশি অন্য যেকোনো হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা তারা করে নিতে পারেন। এবং এটা খুবই জরুরি বিষয়। তবে শিক্ষকরা ব্যবসায় নামলে কতটা সফল হবেন সেটা চিন্তা করার আগে আমাদেরকে দেখতে হবে তাদের ব্যবসা করার মত যোগ্যতা রয়েছে কি না। যদি না থাকে তাহলে ব্যবসা শিখতে হবে। প্রয়োজনে মাদ্রাসাগুলোতে কারিগরি শিক্ষা জোরদার করা যেতে পারে।

শুধু ভেতরের দিকে তাকিয়ে থাকা বোকামি: মুফতি গাজী ইয়াকুব

করোনা সংক্রমণের মুহূর্তে সারাদেশের অধিকাংশ মানুষের শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না। ঢাকার বড় বড় মাদরাসার শিক্ষকরাও ফুল বেতন পাননি। এমন পরিস্থিতি আরও কতদিন থাকবে তা আমরা কেউই জানি না। ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কথাও শুনছি। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ভেতরের দিকে তাকিয়ে থাকা বোকামি ও নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এজন্য উলামায়ে কেরাম ব্যাপকভাবে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

তাতে সংসারে স্বচ্ছতা ও স্বনির্ভরতা আসবে। যদি ব্যবসা না বুঝেন, তাহলে যারা ব্যবসা বুঝেন তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েও ব্যবসা করতে পারেন। তাদের জন্য কিছু সামঞ্জস্যশীল ব্যবসা রয়েছে তারা চাইলে মৌসুমী ফল বা মোকামের ব্যবসা করতে পারেন। এছাড়া পাঞ্জাবির কাপড়, প্রকাশনা ও লাইব্রেরিকেন্দ্রিক ব্যবসা তো রয়েছেই। এক্ষেত্রে আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে ভারত এবং পাকিস্তানের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম। এছাড়াও বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষিতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। গবাদি পশু পালন, চাষাবাদের মাধ্যমে অনেক শিক্ষিত তরুণ স্বাবলম্বী হচ্ছে। আরো ১০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করছে।

আমাদের দেশের উলামায়ে কেরামের অনেকে ভিন্ন পেশায় যেতে লজ্জা পান। এ লজ্জা ঝেড়ে ফেলতে হবে। বর্তমান সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা অর্থনৈতিক ধস নেমেছে। যারা কোনোদিন এক পোশাক দ্বিতীয়বার পরতেন না, তারা এখন ওয়াশ করে আবার পুরনো কাপড় পরছেন। আমেরিকার লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার হয়ে গেছে। ইউরোপে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বন্ধের হিড়িক পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্তত হালাল ব্যবসায় লজ্জা পাওয়া উচিত নয়।

-এটি

ad