192129

ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ সা.: নবীজীর কলিজার টুকরা

ফরহাদ খান নাঈম।।

ফাতিমা রা. ছিলেন নবীজী সা. ও খাদিজা রা. এর পঞ্চম সন্তান।

নবীজীর সা. এর নিকট যখন ওহি নাজিল হওয়া শুরু হয়, তখন তার বয়স ছিলো মাত্র পাঁচ বছর। এজন্য ইসলামি বিশেষজ্ঞগণ বলেন, ফাতিমা রা. ইসলামের উপরই বেড়ে উঠেছিলেন।

তার একটি উপনাম ছিলো উম্মু আবিহা অর্থাৎ তার পিতার মা। এই উপনামের কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকগণ বলেন, একজন মা যেমন সবসময় তার সন্তানের সাথে থাকে, তেমনি ফাতিমা রা. ও সুখে-দুঃখে সর্বদা নবীজীর সা. পাশে থাকতেন এবং সাহায্য করতেন।

একবার তিনি দেখলেন, নবীজী সা. কাবার চত্বরে সালাত আদায় করছেন। তিনি যখন সিজদায় গেলেন, তখন উকবা ইবনে আবি মুয়ায়েত এসে তাঁর উপর উটের পঁচা নারীভুড়ি চাপিয়ে দিলো। এটা দেখে ফাতিমা রা. দৌড়ে গিয়ে তার পিতার উপর থেকে আবর্জনা সরিয়ে ফেললেন। তিনি নবীজীর সা. পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। নবীজী সা. তাকে কাঁদতে দেখে বললেন, হে আমার কন্যা! তুমি কেঁদো না। আল্লাহ তা’য়ালা নিশ্চয়ই তোমার পিতাকে বিজয় দান করবেন।

ফাতিমা রা. এর মধ্যে নবীজীর সা. অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান ছিলো। এ ব্যাপারে আয়েশা রা. বলেন, সকলের মধ্য থেকে ফাতিমা রা. এর আচার-আচরণ, কাজকর্ম, অভ্যাস ও চরিত্র নবীজীর সা. সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো। এমনকি তার উঠাবসার পদ্ধতিও নবীজীর সা. সাথে মিলে যেতো। তিরমিযী।

নবীজী সা. তাকে এতো বেশি ভালোবাসতেন যে, কখনো ফাতিমা রা. তাঁর নিকট আসলে, তিনি যদি বসে থাকতেন, তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, এবং তার দু’চোখের মাঝখানে চুমু খেতেন।

ফাতিমা রা. এর সাথে আলী রা. এর বিবাহ হওয়ার পরও নবীজী সা. তাদের বাসায় যেতেন। একবার নবীজী সা. তাদের বাসায় গেলেন। কিন্তু বাসায় গিয়ে তিনি আলী রা. কে পেলেন না। তিনি ফাতিমাকে রা. আলী রা. এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন যে, তাদের উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হওয়ার পর আলী রা. বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছেন।

অতঃপর নবীজী সা. নিজে আলী রা. কে খুঁজতে বের হলেন। তিনি আলী রা. কে মসজিদের ভেতরে ধুলিমলিন অবস্থায় ঘুমন্ত দেখতে পেলেন। নবীজী সা. তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য ডাক দিয়ে রসিকতা করে বললেন, হে ধুলাওয়ালা! জেগে ওঠো।

নবীজী সা. তাকে তাদের উভয়ের মধ্যকার ঝগড়ার বিষয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। বরং তিনি বললেন, হে আলী! আমার সাথে বাসায় ফিরে চলো।

যদিও ফাতিমা রা. এর সাংসারিক জীবন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলো না, তবু তাদের সংসারে সুখের কোনো কমতি ছিলো না। তাদের চার জন সন্তান ছিলো- হাসান, হুসাইন, মুহসিন ও উম্মে কুলসুম রা.। এদের মধ্য থেকে মুহসিন জন্মের পরপরই মারা যায়।

নবীজীর সা. ইন্তিকালের সময় তার বয়স ছিলো ২৮ বছর। নবীজী সা. যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন ফাতিমা রা. তার গৃহে প্রবেশ করেন। কিন্তু অসুস্থ থাকার কারণে নবীজী সা. পূর্বের ন্যায় উঠে গিয়ে তাকে চুমু খেতে পারলেন না।

তিনি নবীজীর সা. শয্যার ডানপাশে গিয়ে বসে কাঁদতে লাগলেন। নবীজী সা. বললেন, হে ফাতিমা! তোমার কানটা আমার কাছে আনো। অতঃপর তিনি তাকে কানে কানে কিছু একটা বললে, ফাতিমা রা. কাঁদতে শুরু করলেন। আবার নবীজী সা. তাকে কানে কানে আরো কিছু বললেন। তা শুনে এবার ফাতিমা রা. হাসতে লাগলেন।

নবীজীর সা. ওফাতের পর আয়েশা রা. তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে, ফাতিমা রা. বললেন, প্রথমবার তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, তিনি আজ রাতে ইন্তিকাল করবেন। আর এটা শুনে আমি কেঁদেছিলাম। পরেরবার তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর পরিবারের মধ্যে থেকে আমিই সর্বপ্রথম তাঁর সাথে মিলিত হবো এবং আমি হবো জান্নাতী নারীদের সর্দার‌। এটা শুনে আমি হেসেছিলাম।

নবীজীর সা. ইন্তিকালের মাত্র ছয় মাস পরেই ফাতিমা রা. ইন্তিকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার স্বামী আলী রা. কে বলেছিলেন, আমার ইন্তিকালের পর আমাকে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে দাফন করবেন। যাতে করে কেউ আমাকে দেখতে না পায়। আর রাতের বেলা আমার দাফনকার্য সম্পন্ন করবেন, কেননা বেশি লোকজন আমার লজ্জার কারণ হবে।

তার ইন্তিকালে আলী রা. অত্যন্ত ব্যথিত হন। তিনি বলেন, মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে নবীজী সা. ও ফাতিমা রা. এর মৃত্যুতে আমি যতো কষ্ট পেয়েছি, এতোটা কষ্ট আর কখনো পাইনি।

সতীত্ব, সচ্চরিত্র, মর্যাদা, বিনয় এবং ধার্মিকতাসহ সব দিক থেকেই ফাতিমা রা. হলেন পৃথিবীর সকল নারীর জন্য সর্বোৎকৃষ্ট উপমা।

-এটি

ad