নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশেষ মতাদর্শী ও সালাফি লা-মাজহাব অনুসারী সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করার সংবাদে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম। তারা বলছেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ধর্মীয় অবস্থান, চিন্তাধারা এবং আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
রোববার (১৬ আগস্ট) এক যুক্ত বিবৃতিতে আলেমরা বলেন, শত শত বছর ধরে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলমান হানাফি মাজহাবের ফিকাহ ও আত্মশুদ্ধির জন্য তাসাওউফের চর্চা করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, সালাফি ও লা-মাজহাব অনুসারীরা এসবের সরাসরি বিরোধিতা করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সব ধর্মবিশ্বাসী মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার দেশ হিসেবে পরিচিত। একইভাবে ধর্মীয়ভাবেও বিভিন্ন ঘরানা ও মতপথের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সহাবস্থান রয়েছে। তবে কয়েক বছর ধরে লা-মাজহাব ও সালাফি মতবাদ প্রতিষ্ঠার তৎপরতার কারণে দেশের শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় পরিবেশে বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
আলেমরা বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয় অন্য সাধারণ মন্ত্রণালয়ের মতো নয়। দেশের মসজিদ, মাদরাসা, ওয়াকফ, হজ ব্যবস্থাপনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় এ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির ধর্মীয় অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
তারা সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, জনগণের আপত্তি ও উদ্বেগের বিষয়টি উপেক্ষা করে কেন শামীম কায়সার লিংকনকেই ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মনোভাবকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তারা।
বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, প্রয়োজনে কোনো ধর্মীয় বিশেষজ্ঞকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। অন্যথায় বিএনপির মধ্যেও ধর্মীয় মনোভাবসম্পন্ন সংসদ সদস্য রয়েছেন, তাদের মধ্য থেকে কাউকে এ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
আলেমদের আশঙ্কা, প্রকাশ্যে হানাফি মাজহাবের বিরোধী হিসেবে পরিচিত কাউকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে এবং সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হতে পারে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বর্তমান সরকার গঠনে কওমি অঙ্গন, হেফাজতে ইসলাম ও সমর্থিত ইসলামি দলগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও মন্ত্রিসভায় কওমি অঙ্গনের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নেই। বিষয়টি ইতোমধ্যে আলেম সমাজ ও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
তাদের দাবি, বর্তমান সফল ধর্ম প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে অথবা তার পাশাপাশি ভিন্ন মতাদর্শের কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে দেশের কওমি ওলামা-মাশায়েখ, হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মুসলমানের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তারা।
সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আলেমরা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান। বিতর্কিত কোনো সিদ্ধান্তের কারণে মূলধারার ইসলামি অঙ্গনের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হোক—এটি তারা কোনোভাবেই কামনা করেন না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন: মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক কাসেমী, মুফতি কেফায়েতুল্লাহ আজহারী, মুফতী লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, মাওলানা আব্দুর রহীম আল মাদানী, মাওলানা গাজী ইয়াকুব উসমানী, মুফতি সালমান ফারসী, মাওলানা ইসমাঈল বুখারী কাশিয়ানী, মাওলানা আবু আম্মার আব্দুল্লাহ, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ কাসেমী, মুফতি রিজওয়ান রফিকী, মুফতি শফী কাসেমী, মুফতি আরিফ জাব্বার কাসেমী, মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক কাসেমী, মুফতি বেলাল বিন আলী, মুফতি আব্দুল্লাহ সালেহী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা মাহমুদুল হাসান কাসেমী, মাওলানা দিলাওয়ার হুসাইন মাইজী, মুফতি হোসাইন আহমদ রাহমানি, মুফতি রেজাউল করিম, মুফতি মুহাম্মদ শোয়াইব কাসেমী, মুফতি রহমতে এলাহী আরমান কাসেমী, মুফতি হোসাইন বিন ওয়াক্কাস কাসেমী, মাওলানা ওবায়দুর রহমান হুজাইফী, মুফতি আমিনুল ইসলাম কাসেমী, মুফতি ফেরদৌস মাহমুদ, মুফতি কামরুজ্জামান কাসেমী, মুফতি সোহাইল আহমদ, মুফতি আব্দুল হালিম বিন হারুন, মুফতি মাহমুদুল হাসান জিলানী, মুফতি সোলায়মান মাদানী, শাইখুল হাদিস মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি এহতেশাম কাসেমী, মুফতি ফরহাদ আহমদ, মুফতি শফিকুল ইসলাম কাসেমী, মাওলানা আল আমিন, মাওলানা আব্দুল্লাহ আনসারী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান নোমান, মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক আজাদী, মুফতী ইউসুফ আজাদী, মুফতী ওবায়দুল্লাহ শাকির, মুফতী হাফিজুর রহমান, মুফতী ইনামুল হক আইয়ুবী, মাওলানা মাসউদুর রহমান আইয়ুবী, মাওলানা গাজী সিদ্দিকুর রহমান, মুফতি আবু সাঈদ ইসহাকী, মুফতি ইসহাক কামাল, মুফতি তাফহীমুল হক, মুফতি নোমান আল হাবীব ও মুফতি জাকারিয়া সিদ্দিকী।
আরএইচ/