রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬ ।। ১ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮


শায়খুল হাদিস রহ.-এর শিষ্যত্ব লাভের গল্প

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| মাওলানা আনিসুর রহমান ||

রমজানের পূর্বে মাদরাসার আভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার কারণে উস্তাদগণের পরামর্শক্রমে রমজানের পর মাদরাসার জালালাইন থেকে উপরের জামাতগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এতে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢাকা যাওয়ার একটি বাধা দূর হয়ে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, মাদরাসা যদি পরিবর্তন করতেই হয়, তাহলে ঢাকা গিয়ে শায়খুল হাদিস রহ. এর প্রতিষ্ঠিত জামিআ রাহমানিয়ায় ভর্তি হবো। কিন্তু আর্থিক অসুবিধা এত বেশি ছিল যে, ভর্তির টাকা যোগাড় করা আমার জন্য ছিল দুস্কর। তাই পুরো রমজান সালাতুল হাজত ও দুআয় মশগুল রইলাম। এদিকে মাদরাসা খোলার তারিখ ঘনিয়ে এসেছে, অথচ আমার ঢাকা যাওয়ার ভাড়াও যোগাড় করা সম্ভব হয়নি। তবুও আমি হাল ছাড়িনি বরং প্রতিজ্ঞা করেছি, যেভাবে হোক আমাকে ঢাকা যেতেই হবে (ইনশাআল্লাহ)। তাই নিয়ত করলাম কারো থেকে ভাড়ার টাকা ঋণ নিয়ে রাহমানিয়ায় চলে যাব এবং হযরত শায়খুল হাদিস রহ. এর কদম মুবারক চেপে ধরে হলেও হযরতের নিকট দু-চার সবক পড়ার সুযোগ করে নিব।

শাওয়ালের ৯ তারিখ আমার ঢাকা যাওয়ার কথা। সকালে আমি এক বন্ধুর নিকট কর্জে হাসানার জন্য যাই- কিন্তু তাকে না পেয়ে নিরাশ হয়ে ঘরে ফিরে আসি। কিন্তু আল্লাহর কুদরত কে বুঝতে পারে। আমার আম্মাজানও আমার মনের অবস্থা জানতেন তাই আল্লাহর দরবারে আমার আশা পূরণের জন্য কেঁদে কেঁদে দুআ করছিলেন। আল্লাহ পাক বলেছেন انما امره اذا اراد شيئا أن يقول له كن فيكون iii

ঘরে প্রবেশ করে আম্মাকে হাসিমুখে দেখতে পাই। আম্মাজান বললেন, বাবা আল্লাহ পাক তোমার মনের আশা পূরণ করেছেন। তোমার পাশের বাড়ির জহিরুল ইসলাম কাকা কুমিল্লা থেকে এসেছিল। তোমাকে এক হাজার পাঁচশত টাকা দিয়ে গেছে। এ কথা শোনার সাথে সাথে আমার চোখে পানি এসে গেল। আমি প্রাণভরে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলাম সেই সঙ্গে হিতাকাঙ্খী জহিরুল ইসলাম চাচার জন্যও প্রাণখুলে দুআ করলাম। তিনি এখনো বেঁচে আছেন। আল্লাহ তাআলা তার নেক হায়াত দারাজ করুন (আমিন)।

অল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু গুছিয়ে আম্মাজানের কাছ থেকে দুআ নিয়ে বাড়ি থেকে রওয়ানা হলাম। মনে একটাই আশা জামিআ রাহমানিয়ায় ভর্তি হব এবং শায়খুল হাদিস রহ. এর সান্নিধ্য লাভ করব। দীর্ঘ সফর শেষে রাতে জামিআ রাহমানিয়ায় পৌঁছলাম। ইতোপূর্বে আমি ঢাকায় আসিনি, তাই সবকিছুতেই অপরিচয়ের একটা দূরত্ব আমাকে পীড়া দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল জগতে আমার চেয়ে অসহায় আর কেউ নেই। নিজেকে তখন এই বলে প্রবোধ দিলাম যে, শায়খুল হাদিস রহ. কে দেখলে হয়ত আমার এ অবস্থা কেটে যাবে। তাই তাঁকে একনজর দেখার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকলাম।

ছাত্রভাইদের থেকে জানতে পারলাম, আগামীকাল সকাল দশটায় মাদরাসায় ভর্তির কার্যক্রম শুরু হবে। তখন শায়খুল হাদিস রহ. আজিমপুরের বাসা থেকে মাদরাসায় আসবেন। রাতে অল্প সময় ঘুমালাম। সকাল দশটায় ভর্তিফরম বিতরণ শুরু হল। আমিও একটি ফরম সংগ্রহ করে পূরণ করলাম। একটু পরেই শুনতে পেলাম, শায়খুল হাদিস রহ. মাদরাসার দফতরে এসেছেন।

হুজুরকে এক নজর দেখে আমি আমার হৃদয়ের জ্বালা মেটানোর জন্য জামিআর দফতরের দিকে এগোতে লাগলাম, কিন্তু ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের ভিড়ের কারণে হুজুরের সঙ্গে মুসাফাহা করার সুযোগ পেলাম না। দরজা থেকে কেবল তাঁকে এক নজর দেখার সৌভাগ্য হল। আল্লাহর নিকট দুআ করলাম, ইয়া আল্লাহ, তোমার কুদরত দ্বারা যেভাবে শায়খুল হাদিস রহ. কে দেখার সুযোগ আমায় করে দিয়েছ, তেমনিভাবে আমাকে রহমানিয়ায় ভর্তির সুযোগ করে দিয়ে হুজুরের নিকটতম হওয়ার ও তাঁর খেদমত করার সুযোগ করে দিয়ো। এভাবেই শুরু হয় শায়খুল হাদিস রহ. এর সাথে আমার দৃষ্টির সম্পর্ক। যাক, তিনদিন পর ভর্তি পরীক্ষা, তাই সাত মসজিদের প্রতিটি গম্বুজের নিচে শুরু হল দুআ ও কান্না। মিনতি একটাই, আল্লাহ পাক যেন আমাকে রহমানিয়ায় ভর্তির সুযোগ করে দিয়ে শায়খুল হাদিস রহ, এর নৈকট্য অর্জন করার তওফিক দান করেন।

আল্লাহ বলেন لا تقتتوامن رحمة الله আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত ও করুণায় জামিআ রাহমানিয়ায় ভর্তি হলাম এবং শায়খের শিস্যত্বলাভের গৌরব অর্জন করলাম। এজন্য আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোন কিছু লেখার ইচ্ছা নেই, তাই ভর্তির সময়ে আমার আর্থিক কষ্টের কথাগুলো এখানে লিখছি না। আল্লাহ পাকের ফয়সালা হল والذين جاهدوا فينا لنهدينهم سبلنا ফারসী রা. কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ লাভের জন্য ৯০ বছর গোলামি করিয়েছেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একজন প্রকৃত আশেক, শায়খুল হাদিস রহ. এর পরশ ও সান্নিধ্য লাভের জন্য আমার কষ্ট ও কুরবানি যতই হোক না কেন, তা খুবই সামান্য ও নগণ্য।

ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি জালালাইন জামাতে দাখেল হই। ঐ বছরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় শায়খুল হাসিদ রহ, বিমানবন্দর ঘেরাও কর্মসূচী দিলেন। একারণে কয়েক মাস শায়খকে জেল খাটতে হল। ঐ বছর হুজুরের সাথে দু-তিনবার মুছাফাহা করার সৌভাগ্য হয়। এভাবে কেটে যায় রাহমানিয়ায় আমার প্রথম বছরটি। ১৯৯৪ সালে রমজানের পর আল্লাহ পাক মেশকাত জামাতে ভর্তির সুযোগ করে দিলেন।

লেখক: প্রিয়ছাত্র, শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.; খলিফা, শায়খ আব্দুল হাফিজ মাক্কী; প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদিস: জামিয়া বাবুস সালাম উত্তরা, ঢাকা

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ