|| ওলিউল্লাহ মুহাম্মাদ ||
নয়নের জলে বুক ভাসিয়ে আজ যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের লাখো আশেক বান্দার দিকে তাকাই, তখন বুকের ভেতরটা এক অবোধ্য হাহাকারে মোচড় দিয়ে ওঠে। আহ, ওরা কত ভাগ্যবান! ওরা আজ এমন এক পুণ্যভূমি স্পর্শ করে আছে, যেখানে কান পাতলে ইতিহাসের সবচেয়ে মধুর গুঞ্জন শোনা যায়। ওরা আজ সচক্ষে দেখছে সেই পবিত্র ঘর, যা যুগে যুগে লাখো-কোটি নবী-রাসূল ও খোদা-প্রেমিকের অশ্রু আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে।
আজ যারা মক্কার তপ্ত বালুকা বেয়ে হেঁটে চলেছে, তারা আসলে হাঁটছে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর প্রিয় সাহাবিদের পবিত্র পদধূলি মেশানো পুণ্যময় পথে। একেকজন হাজি যখন শ্বেতশুভ্র ইহরামের কাপড় জড়িয়ে 'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক' ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে, তখন মনে হয় যেন এই নশ্বর পৃথিবীর সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেছে। তারা আজ আর কোনো সাধারণ মানুষ নয়, তারা নিখিল বিশ্বের স্রষ্টার খাস মেহমান। সারাজীবন যে ঘরের দিকে মুখ করে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়েছে, আজ তারা সেই ঘরের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। রুকনে ইয়ামানির দেয়ালে হাত রেখে, মাকামে ইব্রাহিমের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রবের সমীপে যখন তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে, তখন হয়তো আরশের ফেরেশতারাও তাদের সেই ব্যাকুলতায় ঈর্ষা বোধ করে!
সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে যখন তারা ব্যাকুল হয়ে দৌড়ায়, তখন কি তাদের মনে পড়ে না মা হাজেরার সেই শাশ্বত মাতৃত্বের আকুলতা? যে জমজমের সুমিষ্ট পানি পান করে আজ তারা তৃষ্ণা মেটাচ্ছে, সেই পানি পানের পরম সৌভাগ্য হয়েছিল কত লক্ষ নবী ও ওলী-আউলিয়ার! আজ হাজরে আসওয়াদের সেই জান্নাতি পাথরে যখন কোনো প্রেমিক ঠোঁট ছোঁয়ায়, তখন তার সমস্ত অস্তিত্বে এক স্বর্গীয় শিহরণ বয়ে যায়। কারণ, এই সেই পাথর, যাতে পরম মমতায় চুমু খেয়েছিলেন স্বয়ং দয়ার নবীজি, কত শত সাহাবি আর তাবেয়ী।
অথচ আমি আজও পড়ে আছি দূর প্রবাসের এক অন্ধকার কোণে! যখনই স্ক্রিনের পর্দায় কিংবা স্মৃতির পাতায় কাবা শরীফের ছবি ভেসে ওঠে, আমার এই চঞ্চল হৃদয় আর স্থির থাকতে চায় না। চারপাশের সবকিছু যেন থমকে যায়। মনটা পাখি হয়ে উড়ে যেতে চায় মক্কার নীল আকাশে, রূহটা ছুটে চলে সাফা-মারওয়ার চত্বরে। তখন দুই চোখ বেয়ে শুধু অশ্রু ঝরে আর প্রাণ কেঁদে কেঁদে বলে ওঠে— "এই তো আমার আসল ঠিকানা, এই তো আমার চির-কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য!" আজ হাজিরা যেখানে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করছে, ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে দু'হাত তোলার স্বপ্নে আমার কত যে অশ্রুভেজা রজনী কেটেছে, তার হিসাব কেবল আমার রবই জানেন। কত শীতের গভীর রাতে, ঠাণ্ডা জায়নামাজে কপাল ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদেছি আর বলেছি, "হে আল্লাহ! আমাকে আর কতকাল এভাবে দূরে সরিয়ে রাখবে? আমাকেও একবার আপনার ঘরের মেহমান করে নিন।"
কাবার তাওয়াফ শেষ করে আশেকদের এই কাফেলা যখন মদিনাতুল মুনাওয়ারার দিকে ছুটে চলে, তখন প্রেমের তীব্রতা যেন আরো বহু গুণ বেড়ে যায়। সবুজ গম্বুজের ছায়ায় দাঁড়িয়ে, নবীজির রওজায়ে আতহারের পাশে শিউরে উঠে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কেউ যখন বলে ওঠে, "আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ", তখন সেই অনুভবের কাছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ তুচ্ছ হয়ে যায়। দাঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর ফোঁটাগুলো যেন তখন একেকটি মুক্তোর দানা হয়ে রওজার মেঝেতে মিশে যায়।
হে আমার পরম দয়ালু প্রতিপালক! আমার অন্তর আজ তীব্র বিরহের ব্যথায় কাঁপছে, চোখ দুটো অশ্রুতে সিক্ত ও ক্লান্ত। আমি আর এই দূরত্ব সহ্য করতে পারছি না। দয়া করে ডাকুন আমাকে, আমার পরিবার ও প্রিয়জনদের সেই পবিত্রতম সফরে। আপনি যেমন আপনার প্রিয় বান্দাদের ভালোবেসে ডেকে নেন, তেমন করেই আমাকেও আপনার ঘরের অতিথি বানিয়ে নিয়ে যান। আমার জীবনের সব আকুলতা, সব মোনাজাত যেন মাকামে ইব্রাহিম আর কাবার গিলাফে লেপ্টে থাকার সুযোগ পায়। হে রব! আর কতকাল এই তৃষ্ণার্ত হৃদয়কে চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় রাখবে? আর কত রাত কাঁদব এই অন্তহীন সাধ নিয়ে? আমায় ফিরিয়ে দিয়ো না হে মাবুদ; খুব জলদি, খুব আপন করে তোমার এই গুনাহগার বান্দাকে তোমার নিজের ঘরে ডেকে নাও!
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও প্রবন্ধকার
আইও/