সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ ।। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৮ জিলহজ ১৪৪৭

শিরোনাম :

কোরবানির গোশত বন্টন: ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক রীতি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুহাম্মদ উসামা হাবীব ||

দেশের অনেক অঞ্চলে কুরবানির গোশত বণ্টনের এমন একটি রীতি প্রচলিত আছে—মসজিদভিত্তিক এলাকাগুলোতে মসজিদের যে সকল দাতা সদস্য কুরবানি করেছেন, তাদের থেকে তিন ভাগের এক ভাগ কুরবানির গোশত সংগ্রহ করা হয়। এরপর সব একত্রিত করে আবার সকল সদস্যদের মাঝে বণ্টন করা হয়। কিন্তু এ বণ্টনরীতিতে মোটা দাগে কয়েকটি ত্রুটি দেখা যায়:

★ এতে মানুষের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া ভোগ করা হয়। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তির সম্পদ তার শরিয়তসম্মত সন্তুষ্টি ছাড়া অন্যের জন্য বৈধ হবে না। (মুসনাদে আহমদ: ২০৬৯৫)

অথচ এই বণ্টনরীতিতে অনেকের থেকে এক-তৃতীয়াংশ গোশত গ্রহণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তো জোরপূর্বকই নেওয়া হয়। হয়তো সামাজিক অবস্থানের কারণে অনেকেই কিছু বলে না। কিন্তু এটা অনুচিত। মনে রাখতে হবে—এই বিধানটি মুস্তাহাব। কেউ যদি এক টুকরো গোশতও না দিয়ে পুরোটা নিজে খেয়ে ফেলে, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। হাদিস শরিফে এর স্পষ্ট অনুমতিও রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি তো তোমাদেরকে (কুরবানির গোশত তিন দিনের বেশি রেখে খাওয়ার নিষিদ্ধতার বিধান) দিয়েছিলাম, বেদুইনদের আগমনের কারণে। অতএব এখন তোমরা (যতদিন ইচ্ছে) তা খেতে পারো, জমা করে রাখতে পারো এবং দানও করে দিতে পারো। (মুসলিম: ৪৯৯৭)

★ যাদের থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে তাদেরকেও এর একটি অংশ দেওয়া হয়। ফলে তার দানকৃত গোশতের একটি অংশ তার ঘরে ফিরে আসছে। শরিয়তের দৃষ্টিতে যা একটি অরুচিকর বিষয়। মুসলিম শরিফের একটি বর্ণনায় এসেছে, একবার হযরত ওমর ফারুক রা. একটি ঘোড়া দান করেন। পরে তা অযত্নে বাজারে বিক্রি হতে দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আবার কিনে নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তিনি বললেন, তুমি তা কিনবে না এবং তোমার সদকা ফিরিয়ে আনবে না। কারণ, যে ব্যক্তি আপন দান ফিরিয়ে নেয় সে ওই কুকুরের মতো যে বমি করার পর তা আবার খেয়ে ফেলে (মুসলিম: ৪০৫৫)।

যদিও হযরত ওমর ফারুক রা. টাকার বিনিময়ে কিনতে চেয়েছেন, তথাপিও তাকে নিষেধ করা হয়েছে।

★ এই গোশত শুধু তাদের মাঝে বণ্টন করা হয় যারা মসজিদের নিয়মিত দাতা সদস্য। বিষয়টা অনেকটা এমন—যেন তাদের ওই দানের একটা বিনিময় দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অনেকের কথাবার্তা থেকে এমনই বোঝা যায়। তাইতো, অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়—সারা বছর মসজিদের সাথে সম্পর্ক না থাকলেও শুধু কুরবানির সিজনে দাতা সদস্য হতে চায়।

এখানে একটা হাস্যকর বিষয়ও আছে—পুরোনো দাতা সদস্য ছাড়া অন্য কেউ যেন এই তাবারক (!) না পায়, তা মসজিদ কমিটি কর্তৃক কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নাউজুবিল্লাহ! অথচ এতে দুটি মন্দ দিক রয়েছে।

এক. কুরবানির গোশত বিক্রি করা বা এর কোনো অংশ দ্বারা কোনো কিছুর বিনিময় দেওয়া জায়েজ নেই। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, যে ব্যক্তি কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করল, তার কুরবানি বিশুদ্ধ হবে না (মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৪৬৮)।

অন্য রেওয়ায়েতে আছে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আলি রা.-কে বললেন: তা থেকে (কুরবানির পশুর কোনো অংশ থেকে) যেন কসাইকে বিনিময় দেওয়া না হয় (বুখারি: ১৭১৭)।

দুই. মানুষের নিকট থেকে কোনো সৌজন্যমূলক আচরণের বিনিময় প্রত্যাশা করা উচিত নয়। যেমন কালামুল্লাহ শরিফে বর্ণিত রয়েছে, অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় আপনি কোনো অনুগ্রহ করবেন না এবং আপনার রবের উদ্দেশ্যে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন (সুরা মুদ্দাসসির: ৬-৭)।

আর যেখানে মসজিদের উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু দেওয়া হয়, সেখানে অন্য কিছুর প্রত্যাশা করা তো খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কোনো মসজিদ নির্মাণ করল, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর বানাবেন (মুসলিম: ১০৭৬/৭৭)।

সুতরাং মসজিদ সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ দুনিয়ার ক্ষুদ্র প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নষ্ট না করা চাই।

★ তিন ভাগের এক ভাগ দান করা। এটা ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব এবং এটা চূড়ান্ত সীমাও নয়। অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত এমনই। কুরআনে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সীমা নির্ধারিত নেই। শুধু দান করার কথা বলা হয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো এবং ধৈর্যশীল, সীমিত জীবনযাপনকারী ও প্রকাশ্যে যাচনাকারীদের আহার করাও (সুরা হজ: ৩৬)।

তবে হজরত আবু মুসা আল ইস্পাহানীর 'ওজায়েফ'-এর মধ্যে একটি বর্ণনা এসেছে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কুরবানির এক-তৃতীয়াংশ নিজের পরিবারের জন্য রেখেছেন, এক ভাগ দরিদ্র প্রতিবেশীর জন্য, আরেক ভাগ যাচনাকারীদের জন্য। এমন আরেকটি বর্ণনায় তিন ভাগের কথাটি এসেছে।

ওই সকল বর্ণনা থেকে তিন ভাগের এক ভাগ দেওয়াকে উলামায়ে কেরাম মুস্তাহাব সাব্যস্ত করেছেন। তবে আরও বেশি দিতে কোনো বাধা নেই। কারণ, আয়াতে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। উপরন্তু হাদিসে এসেছে, প্রাক্‌-যুগে তিন দিনের বেশি সময় ধরে সঞ্চয় করে কুরবানির গোশত আহার করা নিষিদ্ধ ছিল; যেন মদিনার বাহির থেকে আসা দরিদ্র মানুষজনও এর একটি বড় অংশ পেয়ে যায় (মুসলিম: ৪৯৯৭)।

এক সময় আমাদের দেশের সাধারণ মুমিনরাও ব্যাপক হারে মানুষকে দিত। যারা কোরবানি করার সামর্থ্য রাখত না, তারা শেষ পর্যন্ত ভরপুর হয়ে জোড় হাতে দাতাদের কাছ থেকে নিষ্কৃতি চাইত। কিন্তু এখন ফ্রিজসহ সময়ের নানা আনুষঙ্গিকতায় মানুষের মনোভাব পরিবর্তন হয়ে গেছে।

সামাজিক ওই অংশটুকু বা কোনো রকম এক-তৃতীয়াংশ দেওয়ার পর এই পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দেয়। একটি অপাঙ্ক্তেয় টুকরোও না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। ধারণাটি যেন এমন—আমি তো তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে শেষ করে ফেলছি, এখন আমার পক্ষ থেকে আর দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ ঐ দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ হওয়ার মূল কারণই ছিল এটি যে, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারি লাভ করবে।

কুরবানির গোশত বণ্টনে থাকুক মুমিনের পরিচয়:

হাদিসে এসেছে, ওই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে তৃপ্তিসহ আহার করে আর তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে (আদাবুল মুফরাদ: ১১১)।

কুরআনে জান্নাতিদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে যে, আর তাঁদের ধন-সম্পদে ছিল যাচনাকারী ও বঞ্চিতদের একটি অংশ (সুরা যারিয়াত: ১৯)।

কুরবানির গোশত বিতরণসহ অনেক ক্ষেত্রেই আমরা গ্রহীতার উপযুক্ততার বিষয়টি লক্ষ্য রাখি না। এদিক-সেদিক কিছু ছিটিয়ে মনে করি দায়িত্ব শেষ; অথচ আমি দেখছি, এক টুকরো গরুর গোশতের জন্য একজন সাধারণ মানুষের হাহাকার। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতে এমন অনেক শ্রমজীবী মানুষ আছে, যারা পুরো বছরে এক টুকরো গরুর গোশতের স্বাদ নেওয়ার সামর্থ্য রাখে না। আর নিম্নমধ্যবিত্তরা আত্মমর্যাদার হেতু ঐ ভাবে চাইতেও পারে না। কুদস-সুদানসহ আফ্রিকার অনেক অঞ্চলের অগণিত মানুষ প্রচণ্ড ক্ষুধায় মরতে বসেছে। তাই কুরবানি করা এবং গোশত বিতরণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা চাই।

আজকাল আস-সুন্নাহ, হাফেজ্জী চ্যারিটেবল, আশেক ফাউন্ডেশনসহ এমন কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান দেশের উত্তরাঞ্চলসহ দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন দরিদ্র, পীড়িত অঞ্চলে কুরবানির গোশত পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে। প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। আমার বিতরণে যেন থাকে হৃদয়ের ছোঁয়া।

লেখক: প্রবন্ধকার, শিক্ষক, ইমাম ও খতিব

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ