শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫ ।। ১৫ ভাদ্র ১৪৩২ ।। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৭

শিরোনাম :
২৬ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক শিক্ষকদের আমরণ অনশনের ঘোষণা ‘নুরের ওপর হামলায় দেশের নেতৃত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে ’ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবার নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে: মির্জা ফখরুল জুলাই আন্দোলনের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে : খেলাফত মহাসচিব ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হবে: ইসলামী আন্দোলন মহাসচিব শিক্ষার মানোন্নয়ন ও নববি মানস গঠনে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি: মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া জাতীয় পার্টিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধের দাবি রাশেদের তুরস্কে পালিত হলো ১০৩তম বিজয় দিবস, আতাতুর্কের সমাধিতে এরদোয়ানের শ্রদ্ধা এই ঐক্যজোট ওই ঐক্যজোট নয় ‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে’

 নওমুসলিমের হৃদয়ছোঁয়া গল্প : আলোকের পথে আত্মিক যাত্রা (দ্বিতীয় পর্ব)

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান

চার. সে সময় কৌতূহল থেকেই শিশির নিয়মিত কুরআন শরিফ পড়তো। অর্থসহ বোঝার চেষ্টা করতো আয়াতগুলো। ইউটিউব, ফেসবুকে ইসলামি আলোচনা, বক্তৃতা—বিশেষ করে জাকির নায়েকের যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।

জাকির নায়েকের ভিডিও দেখারও এক বছর পর থেকে তার বিশ্বাস প্রকৃতপক্ষে দৃঢ় হতে শুরু করে। তখন আর শুধু কৌতূহল নয়, বরং স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে থাকে—এটাই সত্যের পথ, এটাই শান্তির ধর্ম। ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করে ইসলামি শিক্ষা ও আচার-আচরণে। যেন অনেকদিন ধরে হারিয়ে থাকা সত্যকে খুঁজে পেয়েছে।

আসলে যখন সে প্রথমবার এক হুজুরের কাছে কালেমা পড়েছিল, তখন তার মন পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। সেটা ছিল অনেকটাই দ্বিধা-সংকোচ ও অনিচ্ছার মিশেলে একটি শুরু। হৃদয়ের গভীরে তখনো দ্বিধা ছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা আলো জ্বলে উঠছিল—যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র হতে থাকে।

তবে কালেমা পাঠের কিছুদিন পর থেকেই তার অন্তর বদলে যেতে শুরু করে। ইসলাম তার মনে ধীরে ধীরে গভীরভাবে প্রোথিত হতে থাকে। বিশ্বাস দৃঢ় হয়, চিন্তাভাবনায় আসে পরিবর্তন। একসময় সে নিজেই অনুধাবন করে—এই পথই তার জন্য শ্রেষ্ঠ পথ, সত্য ও শান্তির একমাত্র ঠিকানা।

এরপর ধীরে ধীরে সে একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম হয়ে ওঠে। শুরু হয় নামাজের অভ্যাস। প্রথমদিকে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত পড়া হয়ে উঠত না, দু-এক ওয়াক্ত পড়ে ফেলত, কখনো আসর-মাগরিব দূরের মসজিদে গিয়ে আদায় করত।

কিন্তু যখন ইসলামের প্রতি ভালোবাসা, আল্লাহর সামনে মাথা নত করার আনন্দ ও প্রশান্তি গভীরভাবে অনুভব করতে শুরু করে, তখন থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এখন সে জানে—এই সিজদাগুলোতেই লুকিয়ে আছে তার হৃদয়ের শান্তি ও মুক্তির পথ।

পাঁচ. একবার তার বাবা কিছু দিনের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। এই সুযোগে সে নির্ভয়ে বাসায় নামাজ পড়া শুরু করে। আগে ভেতরে ভেতরে যে সংকোচ কাজ করতো, সেই সময়টুকু ছিল যেন তার জন্য হালকা নিঃশ্বাস ফেলার মুহূর্ত। বাসার পরিবেশটা ছিল ধর্মের ব্যাপারে কঠোর, তাই সবার চোখ এড়িয়ে সে নিজের ইবাদত চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো।

কিছুদিন পর বাড়ির মহিলারা বিষয়টি টের পেয়ে যান। অবশ্য তাকে নামাজ পড়তে দেখেও তারা কিছু বলেন না। মনে করেছিলেন, এটা সাময়িক—দুই দিন পড়বে, তিন দিন পরেই ছেড়ে দেবে। প্রচ্ছন্ন স্নেহেরও একটা বিষয় ছিল। এ কারণে তারা তার বাবাকেও কিছু বলেননি।

কারণ, জানতেন—বাবা যদি জানতে পারেন, তাহলে শুধু বকাবকি নয়, মারধর করতেও দ্বিধা করবেন না। কখনো কখনো এমনও সময় গেছে, যখন বাধ্য হয়ে তাকে ঠাকুর ঘরের এক কোণেই নামাজ আদায় করতে হয়েছে। যেখানে চারপাশে মূর্তি, ধূপ, আর প্রদীপ জ্বলতো, ঠিক সেখানেই সে আল্লাহর সামনে সিজদাহ করে চোখের পানি ফেলেছে। বাইরের দিক থেকে সবকিছু ছিল আগের মতো, কিন্তু তার ভেতরটা বদলে যাচ্ছিল, প্রতিদিন, ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে।

নামাজ পড়ার বিষয়টা যখন তার বাবার কানে পৌঁছায়, তখন যেন আকাশ ভেঙে পড়ে পরিবারের ওপর। শুরু হয় প্রচণ্ড রাগ, বকাঝকা, গালাগালির ঝড়। একপ্রকার অভিভাবকসুলভ আচরণ নয়, বরং যেন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এমন মনোভাব নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন বাবা।

তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি একাধিকবার কেড়ে নেওয়া হয়, কারণ তারা জানতেন—এই ডিভাইসটাই তার চিন্তার জগতে পরিবর্তন এনেছে। ইসলামি ভিডিও, কুরআনের তাফসির, জাকির নায়েক কিংবা অন্য দাঈদের আলোচনা—সবই যেন তাদের চোখে হয়ে ওঠে প্রচ্ছন্ন “হুমকি।”

তারপর থেকে তাকে রাখা হয় কঠোর নজরদারিতে। বাসা থেকে বের হলেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু—“কোথায় যাচ্ছ?” “কার সঙ্গে যাচ্ছ?” “কী করো?’ প্রতিটি পদক্ষেপে এক অদৃশ্য চোখ যেন তার পিছু নেয়। এমনকি পরিচিতদের সঙ্গেও মিশতে বাধা দেওয়া হতো, যেন ইসলামিক প্রভাব আর তার মাঝে ছড়াতে না পারে।

ঘরটা ধীরে ধীরে তার কাছে হয়ে উঠেছিল এক নিঃস্ব জেলখানা। যেখানে ইচ্ছেমতো শ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতাটুকুও আর ছিল না। অথচ এই ঘরেই সে একদিন পরিবার বলে আশ্রয় খুঁজতো। এখন সেই ঘরেই তার আত্মা যেন বন্দি হয়ে আছে—প্রার্থনার অপরাধে।

প্রথমবার বাবার হাতে শারীরিক আঘাত আসে তখন, যখন সে রমাদানে রোজা রাখা শুরু করে। যদিও সেটাকে তখন সে “এক্সট্রিম” বলবে না—কিছু কিল, থাপ্পড় আর লাথি ছিল মাত্র। তবে সেসবকেই আল্লাহর জন্য সহ্য করেছিল সে—নিঃশব্দে, মুখ বুজে। ভেবেছিল, হয়তো ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে বাধা, কঠোরতা, শ্বাসরুদ্ধ চাপ। শুধু রোজা বা নামাজ নয়—যে কোনো ধর্মীয় আমলেই পড়ে যেতে হয় জবাবদিহির মুখে। চোখে চোখ রাখলে সন্দেহ, একটু দীর্ঘ সেজদা দিলে নজরদারি, কোরআন হাতে নিলে বিদ্রুপ।

সবচেয়ে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়, সে আল্লাহর ইবাদত করতে পারছিল না—মন খুলে, স্বস্তিতে, ভালোবাসায়। পরিবার, যার উচিত ছিল সমর্থন আর মমতা দেওয়া, তারাই হয়ে ওঠে বাধা। এই অবস্থা অসহ্য হয়ে ওঠে এক রমাদানে।

একটা নিরব রাত, যখন চারদিকে তারাবির সুর, আর হৃদয়ে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস—তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয়, এবার ঘর ছাড়তে হবে, শান্তির খোঁজে বেরিয়ে পড়তে হবে। যেন অন্তর থেকে আল্লাহর ডাক আসছিল“এগিয়ে এসো, আমি আছি তোমার সঙ্গে।”

ছয়. তখন যার কাছে কালেমা পড়েছিলো, সেই হুজুরের সাথেই প্রথমে পরামর্শ করে। কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিল, যাদের সঙ্গে নিজের দোটানার কথা ভাগ করে নেয়। তারা ভালো চেয়েই বলেছিল—“আগে নিজে কিছু একটা করো, নিজের পায়ে দাঁড়াও, প্রতিষ্ঠিত হও—তারপর না হয় সিদ্ধান্ত নিও।”

তাদের কথাগুলো যুক্তিসঙ্গত হলেও, তার অস্থির হৃদয় সেসব কথায় সান্ত্বনা পায়নি। মন যেন চিৎকার করে বলছিল—“আর নয়, এখনই সময়, এই মুহূর্তেই চলে যেতে হবে। আল্লাহর পথে বাঁধাহীনভাবে হাঁটতে হবে।”

সেই ছটফটানি আরও তীব্র হয়, যখন রমাদানে সে নিয়মিত রোজা রাখা শুরু করে। তবে এই আত্মার ইবাদত শুরু হতেই ঘরে যেন আগুন লাগে। বাবা ক্ষেপে ওঠেন—শুরু হয় তিরস্কার, মানসিক নিপীড়ন আর অপমান।

দু’একটা রোজা রাখার পরই অবস্থা এমন দাঁড়ায়, সে আর রাখতে পারেনি। বাবার চাহনি, কথার বাণ, এমনকি ঘরের পরিবেশই যেন রোজার পথে এক অনন্ত প্রাচীর। অথচ তার মন তো ভরে যাচ্ছিল রোজা রাখায়—তৃপ্তি পেত, প্রশান্তি পেত। কিন্তু সেই প্রশান্তির মাঝেই শুরু হয় এক অন্তর্জ্বালা—যেখানে একদিকে আল্লাহর টান, আরেকদিকে পরিবারের বাধা। এই দ্বন্দ্বই তাকে ধীরে ধীরে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্তে নিয়ে যায়।

এই ঘটনার কিছুদিন আগে সে অনলাইনে একটি সংগঠনের সঙ্গে পরিচিত হয়—নওমুসলিম কল্যাণ ফাউন্ডেশন। সংগঠনটি সদ্য ইসলাম গ্রহণ করা ভাই-বোনদের সহায়তায় কাজ করে। তাদের কার্যক্রম দেখে তার মনে সাহস জাগে। যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানায় নিজের অবস্থা। সংগঠনটির পক্ষ থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়—তারা পাশে থাকবে, প্রয়োজনে সহায়তাও করবে।

এই সহানুভূতি ও ভালোবাসা তার ভেতর এক নতুন সাহসের জন্ম দেয়। তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয়—আর নয় ! রমাদানের এক পবিত্র রাতে সে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে নেয়। আগেভাগেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখে, সামান্য কাপড়চোপড়ও একপাশে জড়ো করে রাখে। কেবল অপেক্ষা ছিল তার হাতছাড়া মোবাইলটির জন্য, যা ছিল নজরদারির মধ্যে।

মোবাইলটি হাতে আসতেই সে আর দেরি করে না। আল্লাহর ভালোবাসায় মুখ ফিরিয়ে চলে যায় সেই ঘর থেকে, যেখানে তার ইবাদতের ওপর ছিল নিষেধাজ্ঞা, এবং শুরু করে নতুন এক অধ্যায়—শান্তির, ভালোবাসার, এবং একান্ত স্রষ্টামুখী জীবনের।

সাত. তখন সে সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রেখেছে। ইন্টারমিডিয়েটের পরীক্ষা শেষ, যদিও ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজারো প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত—তার হৃদয়ের ভেতর ঈমানের যে আলো জ্বলে উঠেছে, তা নিভে যাওয়ার নয়। তারুণ্যের সাহস, ইমানি জযবা আর আল্লাহর ওপর অগাধ তাওয়াক্কুল মিলে তাকে সাহসী করে তোলে।

নওমুসলিম কল্যাণ ফাউন্ডেশন তখন তার জন্য ছিল যেন রহমতের ছায়া। ঘর ছাড়ার পর এই প্রতিষ্ঠানই ছিল শিশিরের প্রথম ঠিকানা, প্রথম আশ্রয়। সেখান থেকেই শুরু হয় তার নতুন জীবনের এক অনিশ্চিত হলেও দৃঢ় পদচারণা—যেখানে পথের প্রতিটি ধাপেই ছিল আল্লাহর প্রতি ভরসা, অটল আস্থা, আর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এক গভীর প্রত্যয়।

তবে ঘর থেকে তার এই চলে যাওয়াটা মোটেও সহজ ছিল না। এক সংসারে জন্ম নেওয়া, বড় হওয়া, প্রতিটি দিন মা-বাবার স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা—এই সম্পর্কগুলো হঠাৎ পেছনে ফেলে চলে যাওয়া কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত ছিল না। ছেলেটির হৃদয়ের গভীরে ছিল বাবা-মার প্রতি অটুট ভালোবাসা, পরিবারের প্রতি টান, আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাকে মুহূর্তে মুহূর্তে টলিয়ে দিচ্ছিল। বাবা-মার বিরূপ মনোভাব, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়, সমাজের চোখে অবাঞ্ছিত হয়ে পড়ার শঙ্কা—সব মিলিয়ে এই ঘরছাড়া ছিল কঠিনতম এক আত্মত্যাগ।

কিন্তু শিশিরের হৃদয়ে ছিল এক অমোঘ টান—স্রষ্টার ভালোবাসার টান। সে বুঝে গিয়েছিল, দুনিয়ার সুখ-সম্পদ ক্ষণিকের, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। ইসলাম তাকে শিখিয়েছিল প্রকৃত মুক্তির পথ, আর সেই মুক্তির জন্যই সে বিসর্জন দিতে পেরেছে নিজের সবচেয়ে আপন জগতটাকে। শিশিরের চোখে তখন ইসলামই ছিল শ্রেষ্ঠ নেয়ামত, আর সামনে ছিল সাহাবাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার অনুপ্রেরণা। তাদের পথ ধরে চলাই ছিল তার লক্ষ্য, আর সেই পথেই শুরু হয় তার নতুন জীবনের যাত্রা—কঠিন হলেও অমূল্য সে সফর।

আরএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ