|| ইমরান ওবাইদ ||
দরুদ পাঠ—মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় দাবি। দরুদ পাঠে সওয়াবের পরিমাণও অনেক। হাদিসে আছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। (সহিহ মুসলিম)
আরবি একটি প্রবাদ আছে, যে যাকে বেশি ভালোবাসে, সে তাকে বেশি বেশি স্মরণ করে। তাই আমাদের উচিত চলমান রবিউল আউয়াল মাসসহ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। জীবনজুড়ে তাঁর প্রতি ভালোবাসার চিহ্ন অধিকহারে রেখে যাওয়া—যা আমাদের কবর, পুলসিরাত, হাশরসহ জান্নাত অবধি কাজে আসবে।
দরুদ পাঠের পাঁচ উপকারিতা:
১. বিরাট সওয়াব:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি একবার দরুদ পাঠ করলে দশবার দরুদ পাঠকারীর ওপর রহমত বর্ষিত হয়। সহিহ মুসলিমের এক হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন।
সুনানে নাসায়ির এক হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেন এবং তার মর্যাদা দশ গুণ বাড়িয়ে দেন।
২. নৈকট্য লাভ:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার পেছনে অন্যতম একটি চাওয়া-পাওয়া হলো—পরকালে তাঁর নৈকট্য লাভ। আর এই নৈকট্য পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম—তাঁর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
তিরমিজি শরিফের এক হাদিসে আছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার প্রতি সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে।
৩. মানসিক প্রশান্তি:
চিন্তা, পেরেশানি মানুষের নিত্যসঙ্গী। মানসিক স্থিরতা পেতে বিশেষজ্ঞদের পেছনে হাজার-লাখ টাকা খরচও করে অনেকে। অথচ কোনো আর্থিক খরচ ছাড়াই এর থেকে মুক্তি সম্ভব। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ পাঠে রয়েছে মানসিক স্থিরতার মহাওষুধ।
এক হাদিসে আছে, হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করি। আমার দোয়ার কতটুকু অংশ আপনার প্রতি দরুদের জন্য নির্ধারণ করব? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করতে পার। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করতে পার; তবে যদি বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, অর্ধেক? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করতে পার; তবে যদি বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, দুই-তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করতে পার; তবে যদি বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, আমি যদি আমার সব দোয়া আপনার প্রতি দরুদ পাঠে ব্যয় করি? তিনি বললেন, তাহলে তোমার দুশ্চিন্তা দূর করে দেওয়া হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (সুনানে তিরমিজি)
৪. দোয়া কবুলের উপায়:
সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপনের অন্যতম হাতিয়ার হলো দোয়া করা। বান্দা আল্লাহ তায়ালার কাছে চাইলে তিনি খুশি হন; না চাইলে নারাজ হন। তবে আমাদের গুনাহের কারণে অনেক সময় দোয়া কবুল হয় না বা হতে দেরি হয়, হাদিসের ভাষায়—আসমান ও জমিনের মাঝে ঝুলে থাকে। নবীজির প্রতি দরুদ পাঠের বরকতে সেই দোয়াও আল্লাহ তায়ালা কবুল করে নেন।
হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে এই মর্মে একটি হাদিস বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে আটকে থাকে। দরুদ পাঠ না করা পর্যন্ত এর কোনো অংশ ওপরে ওঠে না। (সুনানে তিরমিজি)
সুনানে তিরমিজির এক হাদিসে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করার একটি পদ্ধতি শিখিয়েছেন। তিনি বলেন, দোয়া করার সময় প্রথমে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ পাঠ করবে। তারপর নিজের প্রয়োজনমতো যা ইচ্ছা আল্লাহ তায়ালার কাছে চাইবে। (সুনানে তিরমিজি)
৫. আত্মিক পরিশুদ্ধি:
মানুষের হৃদয় তার পুরো সত্তার প্রতিচ্ছবি। আত্মা পবিত্র হলে তার সৌন্দর্য স্বাভাবিকভাবেই আচরণে প্রকাশ পায়, যার সৌন্দর্য চারপাশেও ছড়িয়ে পড়ে। পরিশুদ্ধ করার অন্যতম হাতিয়ার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
লেখক: সাব-এডিটর, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর
আইও/