নিজস্ব প্রতিবেদক:
‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি বিল ২০২৬’ নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন দেশের বিশিষ্ট ফকীহ এবং শায়খ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, প্রধান মুফতি ও শাইখুল হাদিস মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ। তিনি বলেছেন, সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনটি শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান মীরাস ও ফারায়েজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সঙ্গে আলোচনা করে এর শরয়ি, আইনি ও সামাজিক দিক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে জেদ্দায় ওআইসি আয়োজিত আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির সম্মেলনে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছেন। দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন মহলের অনুরোধে তিনি নিজের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতামূলক বক্তব্য তুলে ধরছেন।
মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ বলেন, বিলটি উত্থাপনের আগেই দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের মতামত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। এখনো সময় আছে—সরকার ও আলেমদের মধ্যে সমন্বিত বৈঠকের মাধ্যমে বিলটির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
বিলটি নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর সন্তান বা নাতি-নাতনির কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন এবং নিজের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন—এমন সুযোগ রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদের মতে, বিষয়টি মীরাস বা ফারায়েজের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোরআন-হাদিসে মীরাসের বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হওয়ায় এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, ‘কোরআন ও হাদীসের আলোকে ইসলামী ফিকহের কিতাবগুলোতে ফারায়েজের যে বিধানগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো আল্লাহ তাআলার বিধান। কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য সেসব বিধানের বিপরীতে মানব রচিত কোনো বিধান প্রবর্তন করা জায়েজ নয়।’
সরকারের মানবিক যুক্তি স্বীকার, তবে পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন
প্রস্তাবিত আইনের পেছনে সরকারের যে মানবিক যুক্তি রয়েছে, সেটি পুরোপুরি অস্বীকার করেননি মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ। তিনি বলেন, বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটে যেখানে কোনো মাতা-পিতা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পদ দেওয়ার পর নিজেরাই পরিবারের কাছে অবহেলিত বা নিগৃহীত হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের আশ্রয় হয় আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে।
এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় রোধ করা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্পদ হস্তান্তরের পরও দাতার জীবদ্দশায় ভোগাধিকার সংরক্ষিত থাকলে তিনি অন্তত শেষ বয়সে সম্পদ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হবেন না—আইনটির পেছনে সরকারের এমন যুক্তি থাকতে পারে।
তবে তাঁর বক্তব্য, সামাজিক একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যদি শরিয়তের কোনো সুস্পষ্ট বিধানের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি হয়, তাহলে সেই সমাধানও নতুন জটিলতার জন্ম দিতে পারে। তাই মানবিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি শরিয়তের বিধানও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ বলেন, ইসলামী আইনে হেবা একটি স্বতন্ত্র চুক্তি। হেবা সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে গ্রহীতার কাছে মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি সম্পদের দখল ও নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তি হেবা করার পরও যদি দাতা এমনভাবে তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন যে গ্রহীতা বাস্তবে দখল ও কর্তৃত্ব লাভ না করেন, তাহলে সেটি শরিয়তের দৃষ্টিতে পূর্ণ হেবা হিসেবে গণ্য হওয়ার প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘গিফট’ বা ‘হেবা’ যে নামেই সম্পত্তি হস্তান্তর করা হোক, শুধু নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে এর শরয়ি প্রকৃতি পরিবর্তিত হবে না। মালিকানা, দখল, নিয়ন্ত্রণ ও চুক্তির বাস্তবতার ওপর এর হুকুম নির্ভর করবে।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইনে গ্রহীতাকে মালিক বলা হলেও শরয়ি দৃষ্টিতে দাতার মৃত্যুর পর ওই সম্পত্তি মীরাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মেয়ে বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা
মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ বলেন, কোনো ব্যক্তি ছেলে না থাকায় শুধু মেয়ে কিংবা নাতি-নাতনিকে জীবদ্দশায় সম্পত্তি দিয়ে যেতে চাইতে পারেন। কিন্তু এর মাধ্যমে অন্য কোনো ওয়ারিশকে শরিয়তসম্মত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ তৈরি হলে তা সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, জীবিত অবস্থায় হেবা করা নিষিদ্ধ নয়। তবে কোনো ওয়ারিশকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পদ অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। সন্তানদের মধ্যে অন্যায় বৈষম্যের ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে।
তাঁর মতে, জীবদ্দশায় সম্পদ বণ্টন করা হলে ন্যায়, ইনসাফ ও শরিয়তের মূলনীতি অনুসরণ করা জরুরি। কোনো ওয়ারিশকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ সম্পদ অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
‘একটি ভুলের সমাধান আরেকটি বিতর্কিত পদ্ধতিতে নয়’
রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ অন্যায়ভাবে সম্পদ বণ্টন করলে সেটি এক ধরনের বিষয়। কিন্তু সেই সামাজিক সমস্যার প্রতিক্রিয়া সামাল দিতে গিয়ে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা উচিত নয়, যা শরিয়তের মূলনীতির সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, সামাজিক অবক্ষয় রোধের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও সেই উদ্দেশ্য পূরণের পদ্ধতিও ন্যায়সংগত ও শরিয়তসম্মত হওয়া জরুরি।
শরিয়তসম্মত সমাধানের আহ্বান
মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদের মতে, এ ধরনের সমস্যার সমাধানে পরিবারব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সন্তানদের মধ্যে মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করা এবং সম্পদ বণ্টনে শরিয়তের নীতিমালা অনুসরণ—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মাতা-পিতার প্রতি সদাচরণ, তাঁদের ভরণপোষণ, সম্মান ও দায়িত্ব পালন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। কোনো সন্তান বৃদ্ধ মাতা-পিতাকে অবহেলা বা নিগৃহীত করলে সেটি গুরুতর সামাজিক ও নৈতিক সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে শরিয়তের বিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই; বরং শরিয়তের বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন।
ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে বৈঠকের আহ্বান
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ বলেন, বিলটি ইসলামী শরিয়তের একটি স্পর্শকাতর বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি।
প্রয়োজনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ওলামায়ে কেরাম ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সরাসরি বৈঠকের আয়োজন করারও প্রস্তাব দেন তিনি। সেখানে বিলটির প্রতিটি ধারা সামনে রেখে শরয়ি, আইনি ও সামাজিক দিক বিশ্লেষণ করে আপত্তির জায়গাগুলো নিরসনের চেষ্টা করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এখনই প্রয়োজন—বিতর্ক নয়, সংলাপ; সংঘাত নয়, সমাধান; আবেগ নয়, ন্যায় ও শরিয়তের আলোকে সিদ্ধান্ত।’
সবশেষে মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ বলেন, তিনি কোনো চূড়ান্ত ফতোয়া বা আইনি সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না; বরং সরকারের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়ে বসে কোরআন-হাদিসের বিধানকে সামনে রেখে একটি যৌক্তিক, ন্যায়সংগত ও মানবিক সমাধানে পৌঁছানোর জন্য।
আইও/