|| মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ ||
গত কয়েক মাস ধরে মাদরাসাগুলোতে সংঘটিত নানা রকম যৌন অনাচারের অভিযোগ/খবর সামনে আসছে। এগুলো লজ্জাজনক, পীড়াদায়ক ও শাস্তিমূলক অপরাধ। মাদরাসাগুলোর ভেতরে বাইরে এ জাতীয় অনাচারের কঠোর শাস্তির দাবি উঠছে । এ বিষয়টি নিয়ে আমি বেশ কয়েকবার লিখেছি এবং অন্য অনেকেই যার যার জায়গা থেকে কথা বলছেন, ভূমিকা রাখছেন।
আজকে এ বিষয়ে নতুন দু-একটি কথা বলি। কথাগুলো অত্যন্ত দরকারি মনে হয়েছে।
এক নাম্বার কথা: যৌন অনাচারের অভিযোগ তুলে তাৎক্ষণিকভাবে আইন হাতে তুলে নিয়ে মাদরাসা শিক্ষক/মুহতামিমকে মারধর করা, মাদরাসা ভাঙচুর করা এবং মারাত্মক একটা মবের পরিস্থিতি তৈরি করার ব্যাপারগুলো বিনা প্রতিবাদেই চলছে। এবং পরিস্থিতি এমন যে মিডিয়া এবং সাধারণ মানুষ যেন বিষয়টাকে মেনে নিচ্ছেন। ঘটনা সত্য হোক কিংবা মিথ্যা আইন হাতে তুলে নিয়ে মব তৈরি করার সুযোগ তো নাই। অভিযুক্ত ব্যক্তি কে ধরে পুলিশের কাছে দিয়ে দেওয়া এটা হতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী হলে তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া এটাও হতে পারে; হওয়া উচিত।
কিন্তু কোনোরকম যাচাই বাছাই ও বিচারের আগেই অভিভাবক কিংবা এলাকাবাসীর নামে মাদ্রাসায় এসে শিক্ষক এবং মাদ্রাসা মারধর ভাঙচুর ফৌজদারি অপরাধ। এ বিষয়ে সচেতনতা এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং আইনি পদক্ষেপ নিতে সবাই কে আহবান করছি। মনে রাখতে হবে, মব মবই এটা অপরাধ। এটা কিছুতেই চলতে দেওয়া যাবে না। অভিযুক্ত কিংবা অপরাধীকে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে।
দুই নাম্বার কথা: খেয়াল করলে দেখবেন, মাদরাসায় যৌন অপকর্মের ইস্যুগুলো মিডিয়ায় এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আসতে শুরু করেছে গত এপ্রিল মাসের শেষ থেকে। এখন সেপ্টেম্বর চলছে। গত চার মাস যাবত এজাতীয় নিউজ এবং অভিযোগ ও খবর বেশি আসছে। গত ২৬ এপ্রিল বাড্ডায় ঢাবির চারুকলার এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং তার সঙ্গে ঢাবির থিয়েটার বিভাগের সংখ্যালঘু ধর্মের এক শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী র প্রেম থাকার কথা সামনে এসেছে। এটা নিয়ে মিডিয়ায় ও সামাজিক চাপ তৈরি হওয়ার পর থেকে মাদরাসা সংশ্লিষ্ট খারাপ খবর বেশি আসতে শুরু করেছে।
হয়তো একটার সঙ্গে আরেকটা কোনো মিল নাই। কার্যকারণ ঘটিত কোনো সম্পর্কও নাই। তবু ঘটনা এভাবে ঘটছে। এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, কী বিষয় থাকতে পারে তা আমার বুঝে আসে না। আপনারা চিন্তা করে দেখতে পারেন।
আরেকটা ব্যাপার হলো, গত চার মাসে সম্পূর্ণ একচেটিয়াভাবে মাদ্রাসা এবং ইসলাম ধর্মীয় অঙ্গনের যৌন অনাচারের এত খবর সামনে আসছে যে, এই সময়ের মধ্যে স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস আদালতে , নাটক সিনেমা মিডিয়ায় , হাটে-ঘাটে, পরিবহনে বাজারে সাধারণ জনবসতির যতগুলো পয়েন্ট আছে, সেখান থেকে দশটি যৌন অনাচারের ঘটনা মিডিয়ায় আসে নাই। এটা কি কোনো সাধারণ হিসাবের মধ্যে সম্ভব? গত চার মাসে সারা বাংলাদেশটাই পবিত্র! শুধু মাদ্রাসা মসজিদ আর হুজুরগুলো আকাম-কুকামের আখড়া? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটা কিভাবে সম্ভব?
এখানে অতি প্রচার-প্রচারণা, একচেটিয়া ভাব তৈরি করা কিংবা কোনো সিন্ডিকেট বাজির কোন ব্যাপার আছে কিনা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
গত চার মাসে দেশের সকল প্রান্তে ও অঙ্গনে যৌন অনাচারের তেমন কোনো খবর নাই; শুধু মাদ্রাসা থেকে এসব খবর আসছে। এ ব্যাপারটাকেই অসম্ভব এবং অবাস্তব মনে হচ্ছে। সবদিকের সবাই ভালো হয়ে গেল, হুজুররাই শুধু নোংরামির মধ্যে লিপ্ত হয়ে গেল? বাংলাদেশ কি আগে থেকেই এরকম? পরিসংখ্যান এবং হার অনুযায়ী এটা কি সম্ভব? মাদরাসার অপরাধীদেরকে ছোট করে দেখাতে চাচ্ছি না। যারা অপরাধী তারা অবশ্যই অপরাধী। তাদের কঠোর বিচার দরকার। কিন্তু প্রচার প্রপাগান্ডায় ও দোষী সাব্যস্ত করণে এবং মাদরাসার প্রতি অনস্থা তৈরি করার ক্ষেত্রে কোনো ষড়যন্ত্রের খেলা চলছে কি না এটাও দেখা দরকার বলে মনে করি।
আবারো বলছি, মাদরাসা অঙ্গনে যৌন অপরাধি হিসেবে প্রমাণিত হবে তাদের ফটো থেকে কঠোরতর বিচার চাই। মাদরাসার শিশু কিশোর শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা চাই। কোনো তুলনা প্রতি তুলনা ছাড়াই মাদরাসার পরিবেশ সুরক্ষা শতভাগ ব্যবস্থা চাই। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে একচেটিয়া প্রচার প্রোপাগান্ডা ও মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন ও চৌকান্না হওয়ার আহ্বান জানাই।
লেখক: জ্যেষ্ঠ আলেম সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও আলোচক
এসএইচ/