শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ।। ২১ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
আওয়ার ইসলামের সিরাত প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশ, পুরস্কার পাচ্ছেন ৭৫ জন ‘শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রতিভা ও আগ্রহ চিহ্নিত করে সামনে এগোতে হবে’ বিহারে আলেমদের সেমিনার, ফিকহি ঐতিহ্য সংরক্ষণে ১০ প্রস্তাব আল্লাহর ওলিদের অসম্মানের পরিণতি কত ভয়াবহ! হাম উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৩১৪ দক্ষিণ কোরিয়ার মুসলিম নেতার সঙ্গে মাওলানা অলিউল্লাহ এমপির সৌজন্য সাক্ষাৎ বায়তুল মোকাররমে কোরআন খতম ও বিশেষ দোয়া মাহফিল ৭ নভেম্বর  আলিগড়ে ১০৫ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী ভিপি, নাশরা নাইমের জয় আ.লীগের গায়ে আলেম-ওলামার রক্তের দাগ, রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১০ মাসে সিহাহ সিত্তাহ হিফজ করলেন আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ

আল্লাহর ওলিদের অসম্মানের পরিণতি কত ভয়াবহ!

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

ইসলামে আল্লাহ তাআলার নেক বান্দা, দ্বীনদার আলেম, বুযুর্গ ও ওলিদের সম্মান করা ঈমানি আদবের অন্তর্ভুক্ত। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন পরিচালনা করেন, দ্বীনের খেদমত করেন এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানান, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রাখা একজন মুমিনের উত্তম বৈশিষ্ট্য। তাঁদের সম্মান করা মানে তাঁদের উপাসনা করা নয়; বরং আল্লাহর দ্বীন ও দ্বীনের ধারকদের প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদর্শন করা।

অন্যদিকে, আল্লাহর নেক বান্দাদের নিয়ে বিদ্রূপ, অবমাননা, কটূক্তি কিংবা তাঁদের সম্মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা অত্যন্ত ভয়াবহ একটি কাজ। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহওয়ালা মনে করলেই তাঁর সব কথা বা কাজ সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায় না। শরিয়তবিরোধী কোনো বক্তব্য বা কাজের প্রতিবাদ করা যেতে পারে; কিন্তু প্রতিবাদের নামে গালি, 
অপমান ও বিদ্রূপ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে শত্রুতার ভয়াবহতা

আল্লাহ তাআলা হাদিসে কুদসিতে তাঁর ওলিদের মর্যাদা সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ

“যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২) 

এই হাদিস আল্লাহর নেক বান্দাদের মর্যাদা এবং তাঁদের সঙ্গে শত্রুতার ভয়াবহ পরিণতি স্পষ্ট করে দেয়। আল্লাহর ওলিদের সঙ্গে শত্রুতা করা এমন অপরাধ, যার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ, অকারণে অপমান কিংবা তাঁদের সম্মানহানি করার চেষ্টা কোনো সাধারণ বিষয় নয়।

তবে কারও প্রতি আল্লাহর ওলির মর্যাদা আরোপের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। প্রকৃত ওলি হওয়ার মানদণ্ড হলো ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর আনুগত্য—শুধু মানুষের প্রশংসা বা প্রচলিত খ্যাতি নয়।

আল্লাহওয়ালাদের মর্যাদা পবিত্র কোরআনে

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় ও মর্যাদা তুলে ধরে বলেন, 

أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ۝ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ

“জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।” (সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩) 

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর ওলি হওয়ার মূল পরিচয় হলো ঈমান ও তাকওয়া। তাঁরা আল্লাহর আনুগত্য করেন, পাপ থেকে বেঁচে থাকেন এবং দ্বীনের পথে অবিচল থাকেন। এমন বান্দাদের সম্মান করা এবং তাঁদের প্রতি ভালো ধারণা রাখা মুমিনের কর্তব্য।

মুমিনকে বিদ্রূপ করা নিষিদ্ধ

আল্লাহ তাআলা শুধু আল্লাহওয়ালাদের অপমান থেকেই নয়, সাধারণ মুমিনদের বিদ্রূপ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য থেকেও নিষেধ করেছেন। ইরশাদ করেন, 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَىٰ أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ

“হে ঈমানদারগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম।” (সূরা হুজুরাত: ১১) 

আল্লাহ তাআলা এখানে এমন একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, যা মানুষ প্রায়ই ভুলে যায়। যাকে আমরা তুচ্ছ মনে করছি, সে হয়তো আল্লাহর কাছে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মর্যাদাবান। বাহ্যিক অবস্থা, সম্পদ, সামাজিক পরিচিতি কিংবা মানুষের প্রশংসা দিয়ে আল্লাহর কাছে কারও মর্যাদা নির্ধারণ করা যায় না।

সুতরাং কোনো আলেম, বুযুর্গ কিংবা দ্বীনদার ব্যক্তিকে নিয়ে হাসাহাসি করা, তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ বা দ্বীনি আমলকে বিদ্রূপ করা কিংবা তাঁর সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করা একজন মুমিনের জন্য শোভন নয়।

আল্লাহওয়ালাদের সম্মান করা ঈমানি আদব

আল্লাহর নেক বান্দাদের সম্মান করার শিক্ষা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসেও রয়েছে। তিনি বলেন, 

لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا

“যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৯১৯) 

এ হাদিসে বড়দের সম্মান করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। দ্বীনের জ্ঞান, বয়স, অভিজ্ঞতা ও নেক আমলের কারণে যারা মর্যাদার অধিকারী, তাঁদের যথাযথ সম্মান করা ইসলামের সুন্দর আদব।

বিশেষ করে আলেম ও দ্বীনের খাদেমদের সম্মান করা দ্বীনের প্রতি সম্মানেরই একটি প্রকাশ। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় শালীনতা বজায় রাখা, তাঁদের অবদান স্বীকার করা এবং অযথা অপমান না করা মুমিনের দায়িত্ব।

আল্লাহওয়ালাদের ভুল হলে কী করব?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহওয়ালাদের সম্মান করার অর্থ তাঁদের ভুলকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। কোনো আলেম, বুযুর্গ বা দ্বীনদার ব্যক্তি ভুল করলে তাঁর ভুল সংশোধনের চেষ্টা করা যেতে পারে। কারণ, নবী-রাসুল ছাড়া অন্য কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নন।

তবে ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও ইসলামের আদব বজায় রাখতে হবে। যুক্তি, দলিল ও সুন্দর ভাষার মাধ্যমে ভুলের প্রতিবাদ করা এক বিষয়; আর ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে গালি দেওয়া, অপমান করা কিংবা বিদ্রূপ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, 

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ

“আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।” (সূরা নাহল: ১২৫) 

অতএব, দ্বীনের কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে সুন্দরভাবে আলোচনা করা, দলিল উপস্থাপন করা এবং সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখা জরুরি। ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা বিদ্বেষ যেন আমাদের ভাষা ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ না করে।

জিহ্বার অবাধ ব্যবহার ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে

মানুষ অনেক সময় কথার গুরুত্ব উপলব্ধি না করেই মন্তব্য করে বসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে নিয়ে বিদ্রূপ, কটূক্তি, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট কিংবা অপমানজনক ভিডিও তৈরি করা যেন সহজ হয়ে গেছে। অথচ একজন মুমিনের প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 

إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللَّهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَرْفَعُهُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَاتٍ وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ

“বান্দা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোনো কথা বলে, যার গুরুত্ব সে উপলব্ধি করে না; অথচ আল্লাহ তার কারণে তার মর্যাদা বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। আবার বান্দা কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোনো কথা বলে, যার গুরুত্ব সে উপলব্ধি করে না; অথচ এর কারণে সে জাহান্নামে পতিত হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৮) 

এই হাদিস আমাদের সতর্ক করে দেয়, মুখের একটি কথাও মানুষের পরিণতি পরিবর্তন করে দিতে পারে। তাই আল্লাহর নেক বান্দাদের নিয়ে মন্তব্য করার আগে চিন্তা করা উচিত—আমার এই কথাটি কি সত্য, প্রয়োজনীয় এবং শরিয়তের আদবসম্মত?

আল্লাহওয়ালাদের অপমান থেকে বাঁচার উপায়

আল্লাহর নেক বান্দাদের শানে বেয়াদবি থেকে বাঁচতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। 

- নিজের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকা: অন্যকে অপমান করতে গিয়ে নিজের আমলনামা ভারী পাপের বোঝায় পরিপূর্ণ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
- জিহ্বা ও লেখার নিয়ন্ত্রণ রাখা: মুখে বলা কথার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা মন্তব্যেরও হিসাব দিতে হবে।
- দ্বীনি ব্যক্তিত্বদের প্রতি ভালো ধারণা রাখা: তাঁদের কোনো ভুল দেখলে অপমান না করে সংশোধনের চেষ্টা করা।
- মতভেদে শালীনতা বজায় রাখা: সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকা।
- নিজের ভুলের জন্য তওবা করা: অতীতে কাউকে অপমান করে থাকলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছেও ক্ষমা চাওয়া।

আল্লাহর নেক বান্দাদের সম্মান করা, তাঁদের প্রতি ভালোবাসা রাখা এবং তাঁদের সঙ্গে শালীন আচরণ করা একজন মুমিনের ঈমানি সৌন্দর্য। আর তাঁদের নিয়ে বিদ্রূপ, কটূক্তি কিংবা অকারণ অপমান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ। বিশেষ করে আল্লাহ তাআলা তাঁর ওলিদের সঙ্গে শত্রুতার ব্যাপারে যে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন, তা প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে রাখা উচিত।

তবে সম্মান প্রদর্শনের নামে কাউকে শরিয়তের ঊর্ধ্বে তুলে ধরা যাবে না; আবার ভুল সংশোধনের নামে অসম্মানও করা যাবে না। সত্যকে সত্য বলা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা—দুটিই ইসলামের শিক্ষা।

আসুন, আমরা আমাদের জিহ্বা, কলম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকে সংযত করি। আল্লাহর নেক বান্দাদের সম্মান করি, দ্বীনের আলেমদের মর্যাদা রক্ষা করি এবং নিজেদের এমন সব কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখি, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের ভালোবাসা, সম্মান ও তাঁদের আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ