দীনুহুম দানানিরুহুম কিবলাতুহুম নিসাউহুম!
ডিসেম্বর ১৭, ২০২২ ৮:৩৪ অপরাহ্ণ

মাওলানা মাহমুদুল হাসান নু’মান ।।

(টাকা পয়সা তাদের ধর্ম নারী তাদের কেবলা) শিরোনামটি একটি হাদীসের খন্ডাংশ। হজরত আলী (রাঃ) থেকে বর্নিত- রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেন, মানুষের উপর এমন যুগ আসছে- যখন মানুষ শুধু পেটের ধান্ধা করবে, টাকা পয়সা হবে তাদের ধর্ম, নারী হবে তাদের কেবলা, এরা সৃষ্টির নিকৃষ্টতম জীব, আখিরাতে তাদের কোন অংশ থাকবে না (কানযুল উম্মাল)।

যুগে যুগে যারা ধর্মহীন নাস্তিক তাদের কোন ধর্ম ও কেবলা থাকেনা বিধায় তাদের উদ্দেশ্য থাকে একমাত্র ভোগ-বিলাস। জীবনকে উপভোগ করার লক্ষ্যে তাদের ধর্ম বা সাধনা হল টাকা পয়সা আর ভোগের জন্য তাদের কেবলা বা লক্ষ্য হলো নারী। কাজেই এটা যে নাস্তিক্যবাদী দর্শন তার প্রমাণ হিসাবে দুই মহাকাল থেকে আমি দুটি উদাহরণ পেশ করছি।

প্রাচীন চার্বাক দর্শনে বলা হয়েছে “ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ” (ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যতদিন বাঁচো সুখে বাঁচ)। চার্বাক দর্শন হলো প্রাচীন ভারতীয় বিখ্যাত নাস্তিক্যবাদী দর্শন। চার্বাকপন্থীরা মনে করতেন যে, পৃথিবী বস্তুগত এবং চারটি মৌল উপাদান নিয়ে গঠিত- তেজ অপ মরুৎ ক্ষিতি (অগ্নি জল বায়ু মৃত্তিকা)।

মানুষসহ সমগ্র প্রাণী জগৎ এসব উপাদানে গঠিত। মৃত্যুর পর জীবদেহ নষ্ট হয়ে এসব উপাদানে মিশে যাবে। চার্বাকপন্থীরা বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর সাথে সাথে শরীর ও আত্মার চির সমাপ্তি ঘটে। তারা স্রষ্টা, আত্মার অমরত্ব, পরলোক ইত্যাদিতে বিশ্বাস করতেন না। পরকালে বিশ্বাসী ছিলনা বিধায় চার্বাকপন্থীদের একমাত্র লক্ষ ছিল পার্থিব ভোগ বিলাস।

আধুনিক সেকুলার দর্শন
মধ্যযুগের ইউরোপ ছিল গির্জার নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে পুরোহিতরা অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে শোষণে শাসনে জনগণকে অতিষ্ঠ করে তুলে। তাদের ভোগ-বিলাস, চরিত্রহীনতা, মাত্রাতিরিক্ত বিভিন্ন করারোপ, ইনকুইজিশন কোর্টে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে মুক্ত চিন্তার বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের আগুনে পুড়িয়ে মারা, ডাইনি হত্যা, বেহেশতের টিকেট (indulgence) বিক্রি ইত্যাদি কারণে জনগণ গির্জার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ষোল শতকে যাজক মার্টিন লুথার প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ক্যাথলিক চার্চের একক শক্তিকে দ্বিখন্ডিত করে ফেলেন। তারপর ১৮ শতকে শুরু হয় আলোকায়ন আন্দোলন (Enlightenment movement)।

তখন বুদ্ধিজীবীরা জনগণকে গির্জার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেন। অবশেষে ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে গির্জা ও সামন্ত প্রভুদের কর্তৃত্ব খতম করা হয়। গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়, গির্জার কর্মকান্ড চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়। এভাবে পুরোহিতদের সীমালংঘনের কারণে খ্রিস্ট জগত ধর্ম বর্জন করে নাস্তিক হয়ে যায় এবং আলোকায়ন আন্দোলনের ফসল হিসাবে ভূপৃষ্ঠে সর্বপ্রথম সেকুলারিজম নামক বস্তুটির জন্ম হয়।

ধর্ম বর্জন করার পর এই সেকুলার সমাজের সামনে স্রষ্টা পরকাল ও জবাবদিহিতার কোন ভয় থাকলো না। তখন তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠলো এনজয়- ভোগ বিলাস। অর্থাৎ খৃষ্ট ধর্ম বর্জন করে এখন তাদের নতুন ধর্ম তথা জীবন চর্চা ও সাধনা হয়ে উঠল ধন-সম্পদ আর কেবলা বা লক্ষ্য উদ্দেশ্য হয়ে উঠল নারী। কারণ ভোগ-বিলাসের জন্য প্রয়োজন ধন-সম্পদ আর ভোগের জন্য নারী। এ দুটি বিষয়ে পশ্চিমারা পৃথিবীর বুকে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো যার উদাহরণ সৃষ্টির আদি থেকে পৃথিবীর বুকে আর কোথাও দেখা যায়নি।

কারণ এই সেকুলার পন্থীরা ভোগ-বিলাসের জন্য সম্পদ আহরণে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লো। বিভিন্ন দেশ আবিষ্কার করল, উপনিবেশ স্থাপন করল, লুটপাট করল, আফ্রিকায় নিকৃষ্টতম প্রথা দাস ব্যবসা করলো, উপমহাদেশ ও আফ্রিকার সোনা হীরা লুট করে বিরান করে ফেলল। তাদের লুটপাটের কারণে দেশে দেশে কোটি কোটি বনি আদম দুর্ভিক্ষে মারা গেল। এভাবে পুঁজি সংগ্রহ করে ইউরোপ শিল্প বিপ্লব গড়ে তুলল। আর অদ্যাবধি তারা পৃথিবীকে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব শোষণ করে যাচ্ছে। এটাই হলো ধন-সম্পদ তাদের ধর্ম হওয়ার ব্যাখ্যা।

পক্ষান্তরে তাদের কেবলা তথা লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো নারী। পাশ্চাত্যের সেকুলার সভ্যতা নারীকে এতটা উন্মুক্ত করেছে যা দিবসের সূর্য আর রাতের নক্ষত্র রাজি বিশ্বের বুকে আর কখনো দেখেনি। কারণ এই সেকুলার সভ্যতার আগে পৃথিবীর প্রত্যেকটি জাতি গোষ্ঠীর নারীরা স্ব স্ব ধর্মের অধীনে নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতো, নারী সম্ভ্রমকে সর্বোচ্চ সম্মান ও গুরুত্ব দেয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে নারীকে করা হয়েছে সার্বজনীন ও সর্বস্থানিন, জলে স্থলে অন্তরিক্ষে তাকে করা হয়েছে উপভোগ্য। স্বল্প বসনা অশ্লীলতা বেহায়াপনা ব্লু ফিল্ম পতিতাবৃত্তি, অশ্লীল সাহিত্য নাটক সিনেমা, পণ্যের গায়ে নগ্ন নারীর লেভেল এঁটে নারীকে করা হয়েছে পণ্যের পণ্য, যেদিকে তাকানো যায় যে কোন পণ্যদ্রব্য ও বস্তুর দিকে তাকানো যায় সর্বত্র অর্ধ উলঙ্গ নারী ও তাদের ছবি- চিত্র। এভাবে সত্যিই নারী হয়ে উঠেছে কেবলা।

আমাদের দেশের সেকুলার শিক্ষিতরা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। যারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে তারা সংযমী জীবনযাপন করে। কিন্তু যারা পশ্চিমা সেকুলার দর্শনে বিশ্বাসী তারা দেশটাকে দুহাতে লুটপাট করছে, অর্থ পাচার করছে, বিদেশে বেগম পাড়া বানাচ্ছে, নারী নিয়ে মৌজ করছে।
কাজেই প্রমাণিত হলো, উক্ত হাদিসের প্রতিপাদ্য হল বর্তমান সেকুলার সভ্যতা।

রাসূল (সাঃ) চৌদ্দশত বছর পূর্বেই এ সম্পর্কে সতর্ক করে গেছেন। এখন এ থেকে মুক্তির উপায় হলো মানুষকে দ্বীনের পথে ধর্মের পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশ্চাত্য সভ্যতার কুফল ও ইসলামের কল্যাণময়তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। মুসলমানরা যখন পশ্চাত্যের রীতিনীতি বর্জন করে ইসলামে ফিরে আসবে তখনই ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি ফিরে আসবে, সেই সাথে মুসলিম বিশ্ব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।

-এটি