শীতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে ভিটামিন সি
নভেম্বর ১৭, ২০২২ ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক: শীতের শুরুতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে সর্দি-কাশি, জ্বর, সর্দি, গলা ব্যথা, জ্বরের মতো সমস্যায় ভোগেন বেশিরভাগ মানুষ। সেই সঙ্গে রয়েছে করোনা, ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব। এমন পরিস্থিতিতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শীতে স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া জরুরি। সুস্থ থাকার জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর খাবারের মাধ্যমে অনাক্রম্যতা উন্নত করা যেতে পারে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি এই কাজটিকে সহজ করে দিতে পারে।

দেহের সুস্থ বিকাশের জন্য ভিটামিন সি প্রধান ভূমিকা পালন করে। সকল ভিটামিন দেহে উৎপাদিত হলেও ভিটামিন-সি আলাদা করে গ্রহণ করতে হয়। প্রতিদিনের খাবার থেকেই শরীর ভিটামিন সি গ্রহণ করে।

ভিটামিন সি আমাদের শরীরের সুস্থ ক্রিয়াকলাপের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির একটি উৎস। শরীরে কোলাজেনের সঠিক গঠনের জন্য এটা দায়ী। পাশাপাশি, ভিটামিন সি হাড়ের গঠন, রক্তনালীর স্বাস্থ্য এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন-সি একটি জৈব অম্ল। যা শাকসবজি, ফল প্রভৃতিতে পাওয়া যায়। মানুষ-সহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। এ কারণেই ভিটামিন সি -র অভাবে অনেক রোগ হতে পারে, যা আরও অন্য জটিলতার কারণ হতে পারে।

যাদের শরীরে ভিটামিন সি-এর অভাব রয়েছে, তারা খুব সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। শরীরে শক্তি কমে যায়, অবসন্ন হয়ে পড়েন। শরীরে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি হলে বিরক্তিভাব দেখা দেয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। যাদের শরীরে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি হয়, তাদের হঠাৎ করে ওজন কমে যেতে পারে। ভিটামিন সি-এর অভাব হলে গিঁটে ব্যথা বা পেশিতে ব্যথার সমস্যা হয়। ভিটামিন সি-এর অভাব হলে দেহে কালশিটে দাগ পড়ে।

স্কার্ভি: স্কার্ভি হল ভিটামিন সি -র অভাবের সঙ্গে যুক্ত সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোগ। খাদ্যে ভিটামিন সি-র অভাব হলে দাঁতের মাড়িতে ক্ষত সৃষ্টি হয়, মাড়ি থেকে রক্তপাত হয়। এছাড়াও দুর্বলতা, ক্লান্তি, ফুসকুড়ি এবং আরও অনেক কিছু হয়। প্রাথমিক উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে ক্লান্তি, খিদে কম হওয়া, বিরক্তি এবং জয়েন্টে ব্যথাও হতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে রক্তাল্পতা, মাড়ির প্রদাহ, ত্বকের রক্তক্ষরণ ইত্যাদি হতে পারে।

হাইপারথাইরয়েডিজম: হাইপারথাইরয়েডিজম হল যখন থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরন করে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির সঙ্গে ভিটামিন সি থাইরয়েড ঠিক রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী ভিটামিন সি-র অভাবে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ হতে পারে, যা হাইপারথাইরয়েডিজমের দিকে নিয়ে যায়। যার ফলে ওজন কমে যায়, হৃদস্পন্দন বাড়ে, খিদে বাড়ে। এছাড়াও মহিলাদের রজঃস্রাবের সময় ও ধরনে পরিবর্তন-সহ আরও অনেক কিছু হতে পারে।

রক্তাল্পতা: খাদ্য় তালিকায় ভিটামিন সি অন্তর্ভুক্ত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য উপকারিতা ছাড়াও ভিটামিন সি আয়রন শোষণে সাহায্য করে, যা রক্তাল্পতার মতো রোগ প্রতিরোধের জন্য অত্যাবশ্যক। যা শরীরের লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা কমে যাওয়ার একটি ফল। এই রোগের উপসর্গগুলি হল ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি।

মাড়ি থেকে রক্তপাত: যখন আমাদের দাঁতের স্বাস্থ্যের কথা আসে, ভিটামিন সি সেক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শুধু দাঁতকেই মজবুত করে না, মাড়িকেও রক্ষা করে। অতএব, ভিটামিন সি-র অভাবে মাড়ি থেকে রক্ত পড়া এবং মাড়ির রোগ হতে পারে।

ত্বকের রোগ: ভিটামিন সি ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এটি কোলাজেন উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কোলাজেন একটি প্রোটিন, যা ত্বক, চুল, জয়েন্ট ইত্যাদির মতো সংযোজক টিস্যুতে প্রচুর পরিমাণে থাকে, যা স্বাস্থ্যকর ত্বকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে প্রচুর পরিমাণে সাইট্রাস ফল, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ শাকসবজি খেতে হবে ও ধূমপান এড়ানো উচিত। কারণ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ধূমপায়ীদের শরীরে ভিটামিন সি -র পরিমাণ কমে যায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সারা দিনে ৪০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি প্রয়োজন। তাছাড়া ঠান্ডা সমস্যা কাটাতেও ভিটামিন সি অনেকটা কার্যকর। এছাড়া শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ও ত্বকের সমস্যাও রোধ করে ভিটামিন সি। জেনে নিন যেসব খাবার থেকে সহজেই ভিটামিন সি পাওয়া যায়-

​কমলা লেবু: কমলা ভিটামিন সি এর অন্যতম সেরা উৎস। বলা হয় যে 100 গ্রাম কমলালেবুতে প্রায় 53.2 মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে। এটি কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে, কোলাজেন বাড়ায় এবং ত্বকের স্বর উন্নত করে। সবচেয়ে ভালো দিক হল এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

পেয়ারা: একটি মাঝারি আকারের পেয়ারায় ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যায়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, রোগ চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে, পেটের অসুখ প্রতিরোধে ও ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে ।

আমলকি: বহু উপকারিতার আলমকি থেকে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-সি পাওয়া যাবে একসাথে। চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ও কাশির সমস্যা দূর করতে আমলকি চমৎকার। ছোট ও কিছুটা তিতকুটে স্বাদের এই ফলটিকে প্রতিদিনের খাদ্যাভাসে রাখার অভ্যাস সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের জন্য উপকার বয়ে আনতে কাজ করবে। প্রতি ১০০ গ্রাম আমলকি থেকে পাওয়া যাবে ৪২.৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি।

বেদানা: মাঝারি আকারের একটি বেদানায় ভিটামিন সি থাকে ১০ মিলিগ্রাম। বেদানা এমনি বা জুস দুইভাবেই খেতে পারেন। ডায়রিয়া প্রতিরোধ ইমিউনিটি সিস্টেম মজবুত, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, হার্টে অক্সিজেন সরবরাহ ও রক্ত চলাচলে, অ্যাসিডিটি কমাতে কাজ করে।

আঙুর: আঙুরে ভিটামিন সি আছে ২৮ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম। শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিতে কাজ করে। কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা ও হৃদরোগ প্রতিরোধে কাজ করে। আঙুরের বীজ ও খোসায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি হৃৎপি- এবং রক্তনালিগুলোকে সচল রাখে। আঙুরের ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের সহায়ক ও ইনসুলিন বৃদ্ধি করে।

পেঁপে: এক কাপ পরিমাণ পেঁপে থেকে পাওয়া যাবে ৮৭ মিলিগ্রাম পরিমাণ ভিটামিন-সি, যা খুব সহজেই এই ফলটিকে ভিটামিন-সিয়ের অন্যতম দারুন একটি উৎস হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। শুধু পাকা পেঁপে নয়, কাঁচা পেঁপেও সমানভাবে ভিটামিন-সি’র জন্য পরিচিত। এতে উপকারি ভিটামিনের পাশাপাশি আরও রয়েছে ভিটামিন-এ, ফলেট, আশ, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।

আনারস: প্রচুর পরিমাণ অ্যানজাইম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিনের সমন্বয় পাওয়া যাবে আনারস থেকে। এতে বেশ ভালো পরিমাণ ভিটামিন-সি পাওয়া যায়, যা পাকস্থলীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ও খাদ্য সঠিকভাবে পরিপাক করতে কাজ করে। এছাড়া এতে উপস্থিত বিশেষ এনজাইম ব্রোমালাইন পিরিয়ডকালীন সমস্যা কমাতেও কার্যকর।

​ব্রোকলি: ১০০ গ্রাম ব্রকলিতে ৮৯.২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে। আধা কাপ বাষ্পযুক্ত ব্রকলি প্রতিদিনের ভিটামিন সি এর ৫৭% যোগান দেয়। এছাড়াও এতে রয়েছে ফাইবার, প্রোটিন এবং পটাসিয়ামের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান।

​ক্যাপসিকাম: ক্যাপসিকামের উপকারিতা অনেক। এতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। একটি ক্যাপসিকাম আপনার দৈনিক চাহিদার 169% প্রদান করে। সবুজ এই সবজিটি বিভিন্ন পুষ্টিগুণের ভান্ডার।

​স্ট্রবেরি: এই সুস্বাদু ফলটি ভিটামিন সি এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ, যা ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক এবং হৃদরোগের মতো গুরুতর স্বাস্থ্য অবস্থার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এক কাপ স্ট্রবেরিতে প্রায় ৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে। এছাড়াও এটি ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফরাসের একটি চমৎকার উৎস।

​টমেটো: টমেটোতে রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান, এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের টমেটো প্রায় 28% রেফারেন্স ডেইলি ইনটেক (RDI) প্রদান করতে পারে। এতে পটাসিয়াম, ভিটামিন বি এবং ই এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। আমরা প্রায়ই এটি একটি সবজি হিসাবে ব্যবহার করি, যদিও টমেটো এমন একটি ফল যা কাঁচাও খাওয়া যায়।

শাকসবজি: যে কোনও সবুজ শাকে থাকে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি। নিয়মিত শাক খেলে পাশাপাশি অনেকটা আয়রনও প্রবেশ করে শরীরে।

ডাল: প্রতি দিনের খাবারে ডাল অন্তর্ভুক্ত করেও ভিটামিন সি-র ঘাটতি মেটানো যায়। শুকনো ডালে ভিটামিন সি থাকে না, কিন্তু জলে ভেজানোর পর এগুলি থেকে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। তাই প্রতি দিনের খাবারে ডাল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ডাল শরীরে প্রচুর প্রোটিনও সরবরাহ করে।

-এএ