fbpx
           
       
           
       
পুত্রশোকে দৃষ্টি হারানো এক মায়ের গল্প!
আগস্ট ০৪, ২০২২ ১:২৪ অপরাহ্ণ

ইয়াহইয়া বিন আবু বকর: হারানোর বেদনা কত যে কঠিন! কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা কেবলমাত্র ভুক্তভোগিরাই বুঝে৷ বেদনা অনেক আছে৷ তবে সন্তান হারানোর বেদনার চেয়ে কঠিন কোনো বেদনা হয়তো পৃথিবীতে নেই৷

এই কয়েকদিন আগে আরবী সংবাদপত্র পড়তে গিয়ে একটা শিরোনামে উপর আমার দৃষ্টি আটকে যায়৷ শিরোনামটা পড়েই চমকে উঠি৷ কষ্টে বুকটা ভারি হয়ে ওঠে৷ হৃদয়তন্ত্রীতে বেজে ওঠে বেদনার করুণ সূর!

মনের অজান্তেই চোঁখদুটো ভিজে যায়৷ ঘটনাটা পড়ে হযরত ইয়াকুব আঃ_র পুত্রশোকে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঘটনাটা মনে পড়ে যায়৷ পবিত্র কুরআনে সূরা ইউসূফে যা বর্ণিত হয়েছে৷ কল্পনায় ঘটনাসম্বলিত সেই আয়াতগুলোর প্রতি দৃষ্টি বুলাতে থাকি৷

সিরিয়ান এই মায়ের দুটিই মাত্র ছেলে৷ এক ছেলের নাম রিয়াদ৷ কয়েকবছর হলো সে বিয়ে করেছে৷ আল্লাহ তাআলা তাকে চাঁদের মতো ফুটফুটে দুটি শিশু দান করেছেন৷ কে জানে এই নিশ্পাপ শিশু দুটি এত তাড়াতাড়ি পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে৷ ‘এতিম’ শব্দটা তাদের জন্য অবধারিত হয়ে যাবে! শিশুরা তো ফুলের মতো!

ফুলের মতো কচি তাদের মন৷ একটা পরিবারে ওরা ফুলের কলি হয়ে আসে৷ ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়৷ পরিবারে সৌরব ও আনন্দের দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়৷ ফুলের যেমন যত্নের প্রয়োজন, একটা শিশুরও সঠিকভাবে বেড়ে ওঠতে, কলি থেকে প্রস্ফুটিত রঙ্গিন পুস্প হতে তেমন পরিচর্যা, যত্ন ও আদরের প্রয়োজন৷ কিন্ত কে আজ ওদের যত্ন নেবে? ওদের বায়নাগুলি শোনবে! অভিমান ভাঙ্গাবে! আহ! ভাবতেই বেদনায় কলজেটা কুঁকড়ে ওঠে!

রিয়াদরা সিরিয়ার ইদলিব পল্লিতে বাস করতো৷ ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একসময় যুদ্ধের দাবানল প্রচণ্ড থেকে প্রচণ্ডতর হয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে ওরা পরিবার সহ হিজরত করতে বাধ্য হয়৷ সহায় সম্পতি ও ঘর বাড়ি ছেড়ে এসে ওরা আরো অসহায় হয়ে পড়ে৷

অভাব অনটন অক্টোপাশের মতো ওদেরকে পেয়ে বসে৷ দেশটির স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদ বাহিনী, ইরানের মদদপুষ্ট হিজবুল্লাহ সংগঠন ও রাশিয়ান সেনাদের পৈশাচিক তাণ্ডবে সবাই ভীতসন্ত্রস্ত!

জিবীকার জন্যও কেউ ঘর থেকে বের হতে পারেনা৷ একান্ত পেটের দায়ে কেউ বের হলেও পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়৷ কারণ তারা অনেকটাই নিশ্চিত যে, পথে যেকোনো সময় তারা শহীদ হয়ে যেতে পারে৷ তাই প্রাণটা হাতে তারা বের হয়৷

রিয়াদ ও অভাব অন্টনে জর্জরিত ভুখা পরিবারের মুখে দু লুকমা আহার তুলে দেয়ার জন্যই ঘর থেকে বের হয়েছিলো৷ বাচ্চাদুটিকে বুকের সাথে মিশিয়ে আদর করে, চোঁখে মুখে চুমু এঁকে দিয়ে অশ্রুঝরা চোঁখে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বের হয়েছিলো৷ বাজারে গিয়ে খাবার ক্রয় করে আসার পথে জালিম আসাদ বাহিনীর বিমান হামলার শিকার হয়৷ পরাপর কয়েকটা মিসাইল গলির দুপাশের বিল্ডিংয়ের উপর এসে পড়লে একটা বিল্ডিং রিয়াদের উপর ধ্বসে পড়ে৷

ধ্বংশাবশেষের নিচে চাপা পড়ে রিয়াদের প্রাণপাখিটা শহীদদের আত্মাদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়৷ মিসাইল হামলার বিকট শব্দে পুরো গ্রাম কেঁপে ওঠে৷ সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে আতংকের ছাপ, না জানি আজ কোন পরিবার জালিমের আক্রমনের শিকার হলো! কোন মায়ের কোল খালি হলো! আহ কোন মাছুম বাচ্চা আজ… অনেক মানুষই এ হামলায় শহীদ হয়৷

ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে কিছু লাশ বেশ করা সম্ভব হয়েছে৷ কিন্ত একটি লাশের অবস্থা খুবই করুণ! মাথাটা থেতলে গেছে৷ চেনা যাচ্ছেনা কে?

গ্রামের সবাই কে খবর দেয়া হয় যে, অমুক মসজিদের চত্তরে একজন শহীদের লাশ রয়েছে৷ চেহারা থেতলে যাওয়ার কারণে চেনা যাচ্ছেনা৷ কেউ তাকে চিনতে পারলে এনে দাফন করুন৷ অন্যথায় নিকতস্থ গোরস্থানে তাকে দাফন করা হবে৷ খবরটা শুনে অজানা এক আশংকায় রিয়াদের মার বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে৷ ছুটে যায় লাশটি দেখার জন্য৷ তার মতো অনেকেই লাশটি দেখার জন্য এসেছে৷ ভীড় ঠেলে রিয়াদের মা ভেতরে ঢুকে লাশটি দেখতেই চিৎকার দিয়ে লাশের উপর পড়ে যায়, লাশটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কাঁদতে থাকে৷

কাঁদতে কাদতে রিয়াদের মা! জ্ঞান হারিয়ে ফেলে৷ চোঁখে মুখে এবং মাথায় পানি দিলে হুশ ফিরে আসে৷ এরপর আবার কান্না শুরু করে “বাবা তুই চোঁখ খোল! তুই না আমাকে একদিন না দেখে থাকতে পারতিনা৷ এখন তুই আমাকে রেখে কেন চলে গেলি! চোঁখ কোল বাবা! ওঠ!

সেই কখন থেকে তোর অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছি! ফাতেমা ফাহাদ ও তোর জন্য কান্নাকাটি করছে৷ যলদি ওঠ বাবা!….ওরা ক্ষুধার জালায় কাঁদছে৷ রিয়াদের অসহায় বৃদ্ধা মায়ের কলজেফাঁটা আর্তনাদে বেদনায় আকাশ বাকাশ ভারী হয়ে যায়৷ সেদিন এমন কোনো লোক নেই কাঁদেনি৷ এমন কোনো চোঁখ নেই বেদনায় অশ্রু ঝরায়নি! উপস্থিত লোকজন সকলে সেদিন সেদিন ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কেঁদেছিলো!

মহিলারা তাকে শান্ত্বনা দেয়, প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্ত কেউ তাকে থামাতে পারছেনা৷ বুকভাঙ্গা কান্নায় আবার সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে৷ এবার কোনোভাবেই তার জ্ঞান ফেরানো যাচ্ছেনা৷ অবশেষে তাকে কাছেই এক ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়৷

এদিকে পরামর্শক্রমে লাশের কাফনের কাজ সমাধা করা হয়৷ স্থির হয় তাকে শহীদের কবরস্থানে দাফন করা হবে৷ রাত ৮টার সময় রিয়াদের মার হুশ ফিরে৷ আবার শুরু হয় কান্না৷

অনেক চেষ্টার পর কিছুটা শান্ত করে তাকে জানানো হয় যে, শহীদদের সাথে তার পুত্রকে দাফন করা হবে৷ তিনি অনুমতি দেন৷ তবে শেষবারের মতো তিনি শহীদ ছেলের মুখটা একটু দেখতে চান৷

মসজিদ চত্তরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়৷ লাশটাকে জড়িয়ে ধরে থেতলে যাওয়া মুখে বিদায়ী চুম্বন এঁকে দিয়ে দুহাত আকাশের দিকে তুলে বিড়বিড় করে কী যেন বলেন, কেউ শুনতে পায়নি সে কী বলেছে আকাশের রবের কাছে৷ শুধু দেখতে পেয়েছিলো তার দুচোঁখ থেকে অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে৷ অতঃপর সেই বৃষ্টি বুক বেয়ে রিয়াদের চেহারায় গড়িয়ে পড়ছে৷ রিয়াদের দাফন কার্য শেষ হয়৷ স্বজনরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়৷ বাড়িতে যেতেই রিয়াদের জীবনসঙ্গিনী ছুটে আসে৷ কৌতুহল ও শংকা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ” আম্মা!

ফিরতে এত দেরী হলো কেন? শুনেছি অমুক পল্লিতে আক্রমণ হয়েছে, অনেকে শহীদ হয়েছে৷ আপনার ছেলে কোথায় আম্মা! আপনার ছেলে ভালো আছেতো? এখনো সে কোথায়? কত রাত হয়ে গেল এখনো আসছেনা কেন?
রিয়াদের মা কী বলবে ভেবে পায়না৷ কান্না ও অশ্রু ধরে রাখতে না পেরে পুত্রবধুকে জড়িয়ে ধরে চাপা কান্না শুরু করে৷ সে প্রশ্ন করে, আম্মা কাদছেন কেন? কী হয়েছে?

রিয়াদের মা কথা বলতে পারেনা৷ শুধু “আমার কলিজার টুকরা রিয়াদ…” এতটুকুই বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে৷ এদিকে কান্নাকাটি শুনে রিয়াদের মাছুম বাচ্চাদুটির ঘুম ভেঙ্গে যায়৷ বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে সুজিয়ে ওদেরকে এতক্ষন ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিলো৷ এখন জেগে গিয়ে দৌড়ে ছুটে এসে ওরা প্রশ্ন করতে থাকে “আম্মু আম্মু!

কী হয়েছে? কাঁদছো কেন? দাদু তুমিও দেখি কান্না করছো! কী হয়েছে দাদু বলোনা! অবুঝ এই বাচ্চাদুটি যেন না বুঝতে পারে এজন্য রিয়াদের মা কোনোরকম কান্না থামিয়ে চোঁখ মুছে ওদরকে দুজনকে আদর করে কোলে তুলে নিয়ে চোঁখমুখে চুমু এঁকে দিয়ে বলে, কই কিছুই হয়নি দাদুমণি৷ বাচ্চাদুটি আবার প্রশ্ন করে ” দাদু! আব্বু কোথায়? আব্বু কি আসছে? আমাদের জন্য খাবার, খেলনা এনেছে? হ্যাঁ দাদুভাই, তোমার আব্বু একটা কাজে দূরে গেছে৷ কিছুদিন পর সেখান থেকে আসার সময় সময় তোমাদের জন্য অনেককিছু নিয়ে আসবে৷

আল্লাহর লীলা বুঝা বড়ো কঠিন৷ অসহায় বৃদ্ধা এই মায়ের পুত্রশোকে আহত হৃদয়ের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আবার তার কলজেটা ক্ষতবিক্ষত করে দেয় জালিমরা!

তার কলিজার টুকরা সন্তান ফাহাদকে পাষণ্ড জালিম বাশার আল আসাদের এক প্লাটুন সৈন্য এসে গ্রেপতার করে নিয়ে যায়৷ রিয়াদের পর ফাহাদই ছিল তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন৷ জালিমরা আজ তাও কেড়ে নিল৷ পুত্রশোকে কাঁদতে কাঁদতে রিয়াদ ও ফাহাদের মা দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছে৷ ডায়াবেটিস এবং হাইপ্রেসার সহ বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যধী তার শরীরে বাসা বেঁধেছে৷ জীবনের ঘানী টানতে তিনি অক্ষম প্রায়৷

এখন তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন৷ পরিবারটির অসহায়ত্বের কথা ভাবলে, পীড়িত দৃষ্টি হারানো এই মা, এবং শোক ও দুঃখে শুকিয়ে কংকালসার রিয়াদের জীবনসঙ্গিনী ও তার ফুটফুটে নিশপাপ বাচ্চাদুটোর দিকে তাকালে কেউ চোঁখের পানি ধরে রাখতে পারবেনা৷ আহ! জুলুমের এক নিমিশের ঝড়ে সুন্দর সাজানো গোছানো একটি বাগানকে কিভাবে তছনছ ও বিরান করে দিল….৷

-কেএল

সর্বশেষ সব সংবাদ