fbpx
           
       
           
       
`জ্ঞান সাধকদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী’
জুন ২১, ২০২২ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ

মুফতি এনায়েতুল্লাহ।।

আমি একজন আশাবাদী মানুষ। খুব সহজে নিরাশ হই না। যদিও চারপাশে ঘটে যাওয়া খবরে মন খারাপ হয়, কষ্ট পাই। এমন সব ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়েই আমাদের বসবাস। এর মাঝে সাম্প্রতিক সময়ের দু’টি খবরে আমি বেশ আনন্দিত হয়েছি। এর একটি হলো, চট্টগ্রামের আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিসের সনদধারীদের সৌদি আরবের কিং সাউদ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ সংক্রান্ত শিক্ষাচুক্তি (মুয়াদালা) পুনঃ সম্পাদিত হয়েছে। প্রথম এ চুক্তিটি ২০০১ সালে সম্পাদিত হয়। এ চুক্তির আওতায় পটিয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস শেষ করে বেশ কয়েকজন ছাত্র কিং সাউদ ইউনিভার্সিটিতে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশের হাতেগোনা কয়েকটি কওমি মাদরাসা এ সাফল্য অর্জন করেছে। পটিয়া সেই সাফল্যের অংশীদার। অন্যটি হলো, পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী মাদরাসার সহকারী পরিচালক নিয়োগ করেছেন তরুণ আলেম মাওলানা ওবায়দুল্লাহ হামযাকে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ হামযার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তার পরও এ খবরে আমি আনন্দবোধ করেছি, মনে আশার সঞ্চার ঘটেছে।

কাছের বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছি, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ হামযা একজন জ্ঞানসাধক। বহুমাত্রিক মেধা ও মননের অধিকারী মাওলানা হামযা একাধারে মুহাদ্দিস, ওয়ায়েজ, গ্রন্থকার ও খতিব। বাংলা, আরবি, ইংরেজি, উর্দূ ও ফার্সি ভাষায় তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। তার আরও অনেক সাফল্য রয়েছে। স্বজনতোষণ ও আত্মীয়করণের এমন পাষাণ সময়ে শুধুমাত্র যোগ্যতাবলে পটিয়ায় মাওলানা হামযার সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ অবশ্যই বিশাল ঘটনা। এ নিয়োগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এখনও যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়। আর এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বংশানুক্রমে পরিচালনা কিংবা শাসনের রীতি-রেওয়াজের দাসত্ব সবাই করেন না। এ বিষয়ে আলোচনা অন্য আরেক সময়। আজকের আলোচনা পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক, জ্ঞানসাধকদের পৃষ্ঠপোষক, হাকিমুল মিল্লাত আল্লামা শাহ্ মুফতি আবদুল হালিম বোখারীকে নিয়ে।

জাতির অন্যতম রাহবার আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী আমার কাছে এক বিস্ময়ের নাম। তিনি অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত মেধা লালন করেছেন, গড়েছেন আপন হাতে পরম মমতায়। যারা বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। পটিয়া মাদরাসা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কওমি মাদরাসা হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৩৮ সালে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন মুফতি আজিজুল হক (রহ.)। বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষার প্রচার-প্রসারে পটিয়ার অবদান অপরিসীম। কওমি শিক্ষা-সংস্কার, মান উন্নয়ন এবং মাদরাসাগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে পটিয়ার সাবেক মহাপরিচালক আলহাজ মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস (হাজী সাহেব হুজুর, ১৯০৬-১৯৯২) রহমাতুল্লাহি আলাইহির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশের দুই বৃহৎ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক ও ইত্তেহাদ প্রতিষ্ঠায় তার ব্যাপক অবদান ও ত্যাগ রয়েছে। তিনি বেফাকের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ১৯৭৮ সালে বেফাক প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বেফাকের সভাপতি ছিলেন হাজী সাহেব হুজুর। এর পর পটিয়া মাদরাসারই মহাপরিচালক মাওলানা মুহাম্মদ হারুন ইসলামাবাদী (১৯৯২-৯৬) বেফাকের সভাপতি হন। ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতা হলো- সেই পটিয়া মাদরাসা এখন বেফাকে নেই। এটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

বলছিলাম, আল্লামা আবদুল হালিম বোখারীর কথা। কওমি মাদরাসার সনদের সরকারি স্বীকৃতি বিষয়ক সুপারিশ, সিলেবাস ও প্রস্তাবনা তৈরির কাজে তার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ ঘটে। অসাধারণ প্রজ্ঞার অধিকারী এই মহিরুহের সঙ্গে একাধিকবার একান্তে বৈঠকেও মিলিত হয়েছি। তার জ্ঞানের গভীরতা মাপার কোনো যোগ্যতা আমার নেই। তবে, এতটুকু বলতে পারি, তিনি একজন অসাধারণ মানুষ। আলাপচারিতায় যেমন তার রসবোধে উপকৃত হয়েছি, তেমনি বিস্মিত হয়েছি তার উপস্থিত বুদ্ধির মাত্রা দেখে।আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী একজন দূরদর্শী চিন্তার মানুষ। কঠোরভাবে আইন-কানুন মেনে চলেন, কিছুটা রাশভারী স্বভাবের। আমানতদার হিসেবে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। বার্ধক্যজনিত নানা ব্যাধির জটিলতায় তার শরীর নুয়ে পড়েছে এখন। চোখ ও কিডনি বিশেষভাবে আক্রান্ত। তবুও পঠন পাঠন ও জ্ঞানগবেষণায় বিরতি নেই তার। কিন্তু রাজনীতি ও রাজধানী থেকে দূরে থাকায়, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। লেখালেখি ও গবেষণার পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতায় তিনি যেমন ঋদ্ধ, তেমনি মানুষকে সম্মোহন করার অপরিসীম ক্ষমতা রয়েছে তার। সবচেয়ে বড় কথা, তার ইলমি খেদমতে জাতি ও উম্মাহ বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে ও হচ্ছে।

ইলমি জগতের এ কিংবদন্তি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার অন্তর্গত রাজঘাটা গ্রামে ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম আল্লামা আবদুল গণী বোখারী রহ.। আল্লামা আবদুল হালিম বোখারীর ছোট ভাই মাওলানা আবদুর রহীম বোখারীও (রহ.) ছিলেন নামকরা মুহাদ্দিস ও আলেম। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল তিনি ইন্তেকাল করেন। গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী লোহাগাড়া থানার অন্তর্গত রাজঘাটা হোসাইনিয়া আজিজুল উলুম মাদরাসায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে পটিয়ায় জামাতে দুয়ামে (আলিয়া ২য় বর্ষ) ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯৬৪ সালে অত্যন্ত সুনাম ও কৃতিত্বের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস পাশ করে ‘মাওলানা’ সনদ লাভ করেন।

জ্ঞানতাপস এই মহাপুরুষ শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে এতটুকুতে ক্ষান্ত হননি। জ্ঞানের সকল শাখায় বিচরণের স্বপ্ন নিয়ে অদম্য সাহসিকতা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি আরও কয়েক বছর পড়াশোনা করেন। এ এক বিরল ঘটনাও বটে। পড়াশোনার এই পর্বে তিনি ১৯৬৫ সালে পটিয়ার ‘বাংলা সাহিত্য ও গবেষণা বিভাগে’ ভর্তি হন। অতঃপর ১৯৭১ সালে সাতকানিয়া আলিয়া মাহমুদুল উলুম থেকে আলিম ও ১৯৭৩ সালে ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। টাঙ্গাইল আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পাশ করেন প্রথম বিভাগে। ১৯৬৯ সনে টাঙ্গাইল কাগমারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭৫ সালে বিএ পাশ করেন। এ ছাড়া তিনি লাহোর ডন হোমিওপ্যাথিক কলেজে বায়োক্যামিকের ওপর ২ বছর মেয়াদি কোর্স করে ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

খ্যাতিমান এই ইসলামি চিন্তাবিদ সহপাঠী ও শিক্ষকসহ সবার সঙ্গে অমায়িক আচরণের মাধ্যমে মন জয় করেন। নম্র ব্যবহার, বড়দের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ, উস্তাদদের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি চারিত্রিক সৌর্ন্দয্য ও উন্নত গুণাবলীর কারণে ছাত্রজীবন থেকেই সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্ব লাভ করেন। বিজ্ঞ এ হাদিস বিশারদ কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। প্রথমে তিনি ১৯৬৭-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইল দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসায় আরবি প্রভাষক হিসেবে খেদমত করেন। তারপর ১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত সাতকানিয়া মাহমুদুল উলুম আলিয়া মাদরাসায়, অতঃপর ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত পুনরায় টাঙ্গাইল দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসায় মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮২ সালে স্বীয় উস্তাদদের আহবানে সাড়া দিয়ে চলে আসেন পটিয়ায়। এখানে তিনি দীর্ঘ ২০ বছর তিরমিজি শরীফের দরস প্রদান করেন। পটিয়ায় নিয়োগের পর তিন বছর শিক্ষা সচিব, পাঁচ বছর সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৮ সালে ১০ অক্টোবর মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পটিয়া মাদরাসার শায়খুল হাদিসও। মাদরাসার শিক্ষা পাঠ্যক্রম ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এখনও তিনি দক্ষ নাবিকের মতো হাল ধরে আছেন পটিয়ার। পটিয়া মাদরাসার গৌরবোজ্জ্বল অতীত সংরক্ষণের পাশাপাশি বর্তমানকে সমৃদ্ধ ও ভবিষ্যতকে বর্ণিল করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার নিষ্ঠাপূর্ণ সুষ্ঠু পরিচালনায় জামিয়া পটিয়া এখনও বহুমূখী উন্নয়ন-উন্নতির ধারা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে তিনি পটিয়া মাদরাসার সুষ্ঠু পরিচালনার পাশাপাশি আরও বহু মাদরাসার পরিচালনা ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নশীল ও সংস্কারধর্মী সংগঠন পরিচালনা করে জাতির খেদমত করে যাচ্ছেন।

সবচেয়ে বড় কথা, ব্যতিক্রমী ও সৃজনশীল পাঠদান পদ্ধতি, মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনা, দুর্বোধ্য বিষয়কে সহজভাবে ও সংক্ষেপে বুঝানোর বিস্ময়কর দক্ষতা, সকল শ্রেণির ছাত্রদের বোধগম্য ও উপকারী তাকরির ইত্যাদি অনন্য বৈশিষ্টাবলীর কারণে ছাত্রদের হৃদয়-মনে ভালোবাসার স্থান অধিকার করে আছেন। এ ভালোবাসা অমর ও অক্ষয়। আগেই বলেছি, অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হলেন- আল্লামা বোখারী। আল্লাহ তায়ালা তাকে হক-বাতিল নির্ণয় করার বিস্ময়কর দক্ষতা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে দিয়েছেন অদম্য সাহস ও অবিচলতা। যে কারণে আমরা দেখতে পাই, গড্ডালিকা প্রবাহে তিনি গা ভাসিয়ে চলেন না। সময়ে সময়ে সৃষ্ট ইসলামবিরোধী নানা অপতৎপরতা ও বাতিল ফেরকাসমূহের বিরুদ্ধে নির্ভীকচিত্তে প্রতিবাদ করছেন। বিরোধীদের সমালোচনা ও তিরস্কারের কোনো ধরনের তোয়াক্কা করেন না তিনি।

আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী রহ. পটিয়ায় মাদরাসা পরিচালনা, হাদিসের দরস প্রদানসহ আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পটিয়ার মুখপাত্র মাসিক আত তাওহীদের সম্পাদক ও পরে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে মাসিক আত তাওহীদের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন- ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনিও একজন বড়মাপের আলেম। ওয়ায়েজ হিসেবে সারাদেশে তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান ড. খালিদ চট্টগ্রাম ওমর গণি এমইএস ডিগ্রি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। বছর খানেক আগে তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন। এখন জিরি মাদরাসায় হাদিসের দরস দেন।

দক্ষ সংগঠক হিসেবে আল্লামা আবদুল হালিম বোখারীর ব্যাপক সুনাম রয়েছে। তিনি ১৯৮৩ সাল থেকে (বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড) আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৫৯ সালে বোর্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লামা বোখারীর আন্তরিক প্রচেষ্টা ও দক্ষ পরিচালনার কারণে বোর্ডটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে কওমি মাদরাসা শিক্ষাকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের প্রাচীন কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ইত্তেহাদের সভাপতি হলেন দেশ বরেণ্য শিক্ষবিদ চট্টগ্রাম জামেয়া দারুল মাআরিফ আল ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আল্লামা সুলতান যওক নদভী।

পটিয়া মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক সংস্থা বাংলাদেশ তাহফিজুল কোরআন সংস্থার বর্তমান সভাপতি আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী। সল্পসময়ে পবিত্র কোরআন হিফজ করার জন্য শিশু-কিশোরদের উৎসাহিত করার মাধ্যমে তাজবিদ তথা বিশুদ্ধ পাঠভিত্তিক হিফজ শিক্ষার সম্প্রসারণ ও পবিত্র কোরআনের সংরক্ষণের লক্ষে ১৯৭৬ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সারাদেশে ব্যাপকভাবে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিতে ইসলামি সম্মেলন আয়োজন করার লক্ষে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বাংলাদেশ।’ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০১৫ পর্যন্ত তিনি এই সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৬ সালে ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমানের মৃত্যুবরণের পর তিনি সভাপতির দায়িত্ব পান।

ইসলামি অর্থব্যবস্থা বর্তমান সময়ের অন্যতম চাহিদা ও দাবি। আধুনিক অর্থব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুধাবন করে ইসলামি অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে তার সমাধান পেশ করা একজন বিজ্ঞ মুফতির অন্যতম দায়িত্ব। এই গুরুদায়িত্বও তিনি পালন করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের শরিয়াহ সুপারভাইজারী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নির্দেশনায়, পটিয়া মাদরাসার প্রধান মুফতি হিসেবে মুফতি শাসসুদ্দীন জিয়াও এক্ষেত্রে বিশাল অবদান রাখছেন। শুধু শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও ধর্মীয় আলোচক হিসেবে নয়, আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবেও তিনি সফল। আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী রহ. কুতবে জামান আল্লামা মুফতি আজিজুল হক রহমাতুল্লাহি আলাইহির বিশিষ্ট খলিফা জামিয়া ইসলামিয়া দারুস সুন্নাহ হ্নীলার সাবেক শায়খুল হাদিস আল্লামা ইসহাক (ছদর সাহেব হুজুর নামে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সমধিক পরিচি) রহমাতুল্লাহি আলাইহির হাতে বায়াত হন এবং খেলাফত লাভ করেন। আল্লামা আবদুল হালিম বোখারীর অসংখ্য ভক্ত ও মুরিদ রয়েছে। তাদের কয়েকজনকে তিনি খেলাফতও দিয়েছেন।

লেখক হিসেবে তিনি অবদান রেখেছেন। তার লিখিত গ্রন্থাবলীর অন্যতম হলো- তাসহিলুত তাহাভি, তাসহিলুল উসূল (পাঠ্যভূক্ত)ও তাসহিলুত তিরমিজি। চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েও তার বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোয়ামে অংশগ্রহণসহ নানা কাজে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রাম কিংবা জাতীয় ইস্যুতে তার সরব উপস্থিতি দেখা যায়। কওমি মাদরাসার সনদের সরকারি স্বীকৃতি আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের স্বীকৃত প্রদানের নিমিত্তে আল হাইআতুল উলয়া গঠিত হলে তিনি এর স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন। চার ছেলে ও তিন মেয়ের বাবা আল্লামা বোখারী। চার ছেলে ও মেয়ের জামাইদের সবাই আলেম। নিজ কর্মক্ষেত্রে তারা সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।

বলা হয়, জ্ঞানীর কদর একমাত্র জ্ঞানীরাই জ্ঞানের কদর করেন। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী রহ.। এ কারণে আমরা দেখি, পটিয়া মাদরাসার বহুমুখী কর্মকাণ্ডে জ্ঞানসাধকদের ভিড়। বিশেষ করে আজকের লেখায় মুফতি শাসসুদ্দীন জিয়া, ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ও মাওলানা ওবায়দুল্লাহ হামযার প্রসঙ্গ এসেছে। এ ছাড়া জামিয়ার শিক্ষা কার্যক্রমে জড়িয়ে আছেন বিজ্ঞ ও যোগ্য উস্তাদগণ। পটিয়াকে ঘিরে জ্ঞানীদের এই মিলনমেলা সাজানোর কারিগর আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী রহ.।যাদের জ্ঞানের সমারোহে এই প্রজন্ম ও উম্মাহ লাভবান হচ্ছেন। তাদের জ্ঞানের দীপ্তিতে আলোকিত হচ্ছে এই সমাজ ও দেশ। এটাই আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী রহ.-এর ব্যতিক্রমী কর্মপন্থা ও মুন্সিয়ানা। যুগচাহিদার প্রেক্ষিতে নেওয়া তার সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণ করে, জ্ঞানীদের প্রতি সম্মান ও উৎসাহ দিতে তিনি কুণ্ঠিত নন।

লেখার শুরুতে বলেছিলাম তার একান্ত সান্নিধ্য প্রসঙ্গ নিয়ে। তখন দেখেছি, মতের মিল না হলে ভিন্নমত পোষণকারীর প্রতি তার শ্রদ্ধায় কমতি নেই। সবার সঙ্গে, সব বিষয়ে মতের মিল হতে হবে এটা প্রত্যাশিতও নয়। আল্লামা বোখারী রহ.কে দেখেছি, ভিন্নমতের মতের হলেও জ্ঞানী-গুণীকে সমাদর করতে কসুর করেন না। এটা তার অনন্য গুণ। এখনকার যুগের এমন গুণের মানুষ পাওয়া বিরল। তিনি একজন সাহসী কর্মবীর। সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও গভীর জ্ঞানের কারণে তিনি পরিণত হয়েছেন আলেমদের অভিভাবকে। আল্লামা আবদুল হালিম বোখারী রহ. এই গুণ ও জ্ঞানসাধনার আলো আরও ছড়াক এবং তার ছায়া আমাদের ওপর আরও দীর্ঘ হোক। আমিন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

এনটি