শিরোনাম :
অন্যের ভুল সংশোধনে ইসলামের আদর্শ!
অক্টোবর ২১, ২০২১ ৪:৪০ অপরাহ্ণ

মুহাম্মাদ আবু আখতার।।

মানুষ মাত্রই ভুল করে৷ জীবনে কখনো ভুল করে নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন৷ মানুষের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অনেক কাজে প্রায়ই ভুল হয়ে থাকে৷ মানুষ সাধারণত নিজের ভুল সম্পর্কে খুব কমই খেয়াল রাখে৷ অন্য মানুষের চোখেই তার ভুলগুলো সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে৷ এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক মুমিনকে আরেক মুমিনের আয়না বলে ঘোষণা করেছেন৷ তাই কোন মুমিন ভাইয়ের ভুল আরেক ভাইয়ের দৃষ্টিতে ধরা পড়লে তা সংশোধনের চেষ্টা করা প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব৷

এ ক্ষেত্রে চুপ থাকা দোষণীয়৷ তবে অন্যের ভুল সংশোধনের ব্যাপারটি যেহেতু খুবই স্পর্শকাতর বিষয় তাই এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত৷ তা না হলে হীতে বিপরীত হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ক্ষেত্রে আমাদের কি করণীয় এবং কারো ভুল সংশোধনের উপায় কি এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করা আমাদের জন্য আবশ্যক৷

আমরা সাধারণত অন্যের কোন ভুল দেখলে তাকে সামনাসামনি কটাক্ষ করে কথা বলি অথবা তার অনুপস্থিতিতে অন্যের কাছে সমালোচনা করি৷ অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এর কোনটিই উচিত নয়৷ এভাবে কারো ভুল সংশোধনের চেষ্টা ইসলামসম্মত নয় এবং তা কোন সুফল বয়ে আনে না৷ এ দুই উপায়ে মানুষের সংশোধনের সম্ভাবনা খুব কম৷ বরং এ ক্ষেত্রে মানুষের পারস্পরিক মনোমালিন্য ও শত্রুতা সৃষ্টির সম্ভাবনাই বেশি৷

তাই এ দু পদ্ধতিই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ৷ উভয়টার জন্যই পবিত্র কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে৷ আল্লাহ তায়ালা এ দুই শ্রেণীর লোকদের ব্যাপারে বলেন, “ধ্বংস হোক ঐসব লোক যারা মানুষকে কটাক্ষ করে কথা বলে এবং ঐসব লোক যারা মানুষের অনুপস্থিতিতে তার নিন্দা করে৷” (সূরা হুমাযাহঃ ১)

আমাদের সমাজে বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষ রয়েছে। সবার মন-মানসিকতা সমান নয়। প্রত্যকের অবস্থা বিবেচনা করে তার ভুল সংশোধনের জন্য চেষ্টা করা দরকার।

কিছু মানুষকে ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করা হলে তারা তা বুঝতে পেরে অকপটে স্বীকার করে তাদের ভুল সংশোধন করে নেয়৷ এ ধরণের লোকদের কোন ভুল হয়ে গেলে তাদেরকে একাকী গোপনে নম্র ভাষায় সে ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করা উচিত৷ তা না করে সকলের সামনে তিরস্কার করে তাদেরকে লজ্জা দেয়া অথবা অন্যের কাছে তাদের দোষ প্রকাশ করা খুব অন্যায়৷

এটা তাদের ইজ্জতের উপর আঘাত হানার সমতুল্য গোনাহ৷ আর কোন মুসলমানের ইজ্জতে আঘাত হানা হাদিসের ভাষ্যমতে সুদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গোনাহ৷ সুদের সর্বনিম্ন পর্যায়ের গোনাহ হচ্ছে নিজ মায়ের সাথে জেনায় লিপ্ত হওযার সমতুল্য৷ এ থেকে কোন মুসলমানের ইজ্জতের উপর আঘাত হানার গোনাহ যে কত জঘন্য তা সহজেই অনুমেয়৷

আবার কিছু মানুষ আছে যাদেরকে ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করা হলেও তাদের ভুল স্বীকার করে না৷ বরং ভুলের পক্ষে খোড়া যুক্তি দেয়৷ এ ধরণের লোকদের সামনে হিকমাতের সাথে অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করে তাদের যুক্তি খন্ডন করে তাদেরকে লাজওয়াব করার চেষ্টা করা যেতে পারে৷

এতে তারা যদি তাদের ভুল বুঝতে পেরে সংশোধিত হয় তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ৷ যদি সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা তাদের না থাকে তাহলে তাদের সাথে অযথা তর্কে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়৷ তবে তাদের ভুলের দ্বারা যদি অন্য কারো বিভ্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে তাহলে তাদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে সকলকে সতর্ক করা উচিত৷ তবে এক্ষেত্রেও সীমালঙঘন করা ঠিক নয়৷ শুধুমাত্র তাদের ভুলের ব্যাপারে উপযুক্ত দলীলপ্রমাণ পেশ করে সকলের সামনে সঠিক তথ্য প্রকাশ করাই কাম্য৷ অযথা তাদেরকে গালিগালাজ করা, তাদের বিরুদ্ধে কটুক্তি করা এবং তাদের সাথে অনর্থক ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হওয়া বাড়াবাড়ি ও নিন্দনীয় ব্যাপার৷

আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ) এবং হারুন (আ) কে যখন ফেরাউনের কাছে পাঠান তখন তাদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বল, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে।” (সুরা ত্বহাঃ ৪৪)

যে ফেরাউন নিজেকে খোদা বলে দাবি করেছিল তার সাথে নম্র কথা বলার জন্য আল্লাহ তায়ালা দু’জন মহাসম্মানিত পয়গম্বরকে নির্দেশ দিয়েছেন৷ এ থেকে আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে৷ আমরা অনেকে কোন মুসলমান ভাইয়ের সামান্য ভুল-ত্রুটি পেলেই অকথ্য ভাষায় তাকে বকাঝকা ও গালিগালাজ করি৷ অথচ একজন সর্বনিকৃষ্ট পর্যায়ের মুসলমানও ফেরাউনের চেয়ে অনেক গুণে উত্তম৷ কেননা ফেরাউন আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হয় নি৷ বরং নিজেকেও খোদা বলে দাবি করেছিল৷

এ বিশ্বে সম্ভবতঃ আর কোন কাফের এতো প্রকাশ্যভাবে নিজেকে খোদা দাবি করার দৃষ্টতা দেখানোর সাহস পায় নি৷ আর আমাদের কেউ সারাজীবন সাধনা করলেও মুসা আ. এবং হারুন আ. এর সমমর্যাদা তো অনেক দূরের কথা তাদের পায়ের ধুলিকণার সমতুল্য হওয়াও সম্ভব নয়৷ একজন চরম নিকৃষ্ট কাফেরকে দাওয়াতের জন্য তার সাথে দু’জন শ্রেষ্ঠ মহামানবকে যদি নম্র ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয় তাহলে একজন মুসলমানের সংশোধনে আরেক মুসলমানের ভাষা কত বেশি নম্র হওয়া উচিত তা আমাদের চিন্তার বিষয়৷

অধীনস্থ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো ভুল হলে তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করার পর সংশোধন হলে তো আলহামদুলিল্লাহ ভালো৷ আর সংশোধন না হলে এ জন্য তার উপর জোর-জবরদস্তি করা কিংবা শাসন করার কোন অধিকার কারো নেই৷ তবে এ ব্যাপারে তাদের অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে৷ আর অধীনস্থদের কেউ ভুল করলে শাসনের অধিকার তার অভিভাবকদের রয়েছে৷ যেমন মনিব তার গোলামের, পিতা তার সন্তানের, স্বামী তার স্ত্রীর এবং শিক্ষক তার ছাত্রের ভুল সংশোধনের জন্য শরীয়তের নির্দিষ্ট সীমার ভিতরে শাসন করার অধিকার রাখে৷ কেননা প্রত্যেক ব্যক্তি তার অধীনস্থদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল৷

অধীনস্থদের কেউ ভুল পথে পরিচালিত হলে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করা তার একান্ত কর্তব্য৷ এ দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দিষ্ট সীমার ভিতরে তাকে প্রয়োজনে শাসন করার অধিকার দেয়া হয়েছে৷ এ জন্য নম্রভাষায় বুঝানোর পরও অধীনস্থদের কেউ তার ভুল সংশোধন না করলে প্রয়োজনে শাসন করে হলেও সে ভুল সংশোধনে বাধ্য করতে পারে৷ অভিভাবকরা এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে আল্লাহর দরবারে তাদেরকে জবাবদিহী করতে হবে৷

কাউকে কোন ভুল করতে বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে দেখলে সাধ্যমত তাকে সে কাজ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করা উচিত৷ তবে অন্যায় কাজে বাঁধা দিতে গিয়ে অহংকারবশতঃ কাউকে হেয় করে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করা কাম্য নয়৷ সাধ্যমত অন্যায়ের প্রতিবাদ করা অবশ্যই আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন হয় এমন কিছু করা উচিত নয়। তা না হলে এটা তার জাহান্নামে প্রবেশের কারণও হতে পারে৷ পক্ষান্তরে আল্লাহ তায়ালা অন্যায়কারীকে যেকোন অসিলায় মাফ করে দিতে পারেন৷ তাই কারো অন্যায় দেখলে সাধ্য অনুযায়ী প্রতিবাদ করা যেতে পারে কিন্তু তাকে হেয় করে কথা বলে সীমালঙ্ঘন করা কখনোই উচিত নয়৷ এ ব্যাপারে হজরত আবু হুরাইরাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসে শিক্ষণীয় একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে৷ তিনি বলেন, বনী ইসরাইলের মধ্যে দু’ব্যক্তি ছিল।

তাদের একজন পাপ কাজ করতো এবং অন্যজন সর্বদা ইবাদতে লিপ্ত থাকতো। যখনই ইবাদতে রত ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে দেখতো তখনই তাকে খারাপ কাজ পরিহার করতে বলতো। একদিন সে তাকে পাপ কাজে লিপ্ত দেখে বললো, তুমি এমন কাজ হতে বিরত থাকো। সে বললো, আমাকে আমার রবের উপর ছেড়ে দাও। তোমাকে কি আমার উপর পাহারাদার করে পাঠানো হয়েছে? সে বললো, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না অথবা তোমাকে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।

তঃপর দু’জনকেই মৃত্যু দিয়ে আল্লাহর নিকট উপস্থিত করা হলে তিনি ইবাদতগুজারী ব্যক্তিকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি আমার সম্পর্কে জানতে? অথবা তুমি কি আমার হাতে যা আছে তার উপর ক্ষমতাবান ছিলে? আর পাপীকে বললেন, তুমি চলে যাও এবং আমার রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করো। আর অপর ব্যক্তির ব্যাপারে তিনি বললেন, তোমরা একে জাহান্নামে নিয়ে যাও। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, সেই মহান সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন! সে এমন উক্তি করেছে যার ফলে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে গেছে। (সুনানে আবু দাউদঃ ৪৯০১)

সারকথা হলো কারো কথায় বা কাজে কোন ভুল হলে অত্যন্ত নম্র ভাষায় ভালোবাসা ও হিকমাতের সাথে তার সে ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করা উচিত৷ এ ক্ষেত্রে চুপ থাকা ঠিক নয়৷ আমাদের নিজেদের ভুল হলে তা সংশোধনের জন্য অন্যের কাছে যেমন ব্যবহার আশা করি অন্যের ভুল সংশোধনে আমাদের ঠিক এমন ব্যবহার করা দরকার৷ কারো ভুলের কারণে তাকে হেয় করে কথা বলা কিংবা তার ভুলত্রুটি অন্যের কাছে প্রকাশ করে তার ইজ্জতের হানি করা কখনোই উচিত নয়৷

তবে কারো ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করার পরও যদি সে ভুল সংশোধনে আগ্রহী না হয় এবং তার কথা ও কাজের দ্বারা অন্যান্য মানুষ বিভ্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে তাহলে তার ভুলের ব্যাপারে অন্যদেরও সতর্ক করতে কোন দোষ নেই৷ কারো অধীনস্থ ব্যক্তি কোন ভুল করলে তার সংশোধনের জন্য প্রয়োজনে শাসন করার অধিকার রয়েছে৷ অধীনস্থ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ ভুল করলে এজন্য শাসন করার অধিকার নেই৷ আর কেউ যত বড় পাপীই হউক না কেন তাকে হেয় করে অনুচিত কথা বলা ঠিক নয়৷

আর কারো ভুলের জন্য তাকে গালিগালাজ করা, ঝগড়া-বিবাদ করা, অনর্থক তর্ক-বিতর্ক করা, ঘৃণা বিদ্বেষ প্রকাশ করা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা উচিত৷ কারণ এমনও হতে পারে এসব কারণে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পাঁকড়াও করতে পারেন৷ আর পাপী ব্যক্তির কোন নেক আমলের বদৌলতে আল্লাহ তায়ালা তার পাপ ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন৷ তাই অন্যের ভুল সংশোধনের ব্যাপারে আমাদের নম্রতা অবলম্বণ করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে দীনের সহীহ বুঝ দান করুন৷

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ