স্মৃতির পাতায় আল্লামা আহমদ শফী রাহ.: মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১ ৯:১৬ অপরাহ্ণ

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক: মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী বহুগুণে গুণান্বিত এক ব্যক্তিত্ব। ছাত্রদের কাছে তিনি একজন প্রিয় অধ্যাপক হিসেবে পরিচিত। বক্তৃতার ময়দানেও তার রয়েছে অসাধারণ ভূমিকা। আর লেখালেখির জগতে তো মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরীকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মতো কিছু নেই।

শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি রহ.কে নিয়ে তার স্মৃতিকথা নিয়মিত প্রচার হবে আপনাদের প্রিয় নিউজ পোর্টাল আওয়ার ইসলামে। আজ থাকছে প্রথম পর্ব-

আল্লামা আহমদ শফী (রাহ.) তাঁর শিক্ষকতার যামানায় পড়ার চাইতেও বেশি লেখার প্রতি জোর দিতেন। বলতেন- “লেখা-পড়া, লেখা-পড়া”। একবার তাঁর উপস্থিতিতে হাটহাজারী মাদরাসার দারুল হাদীছে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কথা বলতে গিয়ে আমি বলেছিলাম “আপনারা এখানে পড়ালেখা করতে এসেছেন” আমার কথার পর সাথে সাথে সংশোধনী এনে তিনি বললেন- “আমরাতো আগে লেখাপড়া করেছি এখন তাহলে পড়ালেখা করতে হবে”।

তিনি তাঁর দারসে লেখার প্রতি ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করতেন এবং বলতেন – “العلم صيد و الكتابة قيد” অর্থাৎ স্মৃতিশক্তি থেকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, আর লিখে রাখলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তিনি আরো বলতেন– “মহান আল্লাহ তা’আলা সারা পৃথিবীর স্রষ্টা, আর তাঁর প্রথম সৃষ্টি কলম, সুতরাং তোমাদের জন্য কলম হাতে নেয়া অতীব জরুরি”।

আমরা হযরত (রাহ.)- এর কাছে অনেক কিতাবাদি পড়েছি। আর আমি পড়েছি মেশকাত শরীফ ১ম খন্ড আর দাওরায়ে হাদিস বা তাকমিলের নাসাঈ শরীফ। দারসে বসে লিখতে লিখতে বিরক্ত হয়ে এমন ভান করতাম যেন আমি লিখছি, আসলে আমার সামনে কলম-খাতা কিছুই নেই আর হযরত (রাহ.) শুধু বলেই যেতেন তাঁর কোন বিরক্তিভাব বা ক্লান্তি পরিলক্ষিত হতো না।

আমি তো “থোড়া করে” লিখার ভয়ে অনেক সময় সামনের টেবিলে বসা থেকে বিরত থাকতাম। মাতেন হাদিস পড়তেন আর হযরত বলতেন- “ওয়া! আযিয়া থোড়া গরিয়ারে এক্কানা লেহা পরিবো”। থোড়া মানে- যোহরের নামাজের আযান পর্যন্ত। জানিনা হযরতের “থোড়া” শব্দের মর্ম কি!!।

গাড়ি তৈরি, সফর সঙ্গীরা প্রস্তুত, দুপুরের আহার শেষ, আহার শেষ করে যোহরের নামায আদায় করে হযরত মাহফিলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করবেন; এমন মূহুর্তে কিতাব হাতে দারসের উদ্দেশ্যে দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় বলতেন “ওয়া আঁই থোড়া গরিয়ারে এক্কানা পরাইয়ারে আইর”।

যোহরের পর থেকে আসরের আযান পর্যন্ত অনবরত পড়াচ্ছেন, “থোড়া”এখনো শেষ হয়নি। যাক “থোড়া” নিয়ে আর লেখব না, এবার শেষ। একদিন ঢাকা গাজীপুর থেকে তিন/চার জন গুরুত্বপূর্ণ মেহমান হাটহাজারী মাদরাসা পরিদর্শনে এসে হযরতের সাথে সাক্ষাতের জন্য তাঁর কক্ষে প্রবেশ করলেন, আমিও যেন কী এক প্রয়োজনে তখন হযরতের কক্ষে অবস্থান করছিলাম। হযরত সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ভেতর থেকে বের হওয়ার সময় সামনের কক্ষে গাজীপুর থেকে আসা মেহমানদের সাথে সাক্ষাৎ হলো এবং কুশল বিনিময় করলেন।

অতঃপর হযরত নিজ খাদেমদের বললেন-“ওয়া! তোঁয়ারা ইতারারে এক্কানা চা দ!” আর মেহমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন- “অনেরা এক্কানা থোড়া গরিয়ারে বইয়ন, আঁই এক্কানা আইর”। আমার জানামতে হযরত তিন দিনের সফরে সিলেট যাচ্ছেন, সিলেট শহরে, সুনামগঞ্জে ও তৃতীয় দিন চট্টগ্রাম ফিরে আসার পথে হবিগঞ্জে সর্বমোট তিনটি মাহফিলে অংশগ্রহণ করবেন। এই ছিল হযরতের “থোড়া”।

আসলে হযরতের “থোড়া” নিয়ে আমি অল্প গবেষণা করেছি। গবেষণার পর আমি যা বুঝতে পেরেছি তা হলো- দিনের তুলনায় ঘন্টা “থোড়া”, মাসের তুলনায় দিন “থোড়া” আর বছরের তুলনায় মাস “থোড়া”,জীবনের তুলনায় বছর “থোড়া” আর পরকালের জীবনের তুলনায় দুনিয়ার ৭০/৮০ বছরের জীবনও “থোড়া”।

সিলেটের উদ্দেশ্যে হযরতকে বহন করে গাড়ি যখন জামেয়ার শাহী গেইট দিয়ে বের হয়ে গেল, আমি মনে মনে ভাবলাম- গাজীপুর থেকে আসা মুসাফির মেহমানগন হযরতের কথা ভালোভাবে না বুঝে হয়ত কষ্ট পাবে; তাঁরা তো জানেন না “থোড়া” হযরতের নিত্য ব্যবহার্য একটি শব্দ এবং খাদেম যারা আছেন তারাও হয়ত বিষয়টা পরিষ্কার করবেন না এই ভেবে আমি পুনরায় হযরতের কক্ষে গেলাম, যাওয়ার পর দেখলাম মেহমান হযরতের কক্ষে বসে আছেন এবং হযরতের অপেক্ষায় আছেন। আমি তাদের সাথে কুশল বিনিময় করলাম।

তাদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হযরত তো বললেন, কিছুক্ষণ পর আসবেন , হযরতের সাথে আমাদের কখন দেখা হবে!?”। আমি ছোট্ট একটি মুচকি হাসি উপহার দিয়ে বললাম- “তিন দিন পর”।

তখন ইনশাআল্লাহ বলা হয়েছিল কিনা এখন মনে পড়ছে না, তবে বিষয়টি আমি তাদের সামনে খোলাসা করলাম, তারাও কোন রা শব্দ না করে পার্কিং এ থাকা ল্যান্ড ক্রুইজার গাড়িতে চেপে বসলেন এবং বিলম্ব না করে হাটহাজারী ত্যাগ করলেন।

এই ঘটনা ছিল ২০০৮ সনের, শুনেছি গাজিপুরের সেই মেহমানবৃন্দ আবারো এসেছিলেন ২০১৫ সনে এবার এসেছেন বাইরোডে বা বিমানে নয়; হেলিকপ্টারে। এখানে আসার পর তাঁরা হযরতের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন কী না, কোথায়, কিভাবে সাক্ষাৎ করেছেন আমার জানা হয়নি, জানার পরিবেশও ছিল না।

কথা চলছিল “পড়ালেখা” আর “লেখাপড়া” নিয়ে। ১৯৯৭ সন, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস ময়দানে আন্তর্জাতিক ইসলামী মহা-সম্মেলন। বিশাল মাহফিল। মাগরিবের পর হযরত বয়ান করছেন- বয়ানের বিষয়বস্তু ছিল “বিদা’ত ও কুসংস্কার”। বয়ানের আংশিক এখানে তুলে ধরা হলো- “বর্তমান বাংলাদেশে ষোল কোটি মানুষ, আট কোটি পুরুষ, আট কোটি মহিলা। দাঁড়াইয়া- খাড়াইয়া কেয়াম করে না, তারা বেকেয়ামী, ওহাবী, বেদা’তীদের ভাষায় -“ওহাবীরা কাফের”।

আর যারা কাফেরদের সাথে থাকে, কাফেরদের সাথে উঠাবসা করে, কাফেরদের রান্না খায় তারাও কাফের। তাহলে বাংলাদেশে কোন মুসলমান নাই” ইত্যাদি। এক পর্যায়ে হযরত বললেন “থোড়া গরি লেখেন”- যেন হাটহাজারী মাদরাসার “দারুল হাদীছ” বা “দারুল মেশকাত”। মাহফিলের প্যান্ডেলে বসে থাকা আমরা যারা হযরতের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখে রুমাল দিয়ে হাসছি।

(তখন কাদে রুমাল রাখার প্রথা ছিল) ছাত্রদের উদ্দেশ্যে প্রায় তিনি বলতেন; “লেখো- লেখো”!! আগে লেখা পরে পড়া। লেখাপড়া। লেখাপড়া। কিন্তু হযরতকে স্বহস্তে লিখতে বা কারো চিঠির উত্তর দিতে অন্তত আমি কোন দিন দেখিনি। অতি প্রয়োজনে তিনি কারো দ্বারা লিখাতেন আর লিখার নিচে দস্তখত করে দিতেন।

আমি নিজেও হযরতের পক্ষ থেকে অনেক লিখা লিখেছি, অনেক চিঠির উত্তর লিখে দিয়েছি। বিশেষ করে হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিমের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তেমন লেখালেখি তিনি করেননি এহতেমামের এত বড় বিশাল দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার পর বিভিন্ন ব্যস্ততা এবং জামেয়ার সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতিতে মনোনিবেশ হওয়ার কারণে অনেকটা লেখালেখির আগ্ৰহ হারিয়ে ফেলেন তিনি। (চলবে)

-কেএল