194280

নদির কলতানে জেগে থাকা কবি আল মাহমুদ

মাসউদুল কাদির।।

প্রেমের কবি আল মাহমুদ। খুব কাছে থেকে আল মাহমুদ-এর রসবোধ গ্রহণের সুযোগ হয়েছে। আমি তাকে ভালো কবি বললেই তিনি ভালো কবি হয়ে যাবেন না। তিনি নিজেকে কখনো কবি বলতেন না। তবে এটুকু বলতেন, আমাকে লোকজন কবি কবি বলে।

অনেকগুলো সাহিত্যসভায় তার উপস্থিতিতে কবিতা পড়েছি। কিশোর কবিতায় শ্রেষ্ঠ। যারা তার অমৃতাক্ষর ছন্দের কবিতা পড়েছেন তারা হয়তো বলবেন কবিতাতেই তিনি শ্রেষ্ঠ। অমৃতাক্ষর ছন্দের স্রষ্টা মহা কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত। পরে এ ছন্দে অসংখ্য কবি নিজের পরিশ্রমকে সার্থক করার চেষ্টা করেছেন। তাকে দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি বলা হতো। আমার ছোটবেলায় আমার বাড়ির খুব কাছের এই মানুষটিকে বুঝতে পারিনি আসলে তিনি এতবড় কবি। তিতাস পাড়ের কবি। আবার শামসুর রাহমান মেঘনাপাড়ের কবি।

১৮৬২ সালে কলকাতায় থাকাকালীন মাইকেল মধুসুদন দত্ত তার মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে স্ত্রী-পুত্র, কন্যাকে নিয়ে নদীপথে যশোরের সাগরদাঁড়িতে আসেন। যশোরের কপোতাক্ষ, ভৈরব, চিত্রা, মুক্তেশ্বরী ও হরিহর নদীর বাতাস বুকে ধারণ করেছিলেন মাইকেল। কবির সঙ্গে যেনো নদির বড়ই ভালো সম্পর্ক। যেখানে কবির জন্ম সেখানে নদি থাকতে হয়। আহমদ ছফাও কর্ণফুলি নদির খুব কাছেই জন্মেছিলেন। পটিয়ার সবচেয়ে আলোকিত জায়গাটা সুচক্রদন্ডীতে জন্মেছিলেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১১ অক্টোবর ১৮৭১ – ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩)। আমি ওই এলাকাটায় গিয়েছি। তারই ভাতিজা আহমদ শরীফ ( ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯২১ – ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯) বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিমণ্ডলের অন্যতম প্রতিভূর জন্মও সেখানেই।

নদি ও সাগর দুটোর প্রেম ছিল তাদের হৃদয়ে। নদি কলতান ছাড়া কবি জেগে উঠে না। কবিমনে উত্তালতরঙ্গ আন্দোলিত হয় না। কবি আল মাহমুদও নদির প্রেমে মজেছিলেন। গ্রামের এক্কেবারে খড়ে গম্বুজ নিয়ে যেমন লিখেছেন তেমনি নদিন নিয়ে নিজের উপস্থিতির জানান দিয়েছেন। আমরা আল মাহমুদ হিসেবে তাকে জানলেও তার অন্য একটি নামও আছে। মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬ – ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)।

তাকে তার আশপাশের লোকজন মীর আবদুস শুকুর হিসেবেই জানতো। এই মীর আবদুস শুকুরই একসময় হয়ে ওঠেন বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদ। তিতাস নদি তাকে টেনেছিল। মেঘনাও তাকে ডেকেছিল। পাখির কাছে নদির কাছে অসাধারণ কিশোর কবিতার জন্ম দিয়েছেন আল মাহমুদ। তার মুখেও এ কবিতার বেশ কিছু লাইন আমি শুনেছি। মাঝে মাঝে তিনি পড়তে গিয়ে ভুলে যেতেন। বলতেন, আর মনে রাখতে পারছি না। এখানেও নদি মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছিল,

নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে এলেম ঘর
ঘুমন্ত এই মস্ত শহর করছিলো থরথর।
মিনারটাকে দেখছি যেন দাঁড়িয়ে আছেন কেউ,
পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ?
চৌকিদারের হাঁক শুনে যেই মোড় ফিরেছি বায়-
কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিল আয় আয়।
পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লাল দীঘিটার পাড়
এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার।
আমায় দেখে কলকলিয়ে দীঘির কালো জল
বললো, এসো, আমরা সবাই না ঘুমানোর দল-
পকেট থেকে খুলো তোমার পদ্য লেখার ভাঁজ
রক্তজবার ঝোপের কাছে কাব্য হবে আজ।
দীঘির কথায় উঠলো হেসে ফুল পাখিদের সব
কাব্য হবে, কাব্য হবে- জুড়লো কলরব।
কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই
পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই।

দীঘিটা বলার পরে জায়গাটা চিনতে কারও ভুল হওয়ার কথা নয়। কবি সাগর পাড়ের সেই চাটগাঁর শহর নিয়ে কবিতাটি লিখেছিলেন। কালের একসময়ে এ কবিতাটিই বিখ্যাত হয়ে যায়। নিজেকে পাখির সঙ্গেও তুলনা করেছেন আল মাহমুদ।

তোমরা যখন শিখছো পড়া
মানুষ হওয়ার জন্য,
আমি না হয় পাখি হবো
পাখির মত বন্য।

অনেক কথা বলার ইচ্ছা করে। আল মাহমুদ-এর মতো একজন শ্রেষ্ঠ বড় কবির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো বলে আজকে অনেক গর্ব হয়। আমাদের শীলন বাংলাদেশ-এর অনুষ্ঠানেও তাকে আমরা এনেছিলাম। পরপারে তিনি ভালো থাকুন। সুন্দর থাকুন। এটাই প্রত্যাশা।

-এএ

ad