২০১৯-০৩-১৫

মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯

শ্রমিকদের পক্ষে ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের ১৭ দফা ঘোষণা

OURISLAM24.COM
news-image

আওয়ার ইসলাম: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আমীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই বলেছেন, রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় লুটপাট, দুর্নীতি ও কায়েমী স্বার্থবাদীদের কারণে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না। দুর্নীতি বন্ধ না করে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা দেশের সাধারণ মানুষকে শোষণের নামান্তর।

তিনি বলেন, গ্যাসের মূল্য ১টাকাও বৃদ্ধি করা হলে জনগণ মেনে নেবে না। স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও শ্রমিকদের সমস্যার শেষ নেই। গার্মেন্ট, কৃষি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের শ্রমিকরা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ ও ন্যায্য মজুরির বঞ্চনা নিয়েই কাজ করছেন। সরকারগুলো শ্রমিকের সংকটের বাস্তবমুখি সমাধান করছে না।

যে কারণে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, শিল্পবিরোধ, স্বাস্থ্য সমস্যা, বকেয়া মজুরি, বিনা নোটিসে ছাঁটাই, নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানিসহ সর্বত্র সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। এসবের অন্যতম কারণ মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্কের অনুপস্থিতি। ইসলামী শ্রমনীতির অনুপস্থিতিতে শ্রমিকরা সুযোগ-সুবিধা ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।

দেশের শ্রমিকরা অসহায় জীবন যাপন করছে। শ্রমিকদের চাকরির নিশ্চয়তা দিতে হবে। শ্রমিকদের আস্থায় নিয়ে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশে শিল্পায়ন সম্ভব। কায়েমী স্বার্থবাদীদের কারণে দেশের শ্রমিকরা এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।

আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় শ্রমিক কনভেনশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফ আলী আকনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ খলিলুর রহমানের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত শ্রমিক কনভেনশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম শায়েখে চরমোনাই, মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ ও যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক হাফেজ মাওঃ এটিএম হেমায়েত উদ্দীন, মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।

বক্তব্য রাখেন আলহাজ আব্দুর রহমান, আলহাজ জান্নাতুল ইসলাম, মুহাম্মদ হারুনুর রশিদ, ক্যাপ্টেন অব. ইব্রাহিম, হাফেজ মাওঃ ছিদ্দিকুর রহমান, মাওলানা মামুনুর রশীদ, ডা. আল আমীন এহসান, অধ্যাপক আব্দুল করীম প্রমুখ।

পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, ডাকসু নির্বাচনকে বিতর্কিত করার মাধ্যমে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করেছে। সিইসি’র বক্তব্যের মাাধ্যমে থলের বিড়াল বের হয়ে এসেছে।

তিনি বলেন, সত্য বেশিদিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না। জাতীয় সংসদে রাশেদ খান মেননের বক্তব্যে সংসদ কলঙ্কিত করেছে। বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় আল্লাহর বন্ধু শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর ছায়াতলে শ্রমিকদেরকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। পুঁজিপতিরা শ্রমিকদেরকে কলুর বলদ হিসেবে ব্যবহার করে টাকার পাহাড় গড়ে তুলছে। আর রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি শ্রমজীবী মানুষ নির্যাতিত-নিপীড়িত শোষিত-বঞ্চিত ও পদদলিত হচ্ছে। অতীত-বর্তমান কোনো সরকারই শ্রমজীবী মানুষের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করেনি। শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামলে তাদের ওপর গুলি, হামলা-মামলা, ছাঁটাই ও বরখাস্ত করা হয়।

তিনি বলেন, রানা প্লাজা, তাজরীনসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক হতাহতের ঘটনায় সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এই বৈষম্যের মূলোৎপাটন করে সাম্য-সম্প্রীতিপূর্ণ মানবিক ও ইসলামি শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করার দাবি জানান।

জাতীয় শ্রমিক কনভেনশনে ১৭ দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়।

১. সভ্যতার কারিগর, উন্নয়ন-উৎপাদনের কর্ণধার, সুখী সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অগ্রসৈনিক এবং মানবতার কল্যানে নিবেদিত প্রাণ শ্রমিকগণকে সম্মানিত নাগরিক হিসেবেহ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাদের প্রকৃত মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

২. আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সকল শ্রমিককে আইডি কার্ড প্রদান করে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং তাদের পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় অর্ধেক করতে হবে।

৩. শ্রমিকদের উদ্বুদ্ধ করে কাম্যমানের কৃষি পণ্য উৎপাদন ও কৃষকের উৎপাদন ব্যয় পুষিয়ে নেয়ার স্বার্থে সার, সেচ এবং বীজ বিনামূল্যে প্রদান করতঃ বিনা সুদে প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদান করতে হবে।

৪. বেকারত্বের অবসান ঘটিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপন, বন্ধ কল- কারখানা চালু এবং রুগ্নশিল্প কারখানাগুলোতে উৎপাদনের স্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

৫. দ্রব্যমূল্যের আলোকে এবং মানবিক কারণে সকল শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরী ১৬,০০০/- (ষোল হাজার) টাকা নির্ধারণ করতে হবে।

৬. কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাই শ্রমিকদের উপর কঠিন জুলুম; যৌক্তিক কারণ ও ছাঁটাইয়ের শর্ত পূরণ ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৭. ব্যাপক উৎপাদনের স্বার্থে ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্রের সকল সেক্টর থেকে অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্ব অপসারণ এবং সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

৮. শ্রমিকদের উপর কোনো ধরণের শোষণ-নিপিড়ন, নির্যাতন ও অধিকার বঞ্চিত না করা।

৯. মানবিক কারণে-পায়ে চালিত রিক্সা, ভ্যান ও ঠেলা গাড়ীর লাইসেন্স ফি মওকুফ করা।

১০. সকল ধরণের ড্রাইভারদের লাইসেন্স ফি অর্ধেক করা।

১১. হকার্স পূণর্বাসন ছাড়া অমানবিক উচ্ছেদ বন্ধ করা। দ্ইু পাশে জান চলাচলের বাধা সৃষ্টি না করে এক তৃতীয়ংশ জায়গা হকার বসার ব্যবস্থা করতে হবে।

১২. অটো ইজি বাইক বন্ধের পায়তারা বন্ধ করতে হবে। অটো ইজি বাইক চলাচলের জন্য আলাদা লেন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

১৩. মৎস শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে সামদ্রিক ট্রলারে অস্ত্রের লাইসেন্স দিতে হবে।

১৪. মৎস জীবিগণ অগ্রিম আবহাওয়ার পূর্বাবাস জানার এবং নিরাপত্তার স্বার্থে যোগাযোগ নেটওয়াক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

১৫. ভ্রাম্যমান হকারদের বাসে, ট্রেনে এবং লঞ্চে উঠে পন্য বিক্রির সুযোগ দিতে হবে।

১৬. হোটেল রেস্তোরা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজের ও থাকার নিচ্চয়তা, মাহে রমজান মাসকে কেন্দ্র করে শ্রমিক ছাটাই করা যাবে না এবং দুই ঈদে দুটি ফুল বোনাস প্রদান করতে হবে।

আরআর