191962

সেজদা অবস্থায় মৃত্যু; যে মৃত্যু ঈর্ষণীয়

মুফতি মানসুর আহমাদ।।

গতকাল পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন আমরা দু’টি ঈর্ষণীয় মৃত্যুর সংবাদ জেনেছি। নামাজে সেজদারত অবস্থায় আল্লাহর দু’জন নেকবান্দার মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামের সুপ্রাচীন ও সুপ্রসিদ্ধ জিরি মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ তৈয়ব রহ. সেজদারত অবস্থায় মাওলার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। সিরাজগঞ্জের একজন ইমাম সাহেবও ঈদের নামাজে সেজদারত অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।

আমাদের দিবা-নিশির সময়টুকু যতরকম অবস্থার ভেতর দিয়ে কাটে এসবের মধ্যে সেজদা হচ্ছে সর্বোত্তম অবস্থা। হাদিস শরিফে এসেছে- عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: أقرب ما يكون العبد من ربه و هو ساجد فأكثروا الدعاء

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বান্দা তার রবের সর্বাধিক নিকটবর্তী হয় যখন সে সেজদারত থাকে। সুতরাং তোমরা অধিক হারে দোয়া কর। সহিহ মুসলিম: ৪৮২।

কার মৃত্যু কখন হবে, কোন অবস্থায় হবে তা কেউ জানে না। সবাই দীর্ঘ হায়াত কামনা করে। এ কামনা কারো পূর্ণ হয় কারো হয় না। প্রত্যেকের মৃত্যুর সময় আল্লাহর কাছে নির্ধারিত। সেই নির্ধারিত সময়েই মৃত্যুর ফেরেশতা এসে হাজির হয়। মৃত্যুআসন্ন লোকটি কোন অবস্থায় আছে তা দেখা হয় না। মন্দ অবস্থায় থাকলে একটি ভালো অবস্থায় ফিরে আসার জন্য মূহুর্তকাল সময়ও দেয়া হয় না। আমাদের চব্বিশ ঘন্টা সময় আবর্তিত হয় ভালো-মন্দ নানা অবস্থায়। যদি কারো সঙ্গে প্রাণখোলা সেজদারত অবস্থায় মৃত্যুর ফেরেশতার সাক্ষত হয় তাহলে সেটি কত বড় সৌভাগ্যের বিষয়!

আজকে আমরা জানার চেষ্টা করবো একটি ভালো মৃত্যুর আমরা কী করতে পারি। একটি হাদিসে এসেছে- عن علي رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: من سره أن يمد له في عمره، و يوسع له في رزقه، و يدفع عنه ميتة السوء فليتق الله و ليصل رحمه.

আলী রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যাকে একথা আনন্দিত করে যে, তার হায়াত দীর্ঘ করা হবে, তার রিযিকে প্রশস্ততা দান করা হবে এবং মন্দ অবস্থার মৃত্যু থেকে তাকে হেফাজত করা হবে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে (গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে) এবং আত্মীয়তার হক আদায় করে। মুসনাদে আহমাদ: ১২১৩।

অন্য একটি হাদিসে এসেছে- عن أنس بن مالك قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إن الصدقة لتطفئ غضب الرب، وتدفع ميتة السوء. আনাস বিন মালিক রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: নিশ্চয় সদকা রবের ক্রোধ নিভিয়ে দেয় এবং মন্দ অবস্থার মৃত্যুকে রোধ করে। জামে তিরমিযি: ৬৬৪।

মন্দ অবস্থার মৃত্যুর ব্যাখ্যা: ميتة: وهي الحالة التى يكون عليها الإنسان في الموت. قال العراقى: الظاهر أن المراد بها ما استعاذ منه النبي صلى الله عليه وسلم الهدم و التردى و الغرق و الحرق و يتخبطه الشيطان عند الموت و أن يقتل في سبيل الله مدبرا. وقال بعضهم هي موت الفجاءة، و قيل ميتة الشهرة كالمصلوب مثلا. انتهى. تحفة الأحوذي.

অর্থাৎ, মন্দ অবস্থার মৃত্যু বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে যেসব মৃত্যু থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্রয় চেয়েছেন। দেয়াল ধ্বসে, উঁচু স্থান থেকে পতিত হয়ে, পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে, মৃত্যুকালে শয়তান দ্বারা বিপথগামী হয়ে ও জেহাদের ময়দান থেকে পলায়নরত অবস্থায় মারা যাওয়া। কেউ কেউ বলছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য আকষ্মিক মৃত্যু। আবার কেউ বলছেন, প্রকাশ্যে জনসম্মুখে সাজার মৃত্যু। (তিরমিযির উল্লেখিত হাদিসটির ব্যাখ্যায় তুহফাতুল আহওয়াযি)

কোন কবিরা গোনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় মারা যাওয়া হচ্ছে মুমিনের সবচেয়ে জঘন্য মৃত্যু। যেমন ডাকাতি করতে গিয়ে বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কেউ মারা গেলো।

উপরের হাদিস দু’টোতে মন্দ অবস্থার মৃত্যু থেকে বাঁচতে মোট তিনটি আমলের কথা বলা হয়েছে। ১. তাকওয়া অবলম্বন করা। আল্লাহকে ভয় করে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা। কখনো গোনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তাওবা-ইস্তেগফার করে নেওয়া। ২. আত্মীয় স্বজনের হক আদায় করা। ৩. দান-সদকা করা।

হাদিসে বর্ণিত আমলগুলোর প্রতি যতবেশি যত্নবান থাকবো আমরা তত ভালো মৃত্যুর আশা করতে পারবো।

লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব- বাইতুস সালাম মাদরাসা, উত্তরা, ঢাকা

-এএ

ad