191303

মক্কা বিজয়: ঐতিহাসিক পাঠ ও মহানুভবতার শিক্ষা

উবায়দুল্লাহ তাসনিম

মক্কা বিজয় বিজয় ইতিহাসের এক অপূর্ব অধ্যায়৷ কতো বিজয় দেখেছে পৃথিবী, কিন্তু এরকম আশ্চর্য বিজয় পৃথিবী আর দেখেনি। নতুন ধারার বিজয়ের সাথে ইতিহাস এই প্রথম মুখোমুখি হয়েছে।

বিজয় উপাখ্যানটা অবিশ্বাস্য রকমের। এতোকাল যাদের যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ ছিলেন নবি মুহাম্মদ সা, যারা নিপীড়নের সম্ভাব্য কোন পন্থাই বাকি রাখেনি,তাদের সাথে প্রিয় নবীজি সা এর এ কেমন ব্যবহার! হাতের নাগালে পেয়েও শত্রুকে কচুকাটা নয়; শুধুই ক্ষমা আর উদারতা!

মদিনায় হিজরতের পর বদর থেকে মুসলমানদের ধারাবাহিক বিজয়ের যেই পালা শুরু হয়েছিল (অবশ্য উহুদ যুদ্ধেও মৌলিকভাবে মুসলমানদের বিজয় ছিল) সেই ধারাবাহিক বিজয়গুলোর চূড়ান্ত বিজয়-ই সেই ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়।

মক্কক বিজয়ের পটভূমি:

মক্কায় নবীজি সা, সাহাবায়ে কেরাম বিরাট ধকল সয়েছেন। নির্যাতন, নিপীড়ন নিষ্ঠুরতা ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। মদিনায় আসার পরও কুরাইশ,মদিনার ইহুদি, মুনাফিক সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছিলেন মুসলমানরা। মদিনায় আসার পরও অনেকগুলো জিহাদ করেছেন। এবার তারা পরিক্ষায় উত্তীর্ণ।

আল্লামা নদবির ভাষায়, এতোদিনে সত্যের পথে অবিচলিত থাকার যে ঈমানি পরীক্ষা ইত্যাদি শেষ । মুসলমানদের ধর্মীয় প্রশিক্ষণের ভিত্তি মজবুত হয়ে গেছে।(নবিয়ে রহমত)

এখন আল্লাহর অপার হিকমতের দাবি হলো, তারা বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করবেন। বাইতুল্লাহ তাগুতি শক্তির নিদর্শনে ভরপুর।সারাটা কাবা মূর্তি মূর্তি ছেয়ে গেছে। কম না; ৩৬০ টা। কাবার দেয়ালে নানান ছবি আঁকা!

অথচ বাইতুল্লাহ কিয়ামত তক সমগ্র মানবতার হেদায়াত ও বরকতের উৎস। এটাকে পরিস্কার করতে হবে। আল্লাহ এর জন্য উপকরণও সৃষ্টি করলেন। ফলে মক্কা বিজয় আল্লাহর হিকমতের তাকযার (চাহিদা) পাশাপাশি নৈতিক দিক থেকে একটা অবশ্যম্ভবী বিষয়ে পরিণত হলো।

মক্কা বিজয়ের নৈতিক দিক:

ষষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়। এই সন্ধিতে অনেকগুলো শর্ত ছিল। এই শর্তগুলোর একটি ছিল এরকম, যে, কেউ চাইলে মুসলমানদের আশ্রয়ে আসতে পারে, আবার কেউ চাইলে কাফেরদের আশ্রয়েও যেতে পারে। বনু খুযাআ ও বনু বকর দু’দিকে ভাগ হয়ে যায়। বনু বকর কুরাইশদের সাথে জুড়ে, বনু গিয়ে মিশে মুসলমানদের সাথে। (সীরাতে ইবনে হিশাম, খ,২ পৃ, ৩৯০)

এ দু’গোত্রের মাঝে নবীজি সা এর জন্মেরও আগ থেকে অনেক পুরনো সংঘাত ছিল। ভাগ হয়ে যাবার পর সেই পুরনো শত্রুতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। বনু বকর সুযোগের সৎ ব্যবহার করল। রাতের আঁধার নেমে এসেছে এমন সময়, বনু বকর (মুসলমানদের মিত্র) বনু খুযাআর উপর হামলে পড়ে। এদিকে কুরাইশরা তাদের মিত্র বনু বকরকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে৷ সংঘাতে বনু খুযাআর কয়েকজন মারা যায়।

এমনকি বনু বকরের লোকেরা বনু খুযাআকে দৌড়ে হারাম শরিফ পর্যন্ত নিয়ে গেলে খুযাআর লোকজন বলছিল, দেখো, আমরা হারামে এসে গেছি, আমাদের উপাস্য মাবুদের দিকে একটু খেয়াল করো। জবাবে বনু বকর যা বলছিল, আজকের দিনে কোন মাবুদ নেই। বনু বকর, তোমরা আজ প্রাণভরে প্রতিশোধ নাও। এরপর তো আর সুযোগ পাবে না। (যাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ খ, ১,পৃ ৪১৯ সীরাতে ইবনে হিশাম, খ২, পৃ ৩৯০)

এখানে অস্ত্র সহযোগিতার মাধ্যমে কার্যত কুরাইশরাই চুক্তি ভঙ্গ করে। অথচ এটা ছিল হুদাইবিয়ায় সম্পাদিত চুক্তির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকরণ।

মাজলুম বনু খুযাআ যেহেতু মুসলমানদের মিত্র, দু’দলের মাঝে পরস্পরকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি ছিল এবং তারা (বনু খুযাআ) আমর ইবনে সালেম আল কুযাঈর মাধ্যমে মুসলমানদের কাছে সাহায্যও কামনা করেছিল, সেহেতু তাদের পক্ষ হয়ে কুরাইশদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের

প্রতিশোধ গ্রহণ একটা নৈতিক দায়িত্ব হিশেবে দেখা দিল। এরপরও রাসূল সা শেষ সুযোগ হিশেবে তাদের তিনটি প্রস্তাব করলেন। (১)কুরাইশরা রক্তপণ আদায় করবে। (২)না হয়, বনু বকরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।

৩) অথবা, তারা যেরকম আচরণ করেছে সেরকম আচরণ করা হবে।

কুরাইশ কাফেররা তৃতীয়টিকেই গ্রহকরল। (যদিও পরবর্তীতে তারা তাদের সিদ্ধান্তের ভুল স্বীকার করেছে, এবং সে ভিত্তিতে নানা কৌশলে পুনরায় সমঝোতা করতে চেয়েছে। কিন্তু এতে তারা সফল হয়নি)।

রাসূল সা তাই ৮ম হিজরীর ১০ রমজান বাদ আছর ১০ হাজার মুসলমানের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। (বুখারী, ফাতহুল বারী)

একজন মহানুভব শাসকের দৃষ্টান্ত:

দশ হাজার সাহাবায়ে কেরামের বিশাল জামাত নিয়ে রাসূল সা মক্কার পথে চলছেন। পথিমধ্যে আবু সুফিয়ানের সাথে দেখা। চোখাচোখি হলে নবীজি সা চেহারা ফিরিয়ে নেন। চেহারা না ফিরানো এটা ছিল তার সামর্থ্যের বাইরে।

অন্যান্য অনেকের মতো এই ব্যক্তিটিও কবিতা রচনা করে প্রিয় নবীজি সা কর কষ্ট দিয়েছে৷ আবু সুফিয়ান এ বিমুখতার ব্যাপারটা আলী রা এর নিকট অভিযোগ করলে তিনি বলেন, তুমি রাসূল সা এর সামনে হাজির হয়ে ঠিক সেরকম বলো, যেরকম বলেছিল ইউসুফ আ এর ভাইয়েরা ‘আল্লাহর ক্বসম! আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আর নিশ্চয় আমরাই ছিলাম অপরাধী। ‘

হলোও তাই। রাসূল সা এর নিকট গিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে সে কথাটা বলল। এরপর তিনি যে কথাটা বলেছিলেন, এর জন্য আবু সুফিয়ান হয়তো নিজেও প্রস্তুত ছিলন না৷ এরকম হতে পারে তা কখনো ভাবেনি।

রাসূল সা বলেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধ কোন অভিযোগ নেই৷ আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি দয়াবানদের মধ্যে সবচে সেরা দয়ালু৷ (যাদুল মাআদ, খ১, পৃ ৪২১)

আবু সুফিয়ান তার এই মহানুভায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

আবু সুফিয়াকে ক্ষমার সাথে সাথে ব্যাপকভাবে সবার জন্য এক বিরাট ক্ষমা ঘোষণা করেন। নবীজি সা এখনো মক্কায় প্রবেশ করেননি। আবু সুফিয়ান দৌড়ে মক্কার উপকন্ঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, ‘হে কুরাইশের লোকেরা! মুহাম্মদ আজ বিশাল ও বিপুল শক্তি নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত, যা তোমাদের ধারণার বাইরে। এখন যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নিবে, তারা নিরাপদ। তা শুনে লোকেরা আবুকে বলাবলি করতে শুরু করে, তোমার ঘরের পরিসরটা-ই বা কতটুকু? তাতে কয়জনের সংকুলান হবে?এরপর, আবু সুফিয়ান বললেন, যারা নিজের ঘরে দরোজা বন্ধ করে থাকবে,তারাও নিরাপদ। মসজিদুল হারামে যারা আশ্রয় নেবে, তারাও নিরাপদ। ( ইবনে হিশাম, ২, ৪০৪, যাদুল মাআদ খ ১,পৃ ৪২৩

মক্কায় যেভাবে প্রবেশ করেন: তিনি মহান। তার আদর্শ মহান। অন্য আর দশজন শাসকের মতো তিনি ঔদ্ধত্য নিয়ে বিজিত ভূমিতে প্রবেশ করতে পারেন না৷ বিজয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ বৈ অন্য কিছু নয়। রাসূল সা মক্কায় যখন প্রবেশ করছেন, তখন বিনয়ের এক অবাককর দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। তিনি (সা) একটি উটের উপর বসা৷ পিছনে যায়েদ ইবনে উসামা রা। একজন বিজয়ী শাসক বিজিত অঞ্চলে প্রবেশ করছেন অথচ থুতনি যেনো উটের পিঠ ছুঁয়ে যাবে। (ইবনে কাছীর, ৩,৫৫৪-৫৫৬) মুখে তখন সূরা ফাতহের পাঠ চলমান ছিল।

‘সত্য এসেছে, মিথ্যা বিদূরিত’: মক্কায় পৌঁছে রাসূল সা বাইতুল্লাহ অভিমুখে রওয়ানা করলেন। কাবা শরিফে (আশপাশসহ) ৩৬০ টি মূর্তি নিথর দাঁড়িয়ে আছে। নবীজি সা বাইতুল্লাহ তওয়াফ করছেন। তার হাতে একটা ধনুক। ধনুক দিয়ে মূর্তিগুলোকে খোঁচা দিচ্ছিলেন, আর অবলা মূর্তিগুলো উল্টে পড়ছিল। তার মুখে তখন এই আয়াতের তিলাওয়াত চলছে,

جاء الحق وزهق الباطل،إن الباطل كان زهوقا ‘সত্য সমাগত, মিথ্যা দূরীভূত, আর নিশ্চয় মিথ্যার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী'(সূরা ইসরা ৮১)

কাবার দেয়ালে টানানো কিছু ছবি, নামিয়ে সেগুলো গুড়িয়ে দেওয়া হয়।(যাদুল মাআদ, ১ম,৪২৪, বুখারি)

কাবা শরিফের চাবি : উত্তম ব্যবহারের নমুনা

তওয়াফ শেষে কাবার চাবি রক্ষক উসমান ইবনে তলহাকে ডাকলেন। তার হাত থেকে চাবি নিয়ে তিনি কাবা শরিফের দরোজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন৷ এই উসমানের কাছে হিজরতেরও আগে যখন নবীজি সা চাবি চাইলেন, তখন সে চাবি দেয়নি৷ রূঢ় ভাষায় নবীজি সা এর উত্তর দেয় এবং অসম্মানজনক কথা বলে। তখন নবীজি সা বলেছিলেন, একদিন তুমি এই চাবিটি আমার হাতে দেখতে পাবে৷ সেদিন আমি যাকে ইচ্ছা তাকে দিবো। তখন উসমান আশংকা প্রকাশ করে বলছিলেন, বস্তবে এমন হলে সেদিন কুরাইশদের জন্য খুবই লাঞ্চনার ব্যাপার হবে। নবীজি বললেন, না, সেদিনটা হবে প্রতিষ্ঠা ও সম্মানের৷ একদিন বাস্তবে যে এমনটা ঘটবে, এ ব্যাপারে উসমানের কোন সন্দেহ ছিল না। এবং কথাটা তার অন্তরে গেঁথে যায়৷

সেই ভবিষ্যৎবাণীর-ই বাস্তবায়ন হতে চলছে আজ।

কাবা শরিফ থেকে বের হবার পর চাবির জন্য আলী রা আবেদন করেন। কিন্তু নবীজি সা জানতে চান, উসমান কোথায়? উসমান আসলে তার হাতে নবীজি সা চাবি দিয়ে বলেন, উছমান! এই নাও তোমার চাবি। আজ উত্তম ব্যবহার ও বিশ্বস্ততা দেখানোর দিন। এই নাও চাবি। এই চাবি তোমাদের কাছেই থাকবে। একমাত্র জালিম ছাড়া অন্য কেউ তা তোমাদের কাছ থেকে নিতে পারবে না৷ (যাদুল মাআদ,খ ১,পৃ ৪২৫, তাবাকাতে ইবনে সাআদের বরাতে)

ঐতিহাসিক ভাষণ ও মহানুভতার শিক্ষা: রাসূল সা যখন কাবার ভিতরে ছিলেন, তখন কুরাইশ কাফেররা কাবার চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে। সবাই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে৷ কি সিদ্ধান্ত আসে বলা যায় না। এতোটা কাল তার সাথে এতো অমানবিক আচরণ করেছে তারা, কষ্ট দিয়েছে! নিজের কাছে নিজেরাই অপরাধী।

নবীজি সা খানিকপর বের হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে নবীজি সা এক ভাষণ করলেন, ‘এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি এক। তার কোন শরিক নেই। তিনি তার ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং যূথবদ্ধ দলসমূহকে একাই পরাজিত করেছেন৷ মনে রেখো, সবধরণের গর্ব, প্রতিহিংসা ও রক্তপণ আমার দুই পায়ের নীচে। কেবল কাবার অভিভাবকত্ব ও হাজিদের পানি পানের বিষয়টা ব্যতিক্রম৷ হে কুরাইশ সম্প্রদায়, জাহেলী যুগের গর্ব ও বংশ গৌরব আল্লাহ শেষ করে দিয়েছেন। সমস্ত মানুষ আদম আ এর সন্তান আর আদম মাটির সৃষ্টি। (যাদুল মাআদ, খ, ১,পৃ, ৪২৪) এরপর তিনি কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন,(অর্থ) ‘হে মানুষ আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক নারী ও পুরুষ থেকে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান, যে মুত্তাকি। (সূরা হুজুরাত, ১৩)

এরপর সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, কুরাইশগণ! তোমরা কী আশা করছ, এখন আমি তোমাদের সংগে কিরূপ ব্যবহার করবো? তারা জবাব দিল, আমরা তোমার নিকট উত্তম ব্যবহার পাবার আশা করি। তুমি হৃদয়বান। তুমি সম্ভ্রান্ত ভাই ও ভাতিজা। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে তাই বলছি, যা ইউসুফ আ তার ভাইদেরকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।'(প্রাগুক্ত)

-এটি

ad