187969

শরিয়াহ দৃষ্টিকোণে আইসোলেশন, লকডাউন ও হোমকোয়ারান্টাইন

মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমি ।।

পুরো পৃথিবী আজ স্তব্ধ স্তম্ভিত। শহরগুলোতে রিক্ততার বাতাস বয়ে চলছে। দিনদিন মহামারী (কোভিট-১৯) করোনা ভাইরাসে পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে ঝরছে কত প্রাণ। আক্রান্ত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। এ যেন বাতাসের বেগে সর্বত্র ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, ক্ষমতা আর সচেতন জনশক্তি নিয়েও পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যে ভাইরাসের এই পর্যন্ত কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেনি। আমাদের দেশের অবস্থাতো বলাই বাহুল্য।

কারণ, করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশের অবস্থা বড়ই নাজুক। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে শহর হতে অজপাড়াগাঁয়ে। প্রতিদিন কারো না কারো আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। মৃত্যুুর হারও বেড়ে চলেছে।

গতকাল বুধবার (২৬ মার্চ) এক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে আইইডিসিআর(IEDCR) পরিচালক জানান, সব মিলিয়ে দেশে এ পর্যন্ত ৭৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় ৩৯ জনের। এর মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। সাতজন সুস্থ হয়েছে। বাকি ২৭ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এখন পর্যন্ত ২১ হাজার মানুষ এবং ২০০ জনের প্রাণ হারানোর খবর এসেছে। অন্যদিকে এ ভাইরাস যাদের শরীরে শনাক্ত হয়েছে তাদের ১ লাখ ১৪ হাজার ২১৮ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এছাড়া ভাইরাসটি মোট শনাক্ত হয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৫ জনের শরীরে।

বর্তমানে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৮৭ জনের শরীরে এ ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে। চিকিৎসাধীন এসব মানুষের মধ্যে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৬৯৫ জনের অবস্থা স্থিতিশীল এবং ১৪ হাজার ৭৯২ জনের অবস্থা গুরুতর।

ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল চীনে- সেখানে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৮১ হাজার ২৮৫ জন এবং মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ২৮৭ জন। দেশটিতে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৬৭ জন এবং নতুন মৃতের সংখ্যা অন্তত ছয় জন।

ভাইরাসটিতে ইতালিতে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে মারা গেছেন ৭ হাজার ৫০৩ জন। এদের মধ্যে ৬৮৩ জন মারা গেছেন গেল ২৪ ঘণ্টায়। দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৩৮৬ জন।

সবমিলিয়ে অবস্থা খুব ভালো নয়।দেশের সকল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ধ। হাটবাজারে শূণ্যতা বিরাজ করছে।

সরকারী বেসরকারী স্বাস্থ্যবিভাগের পক্ষ থেকে বর্তমান ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের যথাসম্ভব প্রতিরোধকল্পে জনসমাগম এড়িয়ে জনবিচ্ছিন্ন কর্মকৌশল অবলম্বন করতে বলা হচ্ছে, সবাইকে নিজ নিজ বাসা-বাড়ি ও আবাসনে অবস্থান করতে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। কেউ আক্রান্ত হলে বা আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ হলে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।বিদেশফেরত এবং সন্দেহভাজন লোকদেরকে আইসোলেশনের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চল,এলাকা এবং জেলা-উপজেলা গ্রামকে লকডাউন করা হচ্ছে।

অনেকে আবার এগুলোকে তাকওয়া-তাওয়াক্কুল তথা খোদা ভীতি ও আল্লাহর উপর অকৃত্রিম আস্থা ও ভরসার প্রতিবন্ধক বলে সংশয়ের শিকার হচ্ছে। আসলে এটাই চূড়ান্ত বাস্তবতা যে,কিছুর থেকে কিছু হয়না, যা কিছু হয় আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা, ক্ষমতা ও হুকুমেই হয়।তবে আল্লাহ তা’আলা এই বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপনাকে স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন উপায়-উপকরন নির্ভর করেছেন-الدنيا دار الاسباب।

হ্যাঁ,কখনো কখনো এর ব্যতিক্রম হয়, ব্যত্যয়ও ঘটে। তবে সেটাও আল্লাহ তা’আলার হুকুমের কারনেই হয়।
সুতরাং আল্লাহ তাআলার উপর পূর্ন আস্থা ও ভরসা রেখে বাহ্যিক কার্যকারণ হিসেবে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রদত্ত পরামর্শগুলো পালন ও গ্রহণে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন সমস্যা নেই, বরং তা কার্যকর করা এখন শুধু সময়ের দাবিই নয়,সুন্নতে রাসূল ও উসওয়ায়ে সাহাবা দ্বারাও প্রমানিত। এ সংক্রান্ত কিছু উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরছি:

১। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং ও আইসোলেশন: সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব এর মানে হলো অকারণে বাইরে যাওয়া যাবেনা। গণপরিবহনে পারতপক্ষে উঠা যাবে না। আইসোলেশন এর অর্থ হলো বিচ্ছিন্ন থাকা যারা দেশের বাইরে থেকে এসেছেন বা সম্ভাব্য রোগীদের সংস্পর্শে এসেছেন বা নিশ্চিতভাবে করোনায় আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাঁরা নিজেদেরকে নিজ গৃহে আলাদা রাখা। নিজেদের স্বাস্থ্য নিজেরা পর্যবেক্ষণ করা।

জনবিচ্ছিন্ন কর্মকৌশল এবং সাহাবী যুগ: মহামারী চলাকালে এধরণের জনবিচ্ছিন্ন করনের একটি নির্দেশনা সাহাবী যুগেও পাওয়া যায়।
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগে ফিলিস্তিনে আমওয়াস মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মিসর বিজেতা হযরত আমর ইবনুল আ’স রা. সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বলেন- ان هذا الوجع اذا وقع فانما يشتعل اشتعال النار
যখন এ ধরনের মহামারী দেখা দেয় তখন তা আগুনের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। فخرج بهم عمرو بن العاص الی الجبال و قسمهم الی مجموعات منع اختلاطها ببعض

এরপর তিনি সবাইকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভাগ করে নির্দেশ দিলেন পরস্পর পৃথক হয়ে পাহাড়ে চলে যাও। তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেন যে,কেউ কারো সাথে মিশতে পারবেনা। পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে তারা দীর্ঘ দিন পাহাড়ে অবস্থান করেন। আক্রান্তদের অনেকে শাহাদাত বরন করেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তাআলা মহামারী তুলে নিলে সাহাবী ওমর ইবনুল আ’স রা. জীবিতদেরকে নিয়ে সুস্থ শরীরে শহরে ফিরে আসেন (তারিখে দিমাশক)।

২। লকডাউন: লকডাউন মানে বন্ধ ব্যবস্থা। এটা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নয়। এটা প্রশাসনিক বা সরকারি ব্যবস্থা। এর মানে হলো, বিমান বন্ধ, সীমানা বন্ধ, চলাচল বন্ধ। রাস্তাঘাট বন্ধ।

লকডাউন এবং নবীজির নির্দেশনা:এধরনের একটি নির্দেশনা হাদীসেও পাওয়া যায়। মহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ করতে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন এবং নিজ এলাকায় মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মৃত্যুর ভয়ে এলাকা ছেড়ে পলায়ন করতেও বারন করেছেন। মুসলিম শরীফের বর্ননায় তিনি বলেন-
الطاعون آية الرجز ابتلی الله عز و جل به ناسا من عباده فاذا سمعتم به فلا تدخلوا عليه واذا وقع بارض وانتم بها فلا تفروا منه
মহামারী হচ্ছে একটি আযাবের নিদর্শন। আল্লাহ তা’আলা এর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন।

সুতরাং তোমরা যদি কোথাও মহামারীর সংবাদ শোনো তাহলে কিছুতেই সেখানে যাবেনা।আর ঢ়দি তোমাদের বসবাসের শহরে মহামারী দেখা দেয় তাহলে সেখান থেকে পলায়ন করবেনা(মুসলিম-৫৯০৭)। আউনুল মা’বুদ গ্রন্থাকার বলেন- মহামারী অঞ্চলে প্রবেশ এবং তা হতে পলায়ন উভয়টাই শরীয়তে হারাম।

কারন-মহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ করার দ্বারা আল্লাহ তা’আলার ক্ষমতার সামনে নিজের সাহসিকতা প্রদর্শনী বুঝা যায়।আবার আক্রান্ত এলাকা হতে পলায়ন করা মানে আলাহর হাত থেকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করা যা কারো পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়।

কুরআনে এসেছে- اينما تكونوا يدرككم الموت ولو كنتم في بروج مشيدة তোমরা যেখানেই থাকোনা কেন মৃত্যু তোমাদেরকে আক্রমণ করবেই,যদিও তোমরা শক্তিশালী টাওয়ারেও অবস্থান করোনাকেনো!(সূরা নিসা-) এছাড়া বাহ্যিক কার্যকারণ হিসেবে মহামারী আক্রান্ত এলাকায় গিয়ে কেউ যদি আক্রান্ত হয় বা মারা যায় তাহলে মানুষের ধারনা বদ্ধমূল হয়ে যাবে যে, মহামারী আক্রান্ত হয়েই মারা গিয়েছে। অথচ আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে এটাই ছিলো তার মৃত্যুর নির্ধারিত সময়।মহামারী ছিলো একটি বাহ্যিক বাহানা মত্র।

ঠিক তদ্রুপভাবে মহামারী আক্রান্ত অঞ্চল থেকে কেউ বাহিরে বের হওয়ার পর বাহ্যিক কার্যকারণ হিসেবে তার মাধ্যমে অন্য এলাকার কেউ আক্রান্ত হলেও ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগের ভ্রান্ত বিশ্বাস আবার মানুষের অন্তরে বাসা বাঁধবে যে,মহামারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রামক হয়।অথচ বাস্তবতা হচ্ছে-সবকিছু আল্লাহ তা’আলার হুকুমে হয়।অন্যথায়- প্রথমজন কোত্থেকে আক্রান্ত হলো-فمن اجرب الاول؟ তাই মহামারী আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ এবং তা হতে পলায়ন কোনটাই শরীয়তসিদ্ধ নয়(আউনুল মা’বুদ-২৫৫/৮)। আউনুল মা’বুদ গ্রন্থাকারের ভাষ্যটি লক্ষ করুন- فلا تدخلوا عليه اي يحرم عليكم ذالك لان الاقدام عليه جرأة علی خطر و ايقاع للنفس في التهلكة و الشرع ناه عن ذالك فال تعالی ولا تلقووا بايديكم الی التهلكة واذا وقع الطاعون وانتم بها فلا تخرجوا فرارا منه اي بقصد الفرار منه فان ذالك حرام وانه فرار من القدر وهو لا ينفع والثبات تسليم لما لم يسبق منه اختيار فيه ৩।হোমকোয়ারান্টাইন: হোমকোয়ারান্টাইন অর্থ স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি থাকা।বাহিরে যাতায়াত নাকরা।

হোমকোয়ারান্টাইন এবং নবীজির হিদায়াত: রোগাক্রান্ত ব্যক্তি এবং মহামারী কবলিত এলাকার মানুষদেরকে বর্তমানে যে হোমকোয়ারান্টাইনের কথা বলা হচ্ছে এর উৎসও নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশনায় পাওয়া যায়। আম্মাজান আয়েশা রা. বলেন আমি নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মহামারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেন- انه كان عذابا يبعثه علی من يشاء فجعله رحمة للمؤمنين فليس من رجل يقع في الطاعون فيمكث في بيته صابرا محتسبا يعلم انه لا يصيبه الا ما كتب الله له الا كان له مثل اجر الشهيد মহামারী হলো খোদা প্রদত্ত একটি আযাব,যাদের উপর আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা হয় এ আযাব পাঠান। পরবর্তীতে তিনি তা ঈমানদারদের জন্য নিজ অনুগ্রহে রহমতে রুপান্তর করেন এভাবে যে,কোন ব্যক্তি যদি মহামারী আক্রান্ত এলাকায় থাকে এবং নিজ বাড়িতে ধৈর্য সহকারে সাওয়াবের নিয়তে এ বিশ্বাস বুকে নিয়ে অবস্থান করে যে,আল্লাহ তা’আলা ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে কোনকিছু তার কিছু করতে পারবেনা,তাহলে তারজন্য থাকবে একজন শহীদের সাওয়াব(মুসনাদে আহমাদ-২৬১৮২)। উপরোল্লিখিত হাদীসের দ্বারা বুঝা যায় যে,মহামারী চলাকালে বাড়িতে অবস্থান করলেও শহীদের মর্যাদা লাভ করবে।

তবে শর্ত হলো- (১)সবর ও ধৈর্যের সাথে (২)আখেরাতের সাওয়াবের আশায় (৩)এই বিশ্বাসের সাথে যে , আল্লাহ তা’আলা তাঁর ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন , তা ব্যাতীত কোন কিছুই তার কোন ক্ষতি করতে পারবেনা। বুখারী শরীফের শ্রেষ্ঠতম ভাষ্যকার হযরত হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন- قال ابن حجر رحمه الله : اقتضى منطوقه أن من اتصف بالصفات المذكورة يحصل له أجر الشهيد وإن لم يمت হাদীসে উল্লেখিত তিনটি শর্ত যদি মহামারীগ্রস্ত এলাকার কোন মুসলমান মানে , আর ঘরে অবস্থান করে , তাহলে সে শহীদের মর্যাদা পাবে । যদিও মহামারীতে তার মৃত্যু না হয়(ফাতহুল বারী:১৯৪/১)। সর্বশেষ কথা হলো সামাজি ও সাস্থ সচেতনামূলক উল্লেখিত পরামর্শগুলো মোটেই শরীয়ত সাংঘর্ষিক নয়,বরং সুন্নাতে রাসূল এবংউসওয়ায়ে সাহাবা দ্বারা বাহ্যিক কার্যকারন হিসেবে তা গ্রহন ও পালন কাম্য। হিফাযতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে রক্ষা করুন।

লেখক, পরিচালক- মারকাযুদ দিরাসাতিল ইসলামিয়া-ঢাকা ও উস্তাযুল হাদিস, জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া-ঢাকা।

-এটি

ad