123720

দারুল উলুম দেওবন্দের দৈনন্দিন রুটিন

মোস্তফা কামাল গাজী
আলেম, লেখক

ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দ আমাদের শেকড়। হৃদয়ের স্পন্দন, ভালোবাসার তীর্থস্থান। নবীয়ে রহমত সা. এর হাতে আঁকা রঙিন তুলির পেলব স্পর্শের অনন্য স্থাপত্য। স্বপ্নে দর্শানো তাঁর হাতের দুধের পেয়ালা থেকে পান করতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসে হাজারো শিক্ষার্থী। কিন্তু ভর্তিযুদ্ধে টিকে কেবল হাজার দেড়েক তালিবুল ইলম।

সারা বছর এ গোটাকয়েক ছাত্র জ্ঞানের মধু আহরণ করে ফিরে যায় আপন আপন নীড়ে। অন্যান্য শিক্ষাঙ্গন ও ভার্সিটির মতো দারুল উলুম দেওবন্দেও ছাত্রদের জন্য রয়েছে কিছু ডিসিপ্লিন।

আছে নিয়মতান্ত্রিকতা আর রুটিন। নিচে সেগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

দরস ও মোতালায়া

দাওরায়ে হাদিসের সকালের ক্লাস প্রতিদিন সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর সাড়ে বারোটা পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিকেলের ক্লাস তিনটা থেকে আসর পর্যন্ত। মাগরিবের পর থেকে এশা আবার এশার পর থেকে রাত দশটা পর্যন্ত হয় রাতের ক্লাস।

অন্যান্য জামাতের সকালের ক্লাস সকাল সাড়ে সাতটা থেকে নিয়ে দুপুর সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত হয়। বিকেলে হয় তিনটা থেকে নিয়ে আসর পর্যন্ত। মাগরিব ও এশার পর তাকরার এবং মোতালায়ার সময়।

খাবার

দারুল উলুমে এমদাদি (সম্পূর্ণ ফ্রি) ছাত্রদের দৈনিক দুবেলা খাবার দেয়া হয়। সকালের খানার সময় দুপুর সাড়ে এগারোটা থেকে একটা পর্যন্ত আর বিকেলে আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত। সকালে ক্লাসে যাওয়ার আগে সবাই নিজের পয়সায় নাস্তা করে নেয়। দুপুরে দেয়া হয় গমের রুটি আর ঘন ডাল, বিকেলে রুটি আর মহিষের গোশত।

যারা ফ্রি খানা খায়, তাদের সিলভারের দুটো টিকেট দেয়া হয়। একটা সকালের জন্য, অন্যটা বিকেলের। এ টিকেট আর একটা খানা তোলার স্টিলের বাটি নিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়।

খানা ওঠানোর লাইন থাকে পাঁচটি। লোহার বেড়ার ফাঁক দিয়ে টিকেট দিলে রুটি ও সামনের বেলার টিকেট দেয়। এরপর তরকারি উঠিয়ে যার যার রুমে নিয়ে গিয়ে খানা খায়।

আমাদের বাংলাদেশীরা ‘মাছে-ভাতে’ বাঙালি হওয়ায় মাদরাসা থেকে দেয়া রুটি সাধারণত খেতে পারে না। এজন্য প্রায় সব বাংলাদেশী খানা পাকানোর সরঞ্জাম কিনে নিজে ভাত রান্না করে।

আর মাদরাসার খানা বিক্রি করে দেয় স্বল্প দামে। খানা উঠানোর সময় মাদরাসার বাইরে থেকে অনেক সাধারণ মানুষ আসেন খাবার কিনতে। তাদের সঙ্গে প্রতি বেলায় জমে উঠে খাবার বেচা-কেনার হাট!

দুপুরের খাবার সাধারণত বিক্রি হয় ১৫ রুপিতে আর বিকেলেরটা ২০ রুপিতে। কোনো কারণে খানা বন্ধ হয়ে গেলে দরখাস্ত লিখে জারি করতে হয়। যারা গাইরে এমদাদি (মাদরাসার সুবিধা বঞ্চিত) তাদের নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়।

ঘুমানোর স্থান ও রুটিন

জামিয়ার ক্লাসরুম আর বেডরুম ভিন্ন ভিন্ন। মাদরাসার বিস্তীর্ণ জমিতে ছাত্রদের থাকার জন্য গড়ে উঠেছে তিনতলা করে সুবিশাল কয়েকটি হোস্টেল। প্রত্যেকটির আবার রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম।

যেমন, দারে জাদিদ, শাইখুল হিন্দ মঞ্জিল, আফ্রিকি মঞ্জিল, দারুল কোরআন, বাবুজ জাহির ইত্যাদি। দারে জাদিদে ছাত্রদের শোবার জন্য রয়েছে খাটের সুব্যবস্থা।

অন্য মঞ্জিলে ফ্লোরেই বিছানা পাততে হয়। তবে প্রতিটি মঞ্জিলেই প্রত্যেক ছাত্রের জন্য রয়েছে বড় বড় আলমিরা।

দুপুরে ক্লাসের পর থেকে জোহর পর্যন্ত ছাত্রদের আরামের সময়। খানা খেয়ে ছাত্ররা ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দেয় বিছানায়। জোহরের নামাজ একটু দেরিতেই পড়া হয় এখানে। তাই দুপুরে ঘুমানোর সময়ও পাওয়া যায় বেশি। রাতে ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময় দশটা থেকে সাড়ে দশটার ভেতর।

ফজরের সময় প্রত্যেক মঞ্জিলের নেগরান উস্তাদ এসে জাগিয়ে যান। এর আগে দারোয়ান এসে একবার ডেকে যায়।

গোসলের সময়

প্রতিটি মঞ্জিলের প্রত্যেক তলায় ছাত্রদের গোসলের জন্যে রয়েছে পাকা গোসলখানা। কিন্তু ছত্রসংখ্যা হিসেবে তা একেবারেই অপ্রতুল। তাই ভিড় এড়াতে কাজের ফাঁকে ছাত্ররা গোসল সেরে নেয়। কেউ ক্লাসে যাওয়ার আগে, কেউ ক্লাসের ফাঁকে কেউবা ঘুমের আগে-পরে।

হিন্দুস্তানি ছাত্ররা আবার গোসল খুব কম দিনই করে। সপ্তাহে তিন-চার দিন। তাই গোসল করতে গিয়ে বাংলাদেশী মাদরাসাগুলোর মতো অতটা ভিড় বা ধাক্কাধাক্কি হয় না। তবে শুক্রবারে সবাই কাপড় ধোয়া আর গোসল করার কারণে প্রচণ্ড ভিড় হয়। এজন্য অনেকেই ফজরের আগে গোসল সেরে নেয়।

খেলাধুলা ও শরীর চর্চা

আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত ফ্রি টাইম। এ সময়টায় মাদরাসার বিশাল মাঠে ছাত্ররা ফুটবল, ভলি বল, ব্যাডমিন্টনসহ নানা খেলায় মেতে ওঠে। মাদরাসা থেকে পশ্চিম দিকে রয়েছে বিশাল ঈদগাহ মাঠ। সেখানে প্রতিদিন জমে ওঠে ক্রিকেট খেলার আমেজ।

কেউ খেলে আর কেউ দর্শকের সারিতে বসে খেলা দেখে। মাদরাসার আশপাশের এলাকা পুরোটাই গ্রাম। বিস্তীর্ণ জমিতে চাষ হয় বিভিন্ন শাকসবজি আর আখ। সবুজের পরশ পেতে অনেকে বিকেলটা কাটিয়ে দেয় এসব সবুজের মাঠে।

মাগরিবের আজানের আগেই মাদরাসায় ফিরতে শুরু করে ইলমের সারথিরা।

ভাতা ওঠানোর সময়

প্রতিমাসে এমদাদি ছাত্রদের মাদরাসার পক্ষ থেকে ভাতা স্বরূপ দেয়া হয় দুশো রুপি করে। মাসের পনেরো তারিখের পর যেকোনো একদিন ভাতা ওঠানো যায়। এছাড়া শীতকালে সকল ছাত্রকে কম্বলও দেয়া হয়।

দৈনিক ও মাসিক হাজিরা

দাওরা হাদিস ছাড়া অন্য সকল জামাতে প্রতিদিন ক্লাসে হাজিরা হয়। দাওরায় প্রতিদিন না হলেও মাঝেমধ্যে হয়। সবারই মাসিক আরেকটি হাজিরা হয়। এ হাজিরাটা মাদরাসার আইডি কার্ড নিয়ে অফিসে গিয়ে দিয়ে আসতে হয়।

হাজিরায় কেউ অনুপস্থিত থাকলে খানা বন্ধ করে দেয়া হয়। দরখাস্ত দিয়ে পুনরায় জারি করতে হয়। এ নিয়ম আর ডিসিপ্লিনেই অতিবাহিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিটা ছাত্রের দিন।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, দারুল উলুম দেওবন্দ ইন্ডিয়া

ad

পাঠকের মতামত

২ responses to “বিশুদ্ধ পানির শরবত নিয়ে যাওয়া মিজানুরের বাসায় ওয়াসার হুমকি”

  1. Your style is unique in comparison to other folks
    I have read stuff from. Many thanks for posting when you’ve got the
    opportunity, Guess I’ll just bookmark this page.

  2. I constantly spent my half an hour to read this website’s posts all the time along with
    a cup of coffee.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *