|| মিযানুর রহমান জামীল ||
সূর্যাস্তের পর আসে আঁধারের রাজত্ব। দিনের পর আসে রাতের আধিপত্য। একদিন আঁধার কেটে যায় ঠিকই, আসে না আগের সকাল। শোক কেটে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও মাওলানা সুলতান যওক নদভী আমাদের মাঝে আর ফিরবেন না। বড়দের না ফেরার মিছিল যত দীর্ঘ হচ্ছে, ইলম উঠে যাওয়ার আভাস হৃদয়কে ততই খান খান করে দিচ্ছে।
পাহাড়ে ঝরনার পানি গড়িয়ে পড়তে দেখি আমরা, দেখি না পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা খনি কিংবা লাভা। সমুদ্রে উপরে তরঙ্গ দেখলেও গভীরের তুফান ও রহস্যের ব্যাপারে ওয়াকিফহাল থাকি না। সুলতান যওক নদভীকে সাধারণ মনে হলেও ভেতরের দিক থেকে তিনি ছিলেন ভাষার জীবন্ত সূর্য। মূলত হিন্দুস্তানে সুলতান যওক নদভীকে উর্দু ও আরবী ভাষার অভিধান মনে করা হত।
হযরত আলী মিয়ার মিশন নিয়ে যারা জাতির খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন তাদের অন্যতম মাওলানা সুলতান যওক নদভী রহ.। তিনি ছিলেন মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ দা. বা. এর উস্তাদ। আদিব হুজুর কত চমৎকার বলেছেন— 'নদওয়ার নদভী অনেকেই আছেন, আলী মিয়ার নদভী কজনই বা আছেন!'
২০২২ সালের নভেম্বরে মাদরাসা দারুর রাশাদ ঢাকা-এর মুহতামিম হযরত মাওলানা সালমান দা. বা.-এর সঙ্গে আমি ভারতের ১৩টা প্রদেশ সফর করেছি। ৫টা প্রদেশের আলেমরাই আমাদের পরিচয় দিয়েছেন—
'মেহমান সুলতান যওক-কে মুলক ছে আয়ে থে।’
মেহমানরা সুলতান যওকের দেশ থেকে এসেছেন। তারা আমাদের বিনয়ের সাথে হাত মিলান। ভাষায় কতটা প্রভাব থাকলে নিজ দেশের বাইরে সম্মান আর মর্যাদা হয়ে ওঠে অন্যতম প্রতীক। নদওয়াতুল উলামায় তাঁকে মনে করা হত বাংলাদেশের আবুল হাসান আলী নদভী।
একবার হযরতের সোহবত নিতে তিন দিনের সফরে দারুল মাআরিফ গিয়েছিলাম। অসুস্থ থাকায় তখন তিনি বাসায় অবস্থান করতেন। আমি বাসায় গিয়ে কিছু খেদমতও করেছি। খুব কাছ থেকে হযরতকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমি তাঁকে যতটা খোলা চোখ দিকে দেখেছি তার চেয়ে বেশি দেখার চেষ্টা করেছি অন্তর দিয়ে। যতই দেখেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি।
হযরত রায়বেরেলীর তাকিয়াকেলা, দায়েরায়ে শাহ আলামুল্লাহ ও সাই নদীর ইতিহাস আমার কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যেন আমার চোখে সাইয়েদ আহমদ শহীদের সাঁতারের দৃশ্য ভেসে ওঠতো। শোনাতেন আলী মিয়ার বরকতময় সোহবতের ঘটনা। হিন্দুস্থানি আলেমদের ব্রড মাইন্ডের অবস্থা বর্ণনা করতেন। সিলেবাস নিয়েও আলোচনা বাদ পড়েনি। হযরত আমাকে স্নেহ করেছেন খুব।
কথা বলা ডাক্তারের নিষেধ থাকলেও আমার সাথে তিনি ধীরে ধীরে শব্দ বিনিময় করতেন। যেদিন চলে আসবো সেদিন একজনকে ডেকে বলে দিলেন— 'মাসিক আল হক যেন সবসময় আমার ঠিকানায় পাঠানো হয়।' এমন দরদি মালী আমার জীবনে আর মিলবে কিনা জানি না। আল্লাহ হযরতকে ক্ষমা করে তাঁর খেদমতগুলো কবুল করে নিন।
তাঁর লেখা বইসমূহের মধ্যে "আত্তরিক ইলাল ইনশা" "কাসাসুন নাবিয়্যিন" "যাদুত ত্বালিবিনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ' 'নুখবাতুল আহাদিস" "শিশুদের আরবী ভাষা শিক্ষা সিরিজ" "রাহবারে উর্দু" "আসান কাওয়ায়েদ" এসব কিতাব উল্লেখযোগ্য। ‘আমার জীবনকথা’ নামে তাঁর আত্মজীবনী সর্বমহলে বেশ প্রশংসা পেয়েছে। এছাড়া মাদরাসা শিক্ষার সংস্কারে তাঁর লেখা ‘শিক্ষা সংস্কারের ডাক’ বাংলা ও আরবী ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
লেখক: সম্পাদক, কলম সৈনিক
জেডএম/
