রবিবার, ৩১ মে ২০২৬ ।। ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১৪ জিলহজ ১৪৪৭


কোরবানির বর্জ্য পরিষ্কার: ইসলামের নির্দেশনা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| মুফতি তাফাজ্জুল হক ||

ঈদুল আজহা ত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার মহান শিক্ষা বহনকারী এক পবিত্র দিন। মুসলমান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে কোরবানি আদায় করে থাকে; কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অনেক সময় কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর পশুর বর্জ্য, রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও আবর্জনা যথাস্থানে অপসারণ না করায় পরিবেশ দূষিত হয়, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এবং সমাজে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম নেয়। অথচ ইসলাম কেবল ইবাদাতের আনুষ্ঠানিকতা শিক্ষা দেয় না; বরং ইবাদাতের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের দিকেও সমানভাবে গুরুত্বারোপ করে।

বস্তুত, কোরবানি কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়। এটি আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতারও শিক্ষা প্রদান করে। যে ইবাদাতের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন, সে ইবাদাতের পর এমন অবস্থার অবতারণা করা, যাতে মানুষ কষ্ট পায়, দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয় কিংবা পরিবেশ দূষিত হয়, তা ইসলামের শিষ্টতার সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
অর্থাৎ, "নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তওবাকারীকে ভালবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালবাসেন।"
(সূরা আল-বাকারা: ২২২)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
نظفوا افنيتكم
অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের আঙ্গিনাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখ।
(মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৪৪৮৭)

পবিত্রতা মানুষের জীবনে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে ঈমানের অর্ধেক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন,
الطهور شطر الايمان
অর্থাৎ, পবিত্রতা হল ঈমানের অর্ধেক।
(আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হাদীস নং ৫৬২)

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের চলাচলের পথ, জনসমাগমস্থল ও পরিবেশকে কষ্টদায়ক বস্তু থেকে মুক্ত রাখাকে সওয়াবের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন,
تميط الاذى عن الطريق صدقة
অর্থাৎ, “রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া সদাকাহ”।
(সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ২২০৭)

তিনি আরো বলেন,
اتقوا اللاعنين. قالوا: وما اللاعنان يا رسول الله؟ . قال: «الذي يتخلى في طريق الناس أو في ظلهم»

অর্থাৎ, তোমরা দু'টি অভিশাপের কারণ হতে বেঁচে থাকবে। সাহাবীগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে দু'টি অভিশাপের কারণ কী? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি মানুষের চলার পথে বা ছায়ায় পায়খানা করে।
(মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৩৩৯)

সুতরাং কোরবানির পর বর্জ্য যথাযথভাবে পরিষ্কার করা নিছক নাগরিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি এক প্রকার সদাকাস্বরূপ আমলও বটে।

বিশেষত বর্তমানের জনবহুল নগরসভ্যতায় কোরবানির বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে রাখা রোগব্যাধি, দুর্গন্ধ ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। অতএব বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলা, দ্রুত অপসারণ করা, প্রয়োজন হলে মাটি চাপা দেয়া বা স্থানীয় ব্যবস্থাপনার সহযোগিতা নেয়া প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের কর্তব্য।

মনে রাখতে হবে, ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থা, যা মসজিদের ভেতরের পবিত্রতার মতো সমাজ ও পরিবেশের পবিত্রতাকেও গুরুত্ব দেয়। অতএব কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমাদের ঘর, উঠান, রাস্তা ও জনপদও পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার সাক্ষ্য বহন করবে। কোরবানির তাকওয়া যেন পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধেও প্রতিফলিত হয়, এটিই হওয়া উচিত একজন মুমিনের সচেতনতার পরিচয়।

লেখক: সাবেক মুহাদ্দিস, জামিয়া কাসিমিয়া মহাখালী টিএন্ডটি কলোনি ঢাকা।
ফিকহ ও ইফতা, মারকাজুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ বসুন্ধরা ঢাকা।
 এমএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ