বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ ।। ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১৮ জিলহজ ১৪৪৭

শিরোনাম :
‘লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ব্যতীত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়’ বর্তমান সমাজে বিয়েকে ক্রমেই কঠিন করে তোলা হচ্ছে কালভার্ট নির্মাণকালে মাটিচাপা পড়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু আগস্টের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ড্রেস ও জুতা বিতরণ শুরু করবে সরকার: ববি হাজ্জাজ আগামী ৭ জুন রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতে নারীসহ ৫ জনের মৃত্যু ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ পুলিশ কর্মকর্তা হজ-পরবর্তী জীবনে পরিবর্তন না এলে হজের শিক্ষা অপূর্ণ: শায়খ আহমাদুল্লাহ ‘সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার প্রশ্নে কোনো আপস করা উচিত নয়’ ৩ জেলায় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার

বর্তমান সমাজে বিয়েকে ক্রমেই কঠিন করে তোলা হচ্ছে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান ||

প্রতিটি সমাজের নৈতিক শক্তি নির্ভর করে তার পরিবারব্যবস্থা, মূল্যবোধ এবং মানবিক দায়িত্ববোধের ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ পরিবারকে শক্তিশালী করেছে, বিবাহকে সহজ করেছে এবং তরুণ প্রজন্মের স্বাভাবিক চাহিদাকে বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করেছে, সেই সমাজ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ও নৈতিক ভারসাম্য অর্জন করেছে। আর যে সমাজ স্বাভাবিক ও বৈধ পথকে জটিল করে তুলেছে, সেখানে নৈতিক সংকট, মানসিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অবক্ষয় ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে।

বর্তমান মুসলিম সমাজের অন্যতম বড় বাস্তবতা হলো বিবাহকে ক্রমেই কঠিন করে তোলা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন তরুণ বা তরুণী দ্বীন ও চরিত্র রক্ষার উদ্দেশ্যে বিবাহের আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে বলা হয়, 'এখন নয়', 'আগে পড়াশোনা শেষ করো', 'আগে চাকরি', 'আগে বাড়ি-গাড়ি', 'আগে প্রতিষ্ঠিত হও'। যেন বিবাহ কোনো মানবিক ও ধর্মীয় প্রয়োজন নয়, বরং জীবনের সব লক্ষ্য অর্জনের পর বিলাসিতার মতো গ্রহণ করার একটি বিষয়।

অথচ মানুষের জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম ভিন্ন। আল্লাহ তাআলা মানুষকে প্রবৃত্তি, আবেগ, ভালোবাসা, আকর্ষণ ও পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক চাহিদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি, বরং সুশৃঙ্খল, মর্যাদাপূর্ণ এবং বৈধ উপায়ে তার সমাধান দিয়েছে। সেই সমাধানের নাম বিবাহ।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,'তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ সম্পন্ন করো। তারা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন।' (সূরা আন-নূর ৩২)

এই আয়াতের ভাষা গভীরভাবে লক্ষণীয়। এখানে দারিদ্র্যকে বিবাহের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর অনুগ্রহের মাধ্যমে দূর হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ কেবল ধনীদের অধিকার নয়।

রাসুলুল্লাহ সা. যুবকদের উদ্দেশে বলেন, 'হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ তা দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।' (সহিহ বুখারি, মুসলিম)

এই হাদিসে বিবাহকে শুধু পারিবারিক বন্ধন হিসেবে নয়, বরং নৈতিক নিরাপত্তা, আত্মসংযম এবং চরিত্র রক্ষার অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বিবাহ ও জ্ঞানচর্চাকে কখনো একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়নি। সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িন, ইমামগণ এবং পরবর্তী যুগের অসংখ্য আলেম ছাত্রাবস্থায় অথবা যৌবনের শুরুতেই বিবাহ করেছেন।

হজরত আলী রা. এবং হজরত ফাতিমা রা. এর সংসার ছিল অত্যন্ত সাধারণ। সেখানে রাজকীয় সম্পদ ছিল না, কিন্তু ছিল তাকওয়া, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মান। তাঁদের পরিবার ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে বরকতময় পরিবারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

পরবর্তী যুগে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ., আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল রহ., মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভি রহ., মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভি রহ., মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস রহ., মাওলানা উমর পালনপুরী রহ. এবং অসংখ্য আলেম ছাত্রাবস্থায় বিবাহ করেছেন। তাঁদের জীবনী অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, বিবাহ তাঁদের জ্ঞানার্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং দায়িত্ববোধ, মানসিক স্থিরতা এবং জীবনবোধকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

দুঃখজনকভাবে আধুনিক সমাজে বিবাহকে অনেক ক্ষেত্রে এতটাই জটিল করে তোলা হয়েছে যে, একজন তরুণের জন্য বৈধ পথ গ্রহণের চেয়ে অবৈধ সম্পর্কের পরিবেশে টিকে থাকা সহজ হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, বিনোদনশিল্প এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির এই যুগে তরুণরা প্রতিনিয়ত নানা প্রলোভনের মুখোমুখি হচ্ছে। অথচ একই সময়ে তাদের সামনে বৈধ ও সম্মানজনক পথকে নানা শর্ত, বিলম্ব এবং সামাজিক চাপে সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে।

ইসলাম কখনো মানুষকে ফেরেশতা মনে করে না। ইসলাম মানুষের স্বভাবকে জানে, মানুষের দুর্বলতাকে বোঝে এবং সেই কারণেই বিবাহকে সহজ করতে উৎসাহ দেয়। কুরআন ব্যভিচারকে শুধু নিষিদ্ধ করেনি, বরং ব্যভিচারের কাছেও যেতে নিষেধ করেছে। কারণ ইসলাম জানে, নৈতিক বিপর্যয় হঠাৎ ঘটে না, তার আগে দীর্ঘ একটি সামাজিক ও মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে।

আজকের বাস্তবতায় অনেক তরুণ-তরুণী এমন বয়সে পৌঁছে যায়, যখন তাদের আবেগ, মানসিক চাহিদা এবং পারিবারিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়। কিন্তু পরিবার, সমাজ এবং প্রচলিত সংস্কৃতি তাদের সামনে এমন সব শর্ত দাঁড় করিয়ে দেয়, যা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলস্বরূপ কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, কেউ হতাশায় আক্রান্ত হয়, কেউ গোপন সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে যায় এবং কেউ দ্বীনি ও নৈতিক সংকটে পতিত হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষ নিজের কর্মের জন্য দায়ী। তবে অভিভাবকদের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া, নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, চরিত্র রক্ষার উপায় সহজ করা এবং বৈধ পথের প্রতি সহযোগিতা করা অভিভাবকের অন্যতম দায়িত্ব। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. সন্তানের দ্বীন ও চরিত্র রক্ষাকে পিতামাতার সবচেয়ে বড় আমানতগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সমাজের উচিত বিবাহকে অযথা ব্যয়বহুল, জটিল এবং বিলম্বিত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। কারণ বিবাহ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন, নৈতিক সুরক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। একটি সুস্থ সমাজ কখনো এমন পরিবেশ তৈরি করে না, যেখানে হালাল পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং হারাম পথ সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

মুসলিম সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস প্রমাণ করে, জ্ঞানচর্চা, কর্মজীবন এবং বিবাহ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সঠিক পরিকল্পনা, পারিবারিক সহযোগিতা এবং দায়িত্ববোধ থাকলে একজন মানুষ একই সঙ্গে শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, দায়িত্বশীল এবং পারিবারিক জীবনে সফল হতে পারে।

বিবাহকে ভয় নয়, প্রজ্ঞার সঙ্গে দেখতে হবে। সামাজিক অহংকার, অযৌক্তিক শর্ত এবং কৃত্রিম বিলম্বের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে কুরআন-সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ফিরে যেতে হবে। কারণ যে সমাজ বিবাহকে সহজ করে, সে সমাজ তার তরুণ প্রজন্মের চরিত্র, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করে। আর যে সমাজ বিবাহকে কঠিন করে তোলে, সে সমাজ অবশ্যম্ভাবীভাবে নৈতিক সংকটের মূল্য পরিশোধ করে।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর

 এমএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ