জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে পুরোনো এক দাবি নতুন করে সামনে এনেছে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ— পি আর (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক পদ্ধতিতে নির্বাচন। এ দাবি তাদের একক নয়, তবে ধারাবাহিক ও জোরালোভাবে মাঠে তুলে আনা দলটি তারাই।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এই দাবি জানিয়ে আসছে। দলটির ভাষ্য, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে একক আধিপত্যের রাজনীতির অবসান ঘটবে এবং দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর সংসদ গড়ে উঠবে।
আওয়ার ইসলামের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান তুলে ধরেন তাদের এই দাবির পেছনের যুক্তি, ইতিহাস ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিবেদক কাজী ইনজামামুল হক।
ইনজামামুল হক: নির্বাচনের আগমুহূর্তে হঠাৎ পিআর পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ নিয়ে ইসলামি আন্দোলন মাঠে নামল কেন?
মাওলানা গাজী আতাউর রহমান: আমরা ২০০৮ সাল থেকেই পিআর পদ্ধতির দাবিতে মাঠে আছি। সেনাসমর্থিত সরকারের সময় রাজনৈতিক সংলাপে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ লিখিতভাবে এই দাবি তোলে। তখন যদি এই দাবি মানা হতো, তাহলে আওয়ামী লীগ আজকের একদলীয় আধিপত্য, সাংবিধানিক পরিবর্তন ও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের সুযোগ পেত না। আমরা চাই যেন আগামীর বাংলাদেশ সঠিকভাবে পরিচালিত হয় এবং দেশে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। পাশাপাশি একটি কার্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ—যেখানে সব দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
ইনজামামুল হক: নতুন এই পদ্ধতিতে তো আগে বাংলাদেশে নির্বাচন হয়নি। আপনারাই কি প্রথম এই দাবি তুলছেন?
মাওলানা গাজী আতাউর রহমান: না, একদমই না। আমরা জোরালোভাবে মাঠে এই দাবি তুলেছি ঠিক, কিন্তু এটিই প্রথম নয়। ২০০৫ সালে জামায়াতের তৎকালীন আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেব এ নিয়ে বই লিখেছেন। তারও আগে ১৯৯৮ সালে সিপিবি এই দাবি তোলে। জাতীয় পার্টি, বামপন্থী অনেক দলই পিআর পদ্ধতিকে সমর্থন জানিয়ে আসছে। তাই একে এককভাবে আমাদের দাবি বলা ঠিক নয়, এটা বহু রাজনৈতিক দলের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা।
ইনজামামুল হক: বড় দলগুলো এই পদ্ধতিতে নির্বাচন কেন চায় না?
মাওলানা গাজী আতাউর রহমান: আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি— এই দুই দলই চায় না পিআর পদ্ধতির বাস্তবায়ন হোক। কারণ তারা কর্তৃত্ববাদী। তারা সব ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে চায়। সংসদে অন্য কোনো দলের জায়গা তৈরি হোক, এটা তারা সহ্য করতে পারে না। এককভাবে রাষ্ট্র চালানোর স্বপ্নে বিভোর বলেই তারা এই সর্বাধুনিক ও ইনক্লুসিভ পদ্ধতির বিরোধিতা করছে। এখন আওয়ামী লীগ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলেও বিএনপি একইভাবে পিআরের বিরোধিতায় নেমেছে।
ইনজামামুল হক: পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে?
মাওলানা গাজী আতাউর রহমান: সর্বপ্রথম, প্রত্যেক ভোটারের ভোট মূল্যায়িত হবে— কোনো ভোট নষ্ট হবে না। জনসমর্থন আছে এমন প্রতিটি দল সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাবে। এতে করে ভোটাররা উৎসাহ নিয়ে ভোট দেবে, গণতন্ত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়বে। সংসদ ভারসাম্যপূর্ণ হবে, একচেটিয়া আধিপত্য আর থাকবে না।
বিশ্বের ১৭০টি জাতিসংঘভুক্ত দেশের মধ্যে ৯১টি দেশ অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন করে। উন্নত দেশগুলোও এ পদ্ধতি অনুসরণ করে। অথচ আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলো এই ইতিবাচক দিকগুলো প্রচার করছে না। আপনাদেরও উচিত এই পদ্ধতির পজিটিভ দিকগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা।
ইনজামামুল হক: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
মাওলানা গাজী আতাউর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি দাবির পুনরুত্থান নির্বাচনী রাজনীতিকে নতুন মোড় দিয়েছে। যেখানে বড় দলগুলো একক আধিপত্য ধরে রাখতে আগ্রহী, সেখানে পিআর পদ্ধতি হতে পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার একটি বিকল্প পথ।
এমএইচ/